মহানবী (সা.) এর পূর্বপুরুষদের পুত-পবিত্রতা

একুশে জার্নাল ডটকম

একুশে জার্নাল ডটকম

মার্চ ০৮ ২০১৯, ১৮:১৩

আহমদ কবীর খলীল:: বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পুর্বপুরুষদের ক্রমধারায় যারা রয়েছেন তাদের মান-মর্যাদার আলোচনা করার অপেক্ষা রাখেনা। তদোপরি বক্ষমান কলামে তাদের চারিত্রিক পুত-পবিত্রতার বিষয়টি স্বতন্ত্র ভাবে আলোচনা করতে চাচ্ছি। এব্যাপারে আল্লামা ইদ্রিস কান্দলবী কর্তৃক লিখিত ‘সীরাতে মুস্তফা’- এর ১ম খন্ডে, সুরা তাওবার “لقد جاءکم رسول من انفسکم ” আয়াতটি উল্লেখ করে তার ব্যাখ্যায় হযরত আনাস রা. থেকে বর্ণনা করা হয়েছে যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আয়াতটি তেলাওয়াত করার সময় ” আনফুসিকুম” শব্দের “ফা” অক্ষরে যবর দিয়ে “আনফাসিকুম”ও পড়েছেন। তখন আয়াতটির অর্থ দাড়ায় “তোমাদের নিকট একজন রাসুল এসেছেন তোমাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা সম্ভ্রান্ত, ও পুত-পবিত্র বংশধারা থেকে “।

আয়াতটি তেলাওয়াত করার পর রাসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন- আমি তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত, মর্যাদাশীল ও পুত-পবিত্র বংশধারার অধিকারী। হযরত আদম আ. থেকে আমার বাপ, দাদা পর্যন্ত পুর্ণ বংশ ধারায় কোথাও কোনো ব্যভিচারের লেশমাত্র নাই। সকলেই ছিলেন বিবাহের মাধ্যমে আগত। আয়াতটির এরকম তাফসীর আরও কিছু রেওয়ায়াতে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকেও বর্ণিত হয়েছে।

ইমাম কুরতুবী রহ. আয়াতটির তাফসীরে একাধিক রেওয়াত উল্লেখ পুর্বক বলেন যে, আয়াতটি নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বংশ ধারার মর্যাদা ও পুত-পবিত্রতার উপর সুস্পষ্ট প্রমাণ বহন করে। ( সুত্রঃ তাফসীরে কুরতুবী, সুরা তাওবার ১২৮ নং আয়াতের ব্যাখ্যা দ্রষ্টব্য)

সুরা শুআরার ২১৯ নং আয়াত وتقلبک فی السّٰجدین
এর ব্যাখ্যায় ইবনে আব্বাস রা. বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সদা সর্বদা এক নবীর পরে আরেক নবীর ঔরসজাত হয়ে শেষ পর্যন্ত তাঁর মাতৃ গর্ভে জন্ম লাভ করেন। ( সুত্রঃ আল খাসায়িসুল কুবরা, পৃঃ ৬৪, / তাফসীরে ক্বুরতুবী)।

বিভিন্ন হাদিসের দ্বারা এ কথাটি পরিস্কার বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত আদম আ. থেকে নিয়ে নবীজি সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পিতা-মাতা পর্যন্ত পুর্ণ বংশ ধারায় যতসব পুরুষ ও মহিলা রয়েছেন, তাদের প্রত্যেকেই ছিলেন পুত- পবিত্র চরিত্রের অধিকারী। তাদের কারো বংশ ও জন্মের সাথে ব্যবিচারের নুন্যতম সম্পর্কেরও কোনো প্রমাণ পরিলক্ষিত হয় না। বৈবাহিক ধারায় জন্ম লাভ কারী ছিলেন তাঁরা সকলেই। আল্লামা সুয়ুতী রহ. বিশুদ্ধ সনদে উল্লেখ করেন যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- হযরত আদম আ. থেকে নিয়ে বৈবাহিক ধারায় আমি আগমন করেছি। আমার বংশের ধারাবাহিকতায় কোথাও ব্যভিচারের কোনো স্পর্শ নেই। উক্ত বক্তব্যটি একাধিক রেওয়ায়াতে বর্ণিত হয়েছে। (সুত্রঃ আল খাসায়িসুল কুবরা, পৃঃ ৬৪- ৬৫)।

