মাওলানা আনছারীর মৃত্যুতে কয়েকজন বিশিষ্ট আলেমের অনুভূতি

একুশে জার্নাল

একুশে জার্নাল

এপ্রিল ১৮ ২০২০, ২২:১৯

বরেণ্য বক্তা, প্রখ্যাত মুফাসসিরে কোরআন, বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মাওলানা জুবায়ের আহমদ আনসারী (রহ.) এর মৃত্যুতে সর্বসাধারণের মত শোকের ছায়া নেমে এসেছে আলেম সমাজেও। কয়েকজন বিশিষ্ট ওলামায়ে কেরাম তাদের অনুভূতি প্রকাশ করেছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নিজ নিজ আইডিতে। একুশে জার্নাল ডটকম এর পাঠকদের জন্য তাদের লেখাগুলো হুবহু তুলে ধরছেন- ইলিয়াস সারোয়ার


মাওলানা আব্দুর রব ইউসুফী

আল্লাহ্ তা’আলা আনসারী সাহেবের খেদমতগুলোকে কবুল করুন।।

দেশের প্রখ্যাত মুফাস্সিরে কুরআন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমীর মাওলানা যুবাইর আহমদ আনসারীর মাগফিরাত কামনা করছি। আণ্লাহ্ তা’আলা যেন তাঁর যাবতীয় খেদমত কবুল করে জান্নাতে আ’লা মাক্বাম দান করেন। তাঁর ইন্তেক্বালে দেশবাসী একজন দ্বীনের সহীহ্ পতাকাবাহীকে হারাল।আল্ণাহ্ তা’লা মরহুমের পরিবার পরিজনকে ধৈর্য্য ধারন করার তাওফীক দিন এবং তাদের কফীল ও জিম্মাদার হয়ে যান।


মুফতি মিযানুর রহমান সাঈদ

একজন প্রাণের মানুষ, প্রিয় একজন বন্ধুকে হারিয়ে অস্থির অবস্থায় রাত কাটাতে হচ্ছে আজ। যিনি ছিলেন অতি বিনয়ী, উত্তম চরিত্রের অধিকারী, পরমধৈর্যশীল, মুখলিস দায়ী, বিশ্ব নন্দিত মুফাস্সির, ওয়াজ জগতের মুকুটহীন সম্রাট। যিনি সম্মান দিতে জানতেন ছোটকেও, নিন্দুকদেরকেউ বরণ করে নিতেন প্রশস্ত হৃদয়ের ভালবাসা ও শ্রদ্ধা দিয়ে, সর্বদা রিজা বিল্ কাযা ছিল তার বড় বৈশিষ্ট। তিনি আর কেউ না তিনিই আমার বন্ধুবর আল্লামা হাফেজ যুবায়ের আহমেদ আনসারি রহ.। দুআ করি এই সোনার মানুষটির জন্য:
اللهم ارحمه رحمة واسعه واغفرله واعف عنه وتجاوز عن سيئاته وتقبل جميع حسناته ووسع مدخله واكرم نزله واسكنه فسيح جناتك و انزل السكينة والطمأنينة في قبره واجعله روضة من رياض الجنة ولا تجعله حفرة من حفر النيران.


মাওলানা উবায়দুর রহমান খান নদভী

জুমার পবিত্র দিনের শেষভাগে চলে গেলেন, দীনের এক প্রতিভাবান খাদেম। জীবনের অমূল্য সময়, শক্তি ও মেধা যার নিবেদিত ছিলো আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের সাধনায়। আল্লাহ তাঁকে জান্নাতের উচ্চ মাকাম দান করুন। স্বজনদের সবরে জামীল দেন। তাঁর দীনি কাজগুলো অব্যাহত থাকার সুব্যবস্থা করুন।


মুফতি ফয়জুল্লাহ

বিখ্যাত আলেমে-দ্বীন, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ওয়ায়েজ ও দা’য়ী, বেড়তলা জামিয়া রহমানিয়া’র মুহতামিম,মাওলানা হাফেজ জুবায়ের আহমদ আনসারী সাহেব রহ, আজ (১৭/০৪/২০২০) জুমাবার মাগরীবের পূর্ব মুহুর্তে নিজ বাসা থেকে রফীকে আ’লার ডাকে সাড়া দিয়েছেন। إنا لله وإنا إليه راجعون

