শিশুশ্রম; দেশের জন্য রেড সিগন্যাল— মোঃ জাফর আলী

একুশে জার্নাল ডটকম

একুশে জার্নাল ডটকম

জুন ১২ ২০২০, ১৪:১৪

যে সময়ে একটা শিশু তার মায়ের মমতাময়ী ও বিশ্বস্ত হাতের নাগালে থেকে আনন্দে আনন্দে বড় হওয়ার কথা, বিদ্যালয়ের নকশাখচিত দেয়ালের কক্ষে, মসৃণ বেঞ্চে বসে শিক্ষক-শিক্ষিকার হাসিমাখা মুখের বাণী শোনার কথা, যে সময় প্রতি বিকেলে সহপাঠীদের সাথে খেলাধুলা করে, আবার মায়ের কোলে ফিরে ঘুম পাড়ানি গান শুনে ঘুমোতে যাওয়ার কথা, ঠিক সে সময়, আয়রন কারখানায়, ইটভাটায়, যানবাহনে, ট্যানারি কারখানায় ও বিভিন্ন রাসায়নিক কারখানার বিপজ্জনক পরিবেশে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শিশুর হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমই শিশুশ্রমকে সংজ্ঞায়িত করে। যেটি একটা দেশ ও জাতির জন্য কখনোই ভাল দিক হতে পারেনা।

বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার একটি উন্নয়নশীল দেশ। এ দেশের মাথাপিছু আয় ১৯০৯ মার্কিন ডলার। “ওয়ার্ল্ড লেটেস্ট আল্ট্রা ওয়েলথ রিপোর্ট ২০১৮” অনুসারে বিশ্বে অতি ধনী বৃদ্ধির তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষস্থানে। যার বৃদ্ধির হার ১৭.৩ শতাংশ। অতি ধনী তারাই যাদের আড়াইশো কোটি টাকার বেশি সম্পদ রয়েছে। অনেক সময় সিঙ্গাপুর ও কানাডাসহ বেশ কিছু উন্নত দেশগুলোর শীর্ষ ধনীদের তালিকায়ও বাংলাদেশী নাগরিকদের নাম দেখা যায়। বিশ্ব অর্থনীতিতে দ্রুত বর্ধনশীল দেশের মধ্যে পঞ্চম স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ । বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার “ওয়ার্ল্ড ট্রেড স্ট্যাটিসটিক্যাল রিভিউ -২০১৯” শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বে যে কয়টি দেশের রপ্তানি আয় বৃদ্ধি পাচ্ছে তার মধ্যে ভিয়েতনামের পরেই বাংলাদেশ দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। সব মিলিয়ে বিশ্ব বাণিজ্যে বাংলাদেশ ৪২ তম বড় রপ্তানিকারক দেশ। স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের অর্থনীতি আর বর্তমানের এই অগ্রগামী অর্থনীতিতে আকাশ-জমিন তফাৎ। বাংলাদেশের এত অর্থনৈতিক স্বাবলম্বীতার পরও একটি চরম বাস্তবতা হল যে, অতি ধনী বৃদ্ধির পাশাপাশি দারিদ্র্যের পরিমাণও অনেকটাই পূর্বের অবস্থায় থাকছে। অর্থাৎ ধনীরা ধনী হচ্ছে আর গরীবরা গরীবই থাকছে। যার কারণে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যকার শিশুরা অভাবের তাড়নায় দারিদ্র্যের রোষানলে পড়ে ও জীবন চালানোর দায়ে বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে অংশ নিতেও দ্বিধাবোধ করছে না।