উক্ত রেওয়ায়াতগুলোর আলোকে আল্লামা ইদ্রিস কান্ধলবী রহ. বলেন- নবুওয়াত ও রিসালাতের মত মহান দায়িত্ব অর্পনের জন্য আল্লাহ পাক যাদেরকে মনোনীত করেছেন, তাদের বংশ ধারাকে এইরূপ পুত-পবিত্র ও স্বচ্ছ রেখেছেন। পবিত্র ঔরস ও স্বচ্ছ-সুন্দর মাতৃ গর্ভের মাধ্যমেই তাদেরকে এই ধরাধামে পাঠিয়েছেন। তিনি নবী, রাসুল হিসেবে যাদেরকে নির্বাচিত করেছেন, তাদের জন্য অনেক পুর্বেই তাদের বংশকে মনোনীত, পরিশীলিত ও পুত-পবিত্র করে রেখেছেন। ( সীরাতে মুস্তফা, খন্ড ১, পৃ . ২৬ / আল খাসায়িসুল কুবরা, পৃ. ৬৪ / আল লু’লুউল মাকনুন, ১ম খন্ড, পৃ. ৪৪) ।

ইফাবা কর্তৃক প্রকাশিত ‘ইসলামী বিশ্বকোষে’ বর্ণনা করা হয়েছে যে, আঁ হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বংশ ধারার এক একটি গ্রন্থি, যার সাথে তাঁর বংশ-সুত্র গ্রন্থিত, সম্মান মর্যাদায়, আভিজাত্য ও সুখ্যাতিতে এক একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ছিলেন। তাঁর পিতৃকুল ও মাতৃকুলের সকলেই সতী-সাধ্বী ও সম্ভ্রান্ত ছিলেন। সকলেই বৈবাহিক সুত্রের জাত ছিলেন। তাঁর সমগ্র খান্দানে কখনও কোনো ব্যক্তি ব্যবিচার কিংবা অনাচারে জড়িত হননি। বরং গোটা বংশ ধারাটি সম্মানিত ও খ্যাতনামা ব্যক্তিবর্গের সমষ্টি ছিল। যাদের সকলেই ছিলেন সমাজের গণ্য মান্য ও নেতৃস্থানীয়। বংশীয় আভিজাত্য ছিলো যাদের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। ( সুত্রঃ ইসলামী বিশ্বকোষ, খন্ড ২০, পৃ. ৫৬০)

মহানবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পূর্বপুরুষ সিলসিলা:

হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিন আব্দুল্লাহ, বিন আব্দুল মুত্তালিব (আসল নাম, শায়বাহ), বিন হাশিম (আসল নাম ‘আমর), বিন আবদে মানাফ (আসল নাম মুগীরাহ), বিন কুসাই (আনল নাম যায়েদ),বিন কিলাব, বিন মুররাহ, বিন কা‘ব, বিন লুওয়াই, বিন গালিব, বিন ফিহির, বিন মালিক, বিন নাজার (আসল নাম ক্বায়স),বিন কিনানাহ, বিন খুযায়মাহ, বিন মুদরিকাহ (আসল নাম আমির), বিন ইলিয়াস, বিন মুজার,বিন নিযার, বিন মাআদ্দ বিন আদনান বিন উদাদ, বিন হুমায়সা’, বিন সালামান, বিন আওস, বিন বূয, বিন ক্বিমওয়াল, বিন উবাই, বিন আওয়াম, বিন নাশিদ, বিন হিযা, বিন বালদাস, বিন ইয়াদলাফ, বিন ত্বাবিখ, বিন যাহিম, বিন নাহিশ, বিন মাখী, বিন আইয, বিন আ’বক্বার, বিন উবাইদ, বিন ইলদুআ, বিন হামদান, বিন সুনবর, বিন ইয়াসরবী, বিন ইয়াহযান, বিন ইয়ালহান, বিন আরআভী, বিন আইজ, বিন দীশান, বিন আইসার, বিন আফনাদ, বিন আইহাম, বিন মুক্বসির, বিন নাহিস, বিন যারিহ, বিন ছামী, বিন মাযী, বিন উ’যাহ, বিন ইরাম, বিন ক্বাইদার, বিন ইসামাঈল বিন ইবরাহীম (আঃ) বিন তারিহ (যিনি আযর নামে পরিচিত ) বিন নাহুর, বিন সারু’, (অথবা সারুগ) বিন রাউ’, বিন ফালেখ, বিন আবির, বিন শালেখ, বিন আরফাখশাদ,( অথবা আরফাখশিয) বিন সাম, বিন নূহ (আঃ), বিন লামিক, বিন মাতুশালাখ,বিন আখনুখ,(অনেকের ধারণা, এটা ছিল ইদরিস (আঃ)-এর নাম), বিন ইয়ারাদ, বিন মাহলাঈল, বিন ক্বীনান, বিন আনূশা,বিন শীস বিন আদম (আলাহিমুস সালাম)।
( সুত্রঃ আররাহীক্বুল মাখতুম / সীরাতে ইবনে হিশাম ১ম খন্ড / রহমাতুল্লি­ল আলামীন ২য় খন্ড,পৃ. ১৪-১৭)

লেখক পরিচিতি:
সহকারী নাজিমে তা’লীমাত,
জামেয়া তাওয়াক্কুলিয়া রেঙ্গা, সিলেট।
সভাপতি, সৃজনঘর সাহিত্য ফোরাম, মৌলভীবাজার।