স্বাধীনতা দিবস:কিছু কথা

একুশে জার্নাল ডটকম

একুশে জার্নাল ডটকম

মার্চ ২৬ ২০১৯, ০৪:৫৭

হাবীব আনওয়ার

১. স্বাধীনতা। রক্ত নদী পেরিয়ে অর্জতি একটি বিজয়ের নাম। দীর্ঘ সংগ্রাম আর লক্ষ বাঙ্গালীর আত্মদানের বিনিময়ে অর্জিত একটি সফলতার নাম। দীর্ঘ নয় মাস বর্ণনাতীত কষ্ট, সংগ্রাম আর যুদ্ধের মাধ্যমে আমরা পেয়েছি আমাদের অধিকার। অর্জিত হয়েছে লাল সবুজের একটি পতাকা। বিশ্ববাসী দেখেছে বাঙ্গালী জাতির শৌর্য -বীর্য।১৯৭১ এর সেই দিনগুলোতে বাঙ্গালী জাতির সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমরা বিজয়ী হয়েছি। ‘৭১ এর সেই দিনগুলোতে মহান মুক্তিযুদ্ধে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে অংশ নিয়ে ছিলেন, এদেশের আলেম ওলামা, ইমাম-খতিব, কৃষক-শ্রমিকসহ সর্বস্তরের মুক্তিকামী বাঙ্গালী। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, একশ্রেণীর নামধারী সুশীল সমাজ রক্তমাখা ইতিহাসকে ভিন্নখ্যাতে নেওয়ার অপচেষ্টায় মত্ত! শান্তিপ্রিয় দেশ প্রেমিক আলেম ওলামাদের কুকৌশলে স্বাধীনতা বিরোধী বানানোর চেষ্টা করছে। রাজাকার, আল বদর ইত্যাদি শ্লোগান তুলে আলেম ওলামাকে হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করছে। বিভিন্ন নাটক, ছিনেমায় মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীদের ইসলামী পোষাকে উপস্থাপনের কাজটি করছে সেক্যুলারপন্থি ইসলাম বিদ্বেষীরা।
অথচ, ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, ওলামায়ে কেরাম শুধু ‘৭১ এ নয়।বিটিশ বিরোধী সংগ্রাম, ‘৪৭ এ দেশ ভাগ, ‘৫২ এর ভাষা আন্দোনলেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। একটি কথা খুব জোর দিয়েই বলা যায় যে, বাংলাদেশ স্বাধীনের মূলে ছিলেন ওলামায়ে কেরাম।কারণ, বাংলাদেশের স্বাধীনতা নির্ভর করে পাকিস্তানের স্বাধীনতার উপর।’৪৭ এ যদি পাকিস্তান স্বাধীন না হতো, তাহলে বাংলাদেশ নামক কোন রাষ্ট্র পৃথিবীর মানচিত্রে থাকতো না।আর পাকিস্তান স্বাধীনের নেতৃত্ব দিয়েছেন, মাওলানা সিব্বির আহমদ উসমানী। আবার পাকিস্তানের স্বাধীনতা নির্ভর করে ভারত স্বাধীনের উপর। ওলামায়ে দেওবন্দ যদি বিটিশদের বিরুদ্ধে আন্দোলন না করতেন, শাহ আব্দুল আজিজ দেহলবী রহ. যদি ফতুয়া না দিতেন তাহলে ভারতের স্বাধীনতা অর্জন হতো না। তাহলে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশ স্বাধীনের পিছনে পাকিস্তান, আর পাকিস্তান স্বাধীনের পিছনে ভারত, এবং ভারত স্বাধীনের পিছনে ছিল শাহ আব্দুল আজিজ দেহলবী রহ.এর ফতুয়া। আজ যারা ফতুয়ার বিরুদ্ধে কথা বলে, তাদের মনে রাখা দরকার যে ফতুয়ার বিরুদ্ধে তোমরা কথা বলছো, এই ফতুয়ার কারণেই এই দেশ স্বাধীন হয়েছে।

২. অনেক ঘাত প্রতিঘাত আর রক্ত নদী পেড়িয়ে আমরা অর্জন করেছি স্বাধীনতা।দীর্ঘ নয় মাস সংগ্রাম আর বর্ণনাতীত নির্যাতন ভোগ করার পর আমরা পেয়েছি ‘৫৬ হাজার বর্গমাইলের একটি ভূখণ্ড।যার নাম বাংলাদেশ।সোনার বাংলাদেশ।পেয়েছি লাল-সবুজের একটি পতাকা।পেয়েছি একটি স্বাধীন ভূখণ্ড।কিন্তু আজও মনে একটি সংশয় বারবার উঁকি দিয়ে যায়, সত্যি কি আমরা স্বাধীন হতে পেরেছি? পেয়েছি কি বিশ্বের সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর মত সাহস।স্বাধীনতার ৪৯ বছরেও কি পেরেছি ভারতের গোলামীর জিঞ্জির থেকে বের হয়ে স্বগৌরবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে?

