রাষ্ট্র নিরপেক্ষ শিক্ষা দর্শন, দাওয়াত ও আন্দোলন

একুশে জার্নাল ডটকম

একুশে জার্নাল ডটকম

অক্টোবর ২৪ ২০১৯, ১৫:৫০

সৈয়দ শামছুল হুদা :

ভারত উপমহাদেশে দারুল উলূম দেওবন্দের আবেদন, অবদান প্রশ্নাতীত। সফলতার কীর্তিকাহিনী ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে সর্বত্র। উপমহাদেশের প্রতিটি মুসলিমের সাথে কোন না কোনভাবে এই শিক্ষা ধারার অবদান স্বীকৃত। এটাকে অস্বীকার করার, নিদেনপক্ষে হীন দৃষ্টিতে তাকাবার কোন সুযোগ কারো নেই।

দারুল উলুম দেওবন্দ কেন্দ্রিক তিনটি আন্দোলন খুব ভালোভাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে।এগুলোর প্রভাব-প্রতিপত্তি এককথায় অপ্রতিদ্বন্ধি। এই তিনটি ধারা ভারত উপমহাদেশকেই শুধু নয় বিশ্বের নানাপ্রান্তেও এর প্রভাব এত বেশি যা কল্পনাও করা যায় না।
এই তিনটি ধারা হলো :
ক। কওমী মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠা।
খ। দাওয়াত ও তাবলীগের আত্মপ্রকাশ।
গ। জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ/ ইসলাম।

ভারত উপমহাদেশে কওমী মাদ্রাসার উপস্থিতি এতই ব্যাপক যে, এমন কোন অঞ্চল পাওয়া যাবে না যেখানে এর আওয়াজ পৌঁছেনি। বিশেষ করে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে কওমী মাদ্রাসার প্রভাব ও প্রতিষ্ঠা অনেক ব্যাপক এবং শক্তিশালী।লক্ষ লক্ষ ছাত্র রয়েছে এসব প্রতিষ্ঠানের। কওমী মাদ্রাসা থেকে ফারেগ শিক্ষার্থীর সংখ্যা মোটেও কম নয়।

পাশাপাশি, দারুল উলূম দেওবন্দ থেকেই আত্মপ্রকাশ ঘটে দাওয়াত ও তাবলীগের। আজ বিশ্বব্যাপী দাওয়াত ও তাবলীগের নামে যে মেহনত চলছে, তার প্রতিষ্ঠাতা দারুল উলূম দেওবন্দেরই সন্তান হযরত মাওলানা ইলিয়াসজী রহ.। তাঁরই হাতে গড়া মেহনত দাওয়াত ও তাবলীগ।একেকটি বিশ্বইজতেমায় যে পরিমান লোক সমাগম হয় তা হিসেব কষে বের করা খুব কঠিন। টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমা সারাবিশ্বে সমাদৃত।

অপরদিকে রাজনৈতিক ময়দানে কাজ করার জন্য যে ধারাটি সক্রিয়তা নাম জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ যা বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম নামে পরিচিতি ও প্রসিদ্ধ।এটিও দারুল উলূম দেওবন্দের অবদান। দারুল উলূম দেওবন্দ এর সন্তানেরা এর সাথে সম্পৃক্ত থাকতে পারাকে নিজের সৌভাগ্যর বিষয় মনে করে। ভারতে জমিয়ত ভিন্ন অন্য কোন দলের তেমন কোন তৎপরতা চোখে পড়ে না। আর পাকিস্তানে মাওলানা ফজলুর রহমান সাহেবের নেতৃত্বে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর কাছে ব্যাপকভাবে সমাদৃত। বাংলাদেশেও জমিয়ত শতবর্ষী একটি প্রাচীন দল হিসেবে এখনো গর্বের সাথেই টিকে আছে।

এই তিনটি ধারা, এই তিনটি আন্দোলন ভারত উপমহাদেশে অনেক শক্তিশালী অবস্থানে থাকা সত্ত্বেও এ কথাটি বলতে দ্বিধা নেই যে, এর কোনটিই রাষ্ট্র যারা চালায় তাদের জন্য এরা কোন হুমকি নয়। কারণ এর তিনটি ধারাই মূলত: নিজেদেরকে রাষ্ট্র পরিচালনার স্বপ্ন দেখা থেকে দূরে থাকে। নিজেদেরকে রাষ্ট্র পরিচালনার চিন্তা থেকে সাবধানতার সাথে সরিয়ে রাখে। হয়তো বা এ কারণেই এই তিনটি শক্তি দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। পরিচিতি পাচ্ছে।