মরহুমের নামাযে জানাযা আগামী কাল সকাল ১০টায় জামিয়া রহমানিয়া বেড়তলা মাদ্রাসা (সরাইল, বি,বাড়ীয়া) মাঠে অনুষ্ঠিত হবে; ইনশাআল্লাহ।

মাওলানা যোবায়ের আহমদ আনসারী সাহেব রহ, ছিলেন ইসলাম-মুসলমানের একনিষ্ঠ, মুখলিস খাদেম। একজন হক্কানী আলেম এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তাঁর ইন্তেকালে মুসলিম মিল্লাত হারিয়েছে দ্বীনের একজন প্রকৃত দা’য়ীকে। আমি হারালাম একজন অকৃত্রিম বন্ধু ও দিনী ভাইকে।

আমি মাওলানা আনসারী সাহেব রহ’র বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবন ও ইসলাম প্রচারে তাঁর অনবদ্য অবদানের কথা গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি। স্বরণ করছি,বহু ঈমানী আন্দোলনে তাঁর বিশেষ ভূমিকার কথা। দেশে-বিদেশে আমরা এক সাথে বহু প্রোগ্রাম করেছি। খুব ঘনিষ্ঠ ভাবে মিশেছি। দীনের প্রতি তাঁর আবেগ, দরদ, মানুষের প্রতি তাঁর ভালোবাসা স্বচক্ষে দেখেছি। তাঁর ইন্তিকাল নিশ্চয় আলেম সমাজ ও দেশের জন্য অনেক বড় ক্ষতি। তার ইন্তেকালে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে তা সহজে পূরণ হবার নয়।

খ্যতিমান এই আলেম দা’য়ী’র ইন্তেকালে আমি গভীর শোক প্রকাশ করছি। আমি তাঁর মাগফিরাত কামনা করছি এবং শোকসন্তপ্ত পরিবার, আত্মীয়,স্বজন, তাঁর ছাত্র এবং সহকর্মী ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি গভীর সমাবেদনা জানাচ্ছি।

দেশবরেন্য বিখ্যাত আলেম, মরহুম আনসারী রহ,’র মাগফিরাতের জন্য আমরা মহান আল্লাহর শাহী দরবারে মুনাজাত করছি, আল্লাহ! আপনি আপনার এই প্রিয় মুখলিস,আলেম বান্দাহকে আপনার রহমতের চাদরে আবৃত করে জান্নাতুল ফিরদাউসের সম্মানিত মেহমান করে নিন। আমীন।


মুফতী খন্দকার মোজাম্মিল হক

আর পারব না পাশে দাঁড়াতে কিংবা বসতে । সে দিনের হল ভর্তি মানুষের সামনে প্রবেশ করেই মুফতি মুজাম্মিল আসে নাই?বললাম জী হযরত আসছি। তিনি বললেন, পিছনে কেন সামনে আসো!

এই দরদ আর কোথায় পাব? তারপর কমপক্ষে তিন চার মিনিট আমার সম্পর্কে ভরা মজলিসে কথা বললেন। প্রিয় রাহবর ক্ষমা করবেন। গতকাল থেকে বারবার চোখের পানি মুছতেছি কিন্তু না অশ্রু কোন বাধা মানে না।হে আল্লাহ তুমি তোমার এ বন্ধুকে জান্নাতের সর্বোচ্চ সম্মান দান করো।


মাওলানা রুহুল আমিন সাদী (সাইমুম সাদী)

আল্লামা আনসারী রহ, কে নিয়ে অনেক কথাই মনে পড়ছে। হয়ত পরবর্তীতে লিখব।

কিন্তু আমরা যারা তাকে দেখেছি, সংস্পর্শ পেয়েছি নিজেদেরকে সৌভাগ্যবান মনে করি এমন ব্যাক্তিত্বের সান্নিধ্য পেয়েছি এজন্য।

যদিও সাংগঠনিক কারণে উনার বাসায় গিয়েছি দিনের পর দিন, সেই নব্বুইয়ের দশক থেকে, কিন্তু আজকের আল্লামা আনসারী এবং আগের আনসারীর আচরণ এবং আন্তরিকতার মধ্যে কোনও ঘাটতি পাইনি।