আজও বীর মুক্তিযুদ্ধারা বিনা চিকৎসায় ধুকে মরে।সন্তান হারা মা, স্বামী হারা বধুদের চোখের পানি কি আজও দূর করতে পেরেছি।স্বাধীন দেশে আজও অলিতে-গলিতে লাশের মিছিল চোখে পরে।ধর্ষিতার আত্মচিৎকার আজো শুনি স্বাধীন এই দেশে।লুটতারাজ, দুর্নীতি আর চোরাকারবারে চ্যাম্পিয়ন আমার দেশ ।আজও মাটিতে লাশের নগ্ন নৃত্য চোখে পরে।ক্ষমতার লড়ায়ে আজ দেশের কোটি কোটি টাকার অর্থ বিনষ্ট করা হচ্ছে।তারপরও কিভাবে বলি আমাদের দেশ আজ স্বাধীন?

৩. ১৯৭১ এর সংগ্রামে ওলামায়ে কেরামের ভূমিকা

১৯৭১ সাল।পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে জীবন বাজি রেখে লড়াই করেছেন এদেশের মুক্তিকামী সর্বশ্রেণীর মানুষ।যাদের অবদান অস্বীকার করার কোন অবকাশ নেই।দেশের মুক্তিকামী সৈনিকদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দেশ রক্ষায় ঝাপিয়ে পড়েছেন দ্বীধাহীন ভাবে।পিছিয়ে ছিলেন না, এদেশের আলেম ওলামা।নিজে যুদ্ধ করার পাশাপাশি উৎসাহিত করেছে লাখো মানুষকে।যাদের মাঝে উল্লেখ্যযোগ্য: মাওলানা আব্দুল হামীদ খান ভাসানী,মাও.আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশ,মাও.আহমাদুল্লাহ আশরাফ,মাও.উবায়দুল্লা­হ বিন সাঈদ জালালবাদী,মাও. ওলীউর রহমান,মুহাদ্দিস আব্দুস সোবাহান,শহীদ আল্লামা দানেশসহ অসংখ্য ওলামায়ে কেরাম।শুধু কি আলেম সমাজ? মাহান মুক্তিযুদ্ধে এদেশের মাদরাসাসমূহ ছিল এক একটি মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প।ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মেজর জিয়াউর রহমান পটিয়া মাদরাসায় অবস্থান নিয়েই চালু করেছিলেন কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র। আজও সেই অস্থায়ী বেতার কেন্দ্র “পটিয়া মাদরাসার মেহমানখানা” ইতিহাসের বিরল সাক্ষী হয়ে আছে।

৪. আজ আমাদের এই স্বাধীন দেশে অধিকাংশ মানুষ পারাধীনতার জিঞ্জিরে আবদ্ধ। শুধুমাত্র একটি বিশেষ দল করলেই সে মুক্তিযোদ্ধার ভুয়া সার্টিফিকেট নিয়ে দাপিয়ে বেড়ায়।যেন নতুন কোনন মেশিন। একপাশ দিয়ে রাজাকার দিলে অন্যপাশ দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা বের হয়।তাই তো, দেখা যায়, দলপ্রধান হয়েও রাজাকারদের সাথে এক টেবিলে বসে চা খায়! অনেকে তো আবার আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে। আর দলের বাইরে প্রায় সবাইকে রাজাকার আর পাকিস্তানি তকমা লাগিয়ে দেওয়া হয়। দেশের কোটি কোটি টাকা খরচ করে প্রতিবছর স্বাধীনতা উদযাপন করা হলেও স্বাধীনতার চাওয়া পাওয়া কেউ পূরণ করে না। নেচে গেয়ে আর অশ্লিলতার মহা উৎসবের মধ্য দিয়ে স্মরণ করা হয় মহান মুক্তিযোদ্ধাদের। অথচ, দরকার ছিল মহান শহীদদের জন্য কিছু করা। যাদের আত্মত্যাগে বিনিময় আমরা একটি দেশ পেলাম।পেলাম একটি লাল-সবুজের পতাকা।অন্তত তাদের কবরে শান্তির জন্য নামায, কোরআন তেলাওয়াত, দান সাদকা করা। জীবিতদের পূনর্বসনের ব্যবস্থা করা।চিকিৎসা, অন্ন, বস্ত্রসহ যাবতীয় প্রয়োজন মিটানো। কিন্তু আজ আমারা তার উল্টা চলি।যে দেশে দারিদ্রতার কষাঘাতে মুক্তিযোদ্ধা ধুকে মরে, সে দেশ কীভাবে স্বাধীন থাকে?

লেখক: শিক্ষার্থী, মেখল হামিয়ুচ্ছুন্নাহ মাদরাসা, হাটহাজারী, চট্টগ্রাম।