শ্রেণীবৈষম্য নিরসনে ইসলামী অর্থনীতির বিকল্প নেই

একুশে জার্নাল ডটকম

একুশে জার্নাল ডটকম

মার্চ ২৭ ২০১৯, ১৬:৪১

মুফতি আহমদ যাকারিয়া: বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক বৈষম্য, পুঁজিপতিদের দৌরাত্ম্য ও গরীব মানুষের উপর শোষণের মাত্রা দিন দিন বেড়েই চলছে। গুটিকয়েক লোকের হাতে বিপুল পরিমাণ সম্পদ কুক্ষিগত থাকার যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে আর তার ফলশ্রুতিতে সামাজিক বৈষম্য যেভাবে প্রকট আকার ধারণ করছে তা সত্যিই হতাশাজনক।

বিশ্বের বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থা আসলে একটা মুনাফালোভি ব্যবস্থা। এর সংস্কার করা এখনই প্রয়োজন। বিশ্বের সাধারণ মানুষের সংখ্যা ৯৯ শতাংশ হলেও অবশিষ্ট ১ শতাংশ দুর্নীতিবাজ ধনী ব্যক্তি ও ব্যাংকগুলো তাদেরকে শাষণ ও শোষণ করতেছে। শুধুমাত্র কর্পোরেট সংস্থাগুলোই প্রবৃদ্ধির সুবিধা ভোগ করতেছে। আবাসন, শিক্ষা, প্রশাসন ও স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় বাড়লেও মধ্যবিত্তের আয়ের তেমন কোন বৈপ্লবিক পরিবর্তন হচ্ছে না।

বাংলাদেশের কথাই ধরা যাক; বাংলাদেশে সম্পদ বন্টনে বৈষম্যের জন্য দারিদ্রসীমার নীচে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিভিন্ন সেবার ক্ষেত্রে অসম সুযোগ দারিদ্র্য হ্রাসে ব্যাঘাত সৃষ্টি করেছে। বিগত ২০ বছরে বাংলাদেশের আয়বৈষম্য বৃদ্ধি পেয়েছে শূন্য দশমিক ২৬ শতাংশ। খাদ্যমূল্যের ঊর্ধগতি, উচ্চ খাদ্য মূল্যস্ফীতি এই আয়বৈষম্যকে আরো বেশি ত্বরান্বিত করতে সহযোগিতা করেছে। প্রশ্ন হলো যে, এই সামাজিক অনাচার আর রাষ্ট্রীয় বৈষম্যের শিকার বর্তমান সমাজ ব্যবস্থার উত্তরোরণের উপায় কী? এবং এই সমস্যার সমাধানের সুষ্ঠু ও সুন্দর প্রক্রিয়া বা পদ্ধতি কেমন?

নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, একমাত্র ইসলামী অর্থব্যবস্থার মাধ্যমেই এই কৌলিন্য আর বিষাক্ত সমস্যার সমাধান সম্ভব। ইসলামী অর্থব্যবস্থার একটি সুন্দর বৈশিষ্ট্যই হলো যে, এক জায়গায় বা মুষ্টিমেয় কয়েকজন লোকের কাছে সম্পদ পুঞ্জীভূত ও কুক্ষিগত না থেকে সমাজের সর্বত্র সম্পদের সুষম আবর্তন ঘটতে থাকা। ইসলামী অর্থব্যবস্থায় সম্পদ নির্দিষ্ট কিছু লোকের কাছে কুক্ষিগত করার বিরুদ্ধে কঠোর সতর্কবার্তা ও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।

পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থার প্রধানতম ভুল হলো যে, তাতে সমাজের সকল স্তরের মানুষের মধ্যে সম্পদ প্রবাহের স্বাভাবিক আবর্তনের পথ বন্ধ হয়ে যায়। এবং পরিশেষে তা ধীরে ধীরে গুটিকয়েক লোকের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে যায়। আর এতে নির্দিষ্ট এসব লোকেরা সম্পদ কুক্ষিগত করে খেতে সহজতর হয়ে যায়। যার ফলশ্রুতিতে পুরো অর্থব্যবস্থাটাই নির্দিষ্ট কিছু লোকের ইচ্ছার অধীন হয়ে যায়। তারা সেটার রশি যেদিকে ঘোরাবে অর্থনীতির চাকা সেদিকে যেতে তখন বাধ্য হয়ে পড়ে। এমনকি প্রতিষ্ঠিত ও নির্বাচিত সরকার পর্যন্ত তাদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে। ফলে নির্দিষ্ট কিছু পুঁজিবাদী ও পুঁজিপতিদের অর্থ ও বৈভবলিপ্সার যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে যায় সাধারণ খেঁটে খাওয়া মানুষের আর্তি ও যন্ত্রণাকর বেদনার আর্তচিৎকার। পুঁজিবাদী দেশগুলোর দিকে তাকালে তার বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পারবেন।

নির্দিষ্ট কিছু লোকের কাছে সম্পদ পুঞ্জীভূত থাকা ইসলামের অর্থনৈতিক দর্শন অনুযায়ী চরম নিন্দনীয় ও অপরাধ বলে স্বীকৃত।