এতবড় মাপের ওয়ায়েজ, কোনো অহংকার, আত্মম্ভরিতা, হাদিয়া নিয়ে প্রচলিত ক্যাচাল, অহেতুক বিতর্ক সৃষ্টি, বানানো গালগল্প বলে শ্রোতা আকৃষ্ট করার পদ্ধতি এসব কিছুই ছিলনা তারমধ্যে। অনেক মাদ্রাসায় ওয়াজ করে হাদিয়া আনা দুরের কথা উল্টো গরিবী হালত দেখে টাকা দিয়ে আসতেন তিনি।

দীর্ঘদিনের এই পথচলায় বয়ানের ময়দানে কোনও বিতর্ক তৈরি হয়নি তাকে নিয়ে। সকল মত ও পথের মানুষকে কাছে টানার এক অদ্ভুত যোগ্যতা ছিলো তার।

সুরেলা কণ্ঠস্বর ছিলো তার। মন উদাস করা পাগল করা কন্ঠ দিয়ে মানুষকে দাওয়াত দিতেন কুরআনের দিকে।

তিনি আধুনিক সময়ের বক্তাদের নিয়ে আফসোস করে বলতেন, কি দরকার বানানো কেচ্ছা কাহিনী বয়ানে বলার? কুরআন হাদিসে এত বেশি কাহিনি আছে সেগুলো বলতে বলতে একজন মানুষের সারাজীবন চলে যেতে পারে। কিন্তু ওরা কুরআন হাদিস স্টাডি করেনা।

আমার শশুড় হাফেজ নুরুজ্জামান সাহেবের বন্ধু ছিলেন, তাই সাংগঠনিক পরিসরে অন্যদেরকে ভাই বললেও আমাকে জামাই বলে সম্বোধন করতেন। প্রায় চার মাস আগে আমাকে ডেকেছিলেন তার মাদ্রাসায়।

কথা ক্লিয়ার হতনা, কিন্তু খুব আন্তরিকতা সহকারে সময় দিলেন, কথা বললেন। দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পর বিদায় নিয়ে যখন ফিরে আসছিলাম, সিড়ি দিয়ে নামার সময় আমার পকেটে হাত ঢুকিয়ে কি যেনো রেখে দিলেন। বললেন, এ বছর মাহফিল করতে পারব বলে মনে হচ্ছেনা। বাসায় আপনার সন্তানদের জন্য কিছু কিনে নিয়েন।

পকেটে হাত দিয়ে দেখি তিন হাজার টাকা। তার এই অসুস্থতার পরও টাকাটা ফেরত দিতে পারলামনা কষ্ট পাবেন এজন্য।

টাকাটা খরচ করে ফেলেছি কিন্তু তার জন্য বুকভরা ভালবাসা জমা রেখেছি। কিয়ামতের দিন আল্লাহকে বলতে পারব, এই কুরআনের পাখি আমাদেরকে ভালবাসতেন আমরাও তাকে ভালবাসতাম। তার সাথেই আমাদেরকে যেতে দাও মাবুদ।


মাওলানা গাজী সানাউল্লাহ রাহমানী

মাত্র ঊনষাট বছর বয়সে পৃথিবীকে বিদায় জানালেন মাওলানা জুবায়ের আহমদ আনসারী। আকাশ ছোঁয়া জনপ্রিয় মুফাসসিরে কোরআন। জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠেও যিনি ছিলেন মাটির মানুষ। তার জীবন যেমন সুন্দর ছিলো,তার মৃত্যুটাও তেমন সুন্দর হলো। বেচে থাকতে সকলের প্রিয় ছিলেন। মৃত্যুর পরেও লাখো মানুষের ভালবাসা ও দোয়ায় স্নাত হলেন। কত চমৎকার মৃত্যু ছিল তার, কত সুন্দর করে হলো আলোকিত জীবনের পরিসমাপ্তি। সারাটা জীবন কাটালেন কোরআনের খেদমত। জীবনের শেষ লগ্নে ও মাথা রাখলেন কুরআনী কাননে। নিশ্চয়ই এমন মৃত্যু সৌভাগ্যের। এমন মৃত্যু কত না বরকতের।