২০১৯ সালে, আইএলওর তথ্য অনুযায়ী বিশ্বে ১৫ কোটি ২০ লাখ শিশু, শিশুশ্রমের স্বীকার। এর মধ্যকার ৭ কোটি ৩০ লাখেরও বেশি শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত। এভাবে বাংলাদেশেও শিশু শ্রমের পরিমাণ অনেক বেশি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর, ২০১৬ সালের পরিসংখ্যানেই সাড়ে ৩৪ লাখ কর্মরত শিশুর কথা বলা হয়েছে। লাইভ টিভির এক প্রতিবেদনে প্রকাশিত, সরকারি তথ্যের ভিত্তিতে, বাংলাদেশে ৪৫ লাখ শিশুর ঝুঁকিপূর্ণ কাজের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি শুধু রাজধানীতেই ১৭ লাখেরও বেশি শিশুশ্রমিক রয়েছে। এসব শিশু চরম অভাবের দরুন পরিবারের সান্নিধ্য ছেড়ে, ভালো-মন্দ না বুঝে, অপ্রাপ্ত বয়সেই বেরিয়ে পড়ছে জীবিকার তাগিদে। ছোটখাটো কাজ থেকে শুরু করে ব্যাপক ঝুঁকিপূর্ণ কাজকেও পরিস্থিতির শিকার হয়ে বেছে নিচ্ছে। এগুলোর মধ্যে কৃষি, মাটিকাটা, যানবাহন, ইটভাটা, প্লাস্টিক কারখানা, বিভিন্ন তৈজসপত্র তৈরির ও আয়রন কারখানা, ঝালাই, প্রে-প্রেইন্টিং, অটোমোবাইল গ্যারেজের কাজসহ বিভিন্ন রকমের অনিরাপদ ও কঠিন কাজ উল্লেখযোগ্য। এসমস্ত কল কারখানার পরিবেশ দূষণ ও নিরাপত্তার অভাবজনিত কারণে অনেক শিশু চর্মরোগ, শ্বাসকষ্ট, শ্রবণবৈকল্য ও দৃষ্টিজনিত সমস্যাসহ বহু রোগে আক্রান্ত হচ্ছে এবং অধিকাংশ সময় তাদের সুচিকিৎসার ভারও কেউ নিচ্ছে না। এ সমস্ত কারখানার শিশু শ্রমিকদের মধ্যকার ৫৭ শতাংশ শিশু মারধরের শিকার ও ৪৬ শতাংশ শিশুর সাথে প্রতিনিয়ত খারাপ আচরণ করা হয়। তাছাড়াও এই শিশুদের মধ্যে বিরাট সংখ্যক কন্যা শিশু রয়েছে। যারা খুবই অল্প বেতনে বা দুই তিন বেলা খাবারের বিনিময়ে দিনরাত অন্যের বাসায় পরিশ্রম করে যাচ্ছে। কোন ত্রুটি পেলেই তিলকে তাল বানিয়ে তাদেরকে দিনের পর দিন শারীরিকভাবে জখম এবং মানসিক নির্যাতন করা হচ্ছে। এমনকি শিশু গৃহকর্মী ধর্ষণের মতো ঘটনাও ঘটছে অহরহ। “নারীমৈত্রী” এর প্রতিবেদন অনুযায়ী ৯৫ শতাংশই গৃহকর্তা বা গৃহকর্ত্রীর নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। তাছাড়াও তাদেরকে পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুম ও খাবারের ব্যবস্থাও করা হয় না। চিত্তবিনোদনের তো সুযোগই নেই। গবেষণায় দেখা গেছে, ৭৯ শতাংশ শিশুশ্রমিকই প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন না হতেই ঝরে পড়ে এবং কাজে জড়িয়ে পড়ে।

বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ অনুযায়ী ১৪ বছর পর্যন্ত বয়সীদের শিশু আর ১৪ থেকে ১৮ বছর বয়সীদের কিশোর বলা হয়েছে। শ্রম আইন অনুযায়ী কোন শিশুকে কোন প্রতিষ্ঠানে বা পেশায় নিয়োগ দেয়া যাবে না এবং কিশোরদের যদি নিয়োগ দেয়া হয় তাহলে রেজিস্টার্ড চিকিৎসক থেকে “সার্টিফিকেট অফ ফিটনেস” নিয়ে নিয়োগ দিতে হবে। এত বাঁধা-ধরা সুস্পষ্ট আইন থাকা সত্ত্বেও এবং সরকার ঝুঁকিপূর্ণ ৩৮ টি কাজে শিশুশ্রম নিষিদ্ধ করলেও আইনের তোয়াক্কাই যেন করা হচ্ছে না। প্রশাসন কর্তৃক অধিকাংশ ক্ষেত্রে কোন ব্যবস্থাই গ্রহণ করা হয় না। আবার সরকারিভাবেও নেই নজরদারির ব্যবস্থা।