আল্লাহ্ কুরআনে বলেন: “যারা স্বর্ণ-রৌপ্য পুঞ্জীভূত করে রাখে এবং আল্লাহর রাস্তায় তা ব্যয় করে না, এসব ব্যক্তিদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সংবাদ দাও। যেদিন জাহান্নামের আগুনে তা উত্তপ্ত করা হবে এবং তা দ্বারা তাদের ললাট, পার্শ্বদেশ ও পিঠে দাগ দেওয়া হবে। এবং তখন বলা হবে যে, এই তো হলো তোমাদের সম্পদ; যা তোমরা নিজেদের জন্য পৃথিবীতে পুঞ্জীভূত করেছিলে। সুতরাং যা পুঞ্জীভূত করেছিলে তা এখন আস্বাদন করো।” (তাওবাহ-৩৪-৩৫)

ইসলামী অর্থনীতির মূল উদ্দেশ্যই হলো যে, নির্দিষ্ট কিছু লোকের কাছে সম্পদ পুঞ্জীভূত না থাকা বরং সমাজের সবক্ষেত্রে সকল স্তরের লোকের কাছে সম্পদ তার পরিমাণ মতো সুষমভাবে সুষ্ঠু ও সুন্দর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আবর্তিত হওয়া।

আল্লাহ্ কুরআনে ইরশাদ করেন: “তোমাদের মধ্যে যারা বিত্তশালী শুধুমাত্র তাদের মধ্যেই যেন সম্পদ আবর্তন না করে।” ( হাশর-৭)

ইসলামের আবশ্যকীয় কিছু বিধানের মধ্যে রয়েছে যাকাত, ফিতরা, সদকা, উশর-খুমুস, সময় অনুপাতে এগুলো মানবের উপর ফরজ ও ওয়াজিব হয়ে থাকে। আর এসব বিধান কার্যকরের মাধ্যমেই সম্পদ আবর্তনের জন্য এক সুন্দর ও সুষম প্রবাহ চলমান রাখা হয়েছে। কুরআনের এ বিধান সুষম তারল্যে যতদিন চলবে ততদিন পৃথিবীর বুকে ইনসাফ আর ন্যায়-নিষ্টতা বহমান থাকবে এবং মানুষের সুখের শ্রোতধারা বইতে থাকবে; আর যদি এর ব্যতিক্রম করে মানব রচিত আইনের আওতায় এনে অর্থনীতি পরিচালনা করা হয় তাহলে এর দ্বারা সামষ্টিক সাফল্য ও দীর্ঘস্থায়ী কল্যাণ সম্ভব হবে না। কল্যাণ যে হবে না তার জ্বলন্ত উদাহরণ হলো আজকের রাক্ষুসে পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থা ও মৃতপ্রায় সমাজতান্ত্রীক ব্যবস্থা।

পৃথিবীর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, মানুষের মধ্যে ঐক্যের বন্ধন ছাড়া সার্বিক সফলতা অর্জন অসম্ভব। আর এই অনৈক্য আর শ্রেণীবৈষম্যের সৃষ্টি হয়ে থাকে মূলত সম্পদ বন্টনের যে নৈতিক নীতি রয়েছে তা পরিহার করে অসম নীতি অবলম্বন করার মাধ্যমে। এর দ্বারা এক শ্রেণীর লোকেরা সম্পদের পাহাড় গড়ে আর অপরদিকে সমাজের অন্য আরেক শ্রেণীর লোকেরা চরম দারিদ্র্যের মধ্যে থেকে মানবেতর জীবন যাপন করে জীবনের স্বাদ গ্রহণ করতে ব্যর্থ চেষ্টারত।

ইসলামের যাকাত ভিত্তিক অর্থব্যবস্থার সঠিক প্রয়োগ এবং সম্পদের সুদমুক্ত বন্টনের বিভেদ-বৈষম্যহীন নীতি মনুষ্য সমাজ থেকে দারিদ্র্য বিমোচন ও সমতার সমাজ গঠনে কার্যকর ও বাস্তবসম্মত অবদান রাখতে সক্ষম।

মূলত সাম্রাজ্যবাদী দর্শনে যেদিন থেকে বৈষম্য স্বীকৃতি পেয়েছে সেদিন থেকেই শ্রেণীসংগ্রামের সূত্রপাত ঘটেছে। পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার এই অশুভ জাল থেকে পরিত্রাণের একমাত্র উপায় হলো ইসলামের সুষম সম্পদবন্টন নীতি, ইনসাফসম্মত, বৈষম্যহীন সমাজ ব্যবস্থার পরিপূর্ণ অনুসরণ ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে।

চরম অশান্তি আর বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়ে আজ বিশ্ব ব্যবস্থা। সমস্যা জর্জরিত বিশ্বকে ইসলামের বৈষম্যবিবর্জিত সমাজ ব্যবস্থার দিকে ফিরে যাওয়ার বিকল্প নেই। কারণ ইসলামেই শান্তি আর ইসলামেই মুক্তি।