কওমী মাদ্রাসার শিক্ষা, দর্শন, চিন্তা, সিলেবাস কোনটিই এমনভাবে সাজানো নয়, যেখান থেকে শিক্ষা গ্রহন করে সে রাষ্ট্রের বড় কর্ণধার হওয়ার স্বপ্ন দেখতে পারে। রাষ্ট্র পরিচালনায় এই তিনটি ধারার কোনটিরই বড় ধরণের কোন ভূমিকা নেই। ভুমিকা রাখার ইচ্ছাও নেই। দাওয়াত ও তাবলীগের ব্যাপক প্রভাব শুধূ ভারত উপমহাদেশেই নয়, বিশ্বব্যাপী। কিন্তু এদের রাষ্ট্র পরিচালনার কোন ইচ্ছা নেই। এ নিয়ে আলোচনা করাও তারা হারাম মনে করে। বেহুদা সময় নষ্ট করা মনে করে।

আর জমিয়তে উলামায়ে ইসলামকে আমার কাছে পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক দল মনে হয় না। কারণ এটি একটি সীমিত গোষ্ঠীর সামাজিক শক্তি হিসেবে টিকে থাকার আন্দোলন ছাড়া কিছুই নয়।উলামায়ে কেরামদের একটি মিলনমেলা এই দলটি। বাংলাদেশ প্রফেসর’স এসোসিয়েশন, বাংলাদেশ শিশু কল্যাণ পরিষদ, বাংলাদেশ মহিলা কল্যাণ সমিতি এগুলো যেমন বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান তেমনি বাংলাদেশ জমিয়তে উলামায়ে ইসলামও একটি বিশেষায়িত সংগঠন। যার উদ্যোক্তা, স্বপ্নদ্রষ্টা, পরিচালক, কর্মী, সমর্থক সবাই আলেম। একটি রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য যেমন বহুমুখি প্রতিভার প্রয়োজন, নানান পেশার মানুষের অংশগ্রহন প্রয়োজন এই চেতনা জমিয়ত ধারণ করে বলে মনে হয় না। কারণ এর নামটিই একটি আংশিক অংশকে ধারণ করে। এটি উলামাদের একটি সংগঠন। এখানে আলেমদের আনাগোনা রয়েছে। সাধারণ মানুষের সাথে এর নিবিড় কোন সম্পর্ক নেই।

ভারত উপমহাদেশে যে সকল রাজনৈতিক দল রাষ্ট্র পরিচালনার স্বপ্ন নিয়ে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল, সেগুলোও আজ ক্ষয়িষ্ণু। যেমন মুসলিম লীগ প্রায় শেষের পথে। বাংলাদেশে হযরত মাওলানা আতহার আলী রহ. নেজামে ইসলাম প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক দল গড়ে তুলেছিলেন। হাফেজ্জী হুজুর রহ. একটি গণমুখি আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন খেলাফত আন্দোলনের মাধ্যমে। কিন্তু কেন জানি পুর্ণাঙ্গ চিন্তার এই দলগুলো দুর্বল হয়ে গেছে। এখনো তিনটি দেশেই গর্বের সাথে টিকে আছে জমিয়ত।

ভারতে স্বাধীনতার পুর্বাপর সময় খেবেই জমিয়ত সবসময় নিজেকে সরকারের সমর্থক একটি সামাজিক শক্তি হিসেবে কাজ করেছে।সেভাবে আজো কাজ করে যাচ্ছে। ফলে ভারতে মাদানী পরিবার থেকে শুরু করে জমিয়তের কোন পর্যায়েই এটা দেখা যায় না যে, তারা কোনদিন সরকারের জন্য মুসলমানদের পক্ষ থেকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে। সেটা কংগ্রেসের সাথে যেমন দেখা গেছে, বিজেপির মতো কট্টর উগ্রবাদী, মুসলিম বিদ্বেষী দল ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও একই দর্শন কাজ করছে। বিজেপির সাথে মিলেমিশে মুসলমানদের স্বার্থ দেখাই ভারতের জমিয়তের অন্যতম দায়িত্ব। আবার যদি কংগ্রেস আসে, দেখা যাবে তার সাথেও তাদের সখ্যতা।

মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম, খেলাফতে আন্দোলন এই সমস্ত দলগুলো পুর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক চিন্তা থেকে যাত্রা।কিন্তু টিকতে পারছে না। কেন পারছে না এটা একটি গবেষণার বিষয়। অথচ স্বাধীন দেশেই এগুলোর জন্ম। স্বাধীনতার জন্যই এগুলোর জন্ম। অন্যভাবে যদি বলা যায়, তাহলে এভাবে বলতে পারি যে, এদলগুলোকে টিকতে দেওয়া হয়নি।হচ্ছে না। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে নানান কৌশলে দুর্বল করে রাখা হয়েছে। নেজামে ইসলাম নিজেই চলতে পারছে না। খেলাফত আন্দোলন আত্মপ্রতিষ্ঠার কিছু দিনের মধ্যেই দুর্বল হয়ে পড়ে। মুসলিম লীগ পাকিস্তানে কিছুটা থাকলেও বাংলাদেশে একেবারেই নাই বললে চলে। ইসলামী আন্দোলন এখনো পর্যন্ত কিছুটা আশা জাগিয়ে যাচ্ছে। তাদের রাজনৈতিক দর্শন অবশ্য রাষ্ট্র থেকে দূরে থাকা নয়। সব শ্রেণি পেশার মানুষের সাথেই তাদের কিছুটা সম্পর্ক আছে। এটা একটি পজিটিভ দিক।

এই যে দলগুলো টিকতে পারছে না, এটা কি কোন চক্রান্তের ফসল? এমন হওয়াটা কি কোন ষড়যন্ত্রের অংশ? না হলে- স্বাধীন দেশে স্বাধীনতার জন্য লড়াইকারী দলগুলো টিকতে পারছে না কেন? পাশাপাশি যে কথাটি না বললেই নয়, সেটা হলো- বাংলাদেশের সবগুলো রাজনৈতিক দলকেই দুর্বল করে দেওয়া হচ্ছে। যেমন বাংলাদেশ জাতিয়তাবাদী দল বিএনপি আজ চরমভাবে কোণঠাসা। অপরদিকে আওয়ামীলীগও আজ যে পর্যায়ে রয়েছে তাদের জনসর্মথন এখন যে পর্যায়ে রয়েছে তাতে যদি সরকারের হঠাৎ কোন কারণে পতন ঘটে তাহলে এই দলটি যে কত বছর পিছিয়ে যাবে আল্লাহই ভালো জানেন। একটি দেশের কাছে নিরঙ্কুশভাবে স্বার্থ বিকিয়ে দেওয়ার বিনিময়ে আওয়ামীলীগ এখন ক্ষমতায়।এটাও করা হয়েছে স্বাধীনতাপ্রেমিক দলগুলোকে দুর্বল করে দেওয়ার সুদূর প্রসারী পরিকল্পনা থেকে। সরকারে আওয়ামীলীগের দেশপ্রেমিক অংশটি বাহ্যত কোণঠাসা।

এহেন অবস্থায় রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়া থেকে ইচ্ছাকৃতভাবে দূরে থাকার যে নীতি দারুল উলূম দেওবন্দ আজো ধারণ করে আছে তা সময়ের দর্পনে কতটা যৌক্তিক তা এখন বিবেচনার দাবী রাখে।

বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, রাজনীতির মাঠে হুমকি নয়, এমন শক্তিগুলো টিকে থাকছে। আর স্বাধীনতার জন্য যে শক্তিশালী রাজনৈতিক দল, সংগঠন থাকা দরকার সেগুলো দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। অশনি সংকেতটা এখানেই। অরাজনৈতিক শক্তির প্রভাব দৃশ্যমান। এতে সরকার পরিচালনায় যারা আছে, আসবে, তাদের জন্য এগুলো কোন হুমকি নয়। কিন্তু যে বা যারাই ক্ষমতার চিন্তা করে, রাস্ট্রীয় কাজে অংশগ্রহনের চেষ্টা করে তাদেরকেই নানা নাম দিয়ে দুর্বল করার চেষ্টা করা হচ্ছে। আজকের জঙ্গিবাদ ইস্যু, যুদ্ধাপরাধী ইস্যু এমনই একটি চতুর ইস্যু, যা দিয়ে রাষ্ট্র নিয়ে ভাববার লোকদেরকে কৌশলে দূরে সরিয়ে দেওয়া যায়। আর যারা উপর তলার দিকে চোখ তুলে তাকায় না তাদেরকে বাহবা দেওয়া হচ্ছে।

এভাবে রাষ্ট্র থেকে নিরপেক্ষ থাকার এবং নিরপেক্ষ রাখার যে চেষ্টা চলছে তারই সফলতা দেখা যাচ্ছে। আমরা কি স্বাধীনতা পেয়েও হেরে যাবো? আমরা কি আমাদের আগামী প্রজন্মকে রাষ্ট্র তাদেরও, তাদেরও অধিকার আছে রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশগ্রহন করার। এখনো কি সময় আসেনি সেই শিক্ষা দিয়ে তাদের বড় করার? এখনো কি সেই সময় আছে যে সময় ভাবা হতো, রাষ্ট্রতো আমাদের না, রাষ্ট্র বৃটিশের? রাষ্ট্রের নিকট থেকে কেন আমরা সাহায্য নিবো?