একজন মানুষ তার জীবনে অনেক কিছুই করে । অর্থ, বিত্ত, ক্ষমতা অনেক কিছুই লাভ করতে পারে। কিন্তু জীবনের পরিসমাপ্তি কতজনের সুন্দর হয়! জীবনের শেষ মুহূর্ত টা কত সুন্দর ভাবে শেষ করতে পারে মানুষ!! মৃত্যুর পর একটি জীবন আছে আমাদের, যে জীবন মহাসত্য। যে জীবন অনন্ত। দুনিয়ার জীবনটা টেনেটুনে চলে গেলেও, পরকালীন সেই জীবনটা চাই সুন্দর ও প্রশান্ত।

আনসারি সাহেব বক্তা ছিলেন, রাজনীতিবিদ ছিলেন, সংসদ সদস্য নির্বাচন করেছেন। আমার একান্ত ভাবনায় এগুলি তার মৌলিক কোনো পরিচয় নয়, বরং তিনি ছিলেন কোরআনের পাখি। কোরআনের বাণী প্রচারে ছুটে বেরিয়েছেন সারা পৃথিবী। সবকিছুর পরে নিজের পরকালীন জীবনের ঠিকানা গেড়েছেন কুরআনের বাগানে। এখানেই শুয়ে থেকে সব সময় শুনতে পাবেন কুরআন তেলাওয়াতের সুমধুর সুর। তার কবর ছেয়ে যাবে কোরআনের সুর লহরীতে।

আমাদের অনেকের স্বপ্ন থাকে, একটি দামি ফ্ল্যাট, একটি লেটেস্ট মডেলের দামী গাড়ি, 7 ডিজিটের একটি মাসিক ইনকাম। চারটি ইন্টারন্যাশনাল ক্রেডিট কার্ড। আরো কত কি !! আনসারী সাহেব বুঝিয়ে দিলেন জীবনের শেষ ঠিকানা টি যদি সুন্দর হয় তবে তোমার জীবন সুন্দর। তোমার মরন সুন্দর । নয়তো সব কিছুই বৃথা।

মনে মনে ভাবছি, সুন্দর একটি মাদ্রাসার গড়ে তুলবো। হোক না ছোট পরিসরে ! এক টুকরো বাগান সেখানে থাকবে। আর থাকবে অনিন্দ্য সুন্দর একটা মসজিদ। এবং একপাশে একটি হিফজুল কোরআন বিভাগ। আর থাকবে আমার মৃত্যুর পর একটি কবর। সেখানে শুয়ে আমি যেন শুনতে পাই তেলাওয়াতে কোরআন। নিষ্পাপ কন্ঠের দোয়া ও মোনাজাত। কেয়ামত পর্যন্ত।

হে রব, কবুল করুন পাপি হৃদয়ৃর এ দোয়া। গোনাহগার অন্তরের এ তামান্না। জীবনকে সুন্দর করুন। শান্তিময় করুন। আর মৃত্যুকেও প্রশান্তিময় করুন। আখেরাতকে আলোকিত করুন। আমার, আমাদের এবং সকলের। আমিন।


মুফতী সাঈদ কাদির

মাঠের বক্তাদের মধ্যে হাতেগোণা কয়েকজনের ওয়াজ শুনি। তন্মধ্যে কুরআনের পাখি মাওলানা যুবায়ের আহমদ আনসারী (রহ.) ছিলেন অন্যতম।

গওহরডাঙ্গা পড়াকালীন তাঁর বয়ান প্রথম শুনি গওহরবাগের বার্ষিক মাহফিলে। তাঁর সামান্য খেদমত করারও সুযোগ হয় তখন। তিনি ওয়ায়েজ হিসাবে যতটুকু কিংবদন্তী ছিলেন মানুষ হিসাবে তার চেয়ে আরও বেশি ভালো মানুষ ছিলেন।

তিনি চলে গেলেন। সত্যিকারের ওয়ায়েজরা চলে যাচ্ছেন। তাঁর বা তাঁদের স্থলাভিষিক্ত যোগ্য দায়ী আল্লাহ আমাদের দেশে দান করুন।

দুঃখ হচ্ছে — এমন এক সময়ে প্রিয় হযরত চলে গেলেন, তাঁর জানাযায় হয়তো শরীক হতে পারব না। ইয়া রব, তাঁকে জান্নাতুল ফেরদাউস দান করো।