রাজধানীর নিউমার্কেট থেকে ফার্মগেট গামী হিউম্যান হলার অথবা লেগুনায়ও ৯ বা ১০ বছরের শিশুদের দরজায় ঝুলে ঝুলে হেলপারি করতে দেখা যায়। বহু বেলুন তৈরির কারখানায় খোলামেলাভাবেই বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক পদার্থ দিয়ে কাজ করছে অনেক শিশু। সপ্তাহে সাত দিন সকাল সন্ধ্যাই তাদের কাজ করতে হয়। সিলভারের তৈজসপত্র তৈরীর কারখানার উচ্চ শব্দের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ ও অন্যান্য অনেক কারখানায় রাসায়নিক মিশ্রিত বিভিন্ন কাজও করতে দেখা যায় তাদের। ইট ভাটার শিশু শ্রমিকরা ৩ কেজি ওজনের একেকটি ইটের ৬ টি বা তারও অধিক সংখ্যক ইট একবারে বহন করে কয়েকশ গজ দূরে নিয়ে, এক হাজার ইটে বেতন পায় মাত্র ১০০ থেকে ১২০ টাকা।এভাবে দেশের সকল স্থানেই অপরিপক্ক শিশুদের বিভিন্ন পেশায় খাটানো হচ্ছে।

২০১৫ সালের ২৫ এ সেপ্টেম্বর, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭০ তম অধিবেশনে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট “২০৩০ এজেন্ডা” গৃহীত হয়। যেটি সারা বিশ্বের শান্তি, সমৃদ্ধি ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিতকরণের একটি কর্মপরিকল্পনা। যা সারা বিশ্বে শান্তি জোরদার করবে, ক্ষুধা ও দারিদ্র্য সহ সকল অভিশপ্ত বৈষম্যের অবসান ঘটাবে। এ লক্ষমাত্রা অনুযায়ী, ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত কর্মসূচির বাস্তবায়নও শিশুশ্রম প্রতিরোধের মাইলফলক হতে পারে। কারণ, শিশুশ্রমের উৎপত্তি দরিদ্রতা থেকেই।

এই শিশুশ্রমের সবচেয়ে বড় কুফল হলো, এদের মধ্যকার বিরাট সংখ্যক শিশুই শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এজন্য শিশুরা বড় হতে হতে তাদের মধ্যে শিক্ষার আলো না থাকায়, ব্যক্তিত্ব, মেধা, মানসিক শক্তি, শারীরিক সামর্থ্য, মানবতা, ভাষা, সভ্যতা, দেশ, আইন ও মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের বিকাশ ঘটে না। যার ফলে বড় হওয়ার পর তাদের দ্বারা বিভিন্ন অপরাধের আশঙ্কা থাকে। যা একটা দেশে খুবই খারাপ প্রভাব ফেলতে পারে। এজন্য বাংলাদেশের সরকারকে শিশু শ্রমের ওপর পরিপূর্ণরূপে একটি জরিপ পরিচালনা করে, নতুন পরিকল্পনায় শিশুশ্রম রোধে অগ্রসর হতে হবে এবং আইনের প্রয়োগ ঘটাতে হবে। পাশাপাশি সকল ধনী, অতি ধনী ও স্বাবলম্বী মানুষদেরও শিশুশ্রম নামের এই অভিশাপ থেকে মুক্তির জন্য এগিয়ে আসা অতীব জরুরী। নয় এভাবে চলতে থাকলে শিশুশ্রম দেশের জন্য রেড সিগনাল হয়ে দাঁড়াবে।

মোঃ জাফর আলী। শিক্ষার্থী, শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগ। হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।