#305F00 Ekushe Journal | বগুড়া জামিল মাদরাসা প্রতিষ্ঠার নেপথ্যে মাওলানা মুহিউদ্দীন খান রহ.

বগুড়া জামিল মাদরাসা প্রতিষ্ঠার নেপথ্যে মাওলানা মুহিউদ্দীন খান রহ.

একুশে জার্নাল ডটকম

একুশে জার্নাল ডটকম

জানুয়ারি ০৯ ২০২০, ২০:০০

বাংলাদেশের উত্তর জনপদের সর্ববৃহৎ ও সর্ব শীর্ষ দ্বীনী পাদপীঠ আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া কাসেমুল উলূম জামিল মাদরাসা বগুড়া। দেশজোড়া খ্যাতিমান এই ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যে-কোনো দর্শককে বিমুগ্ধ করবে। প্রায় সাত একর জায়গার উপর দুই সহস্রাধিক ছাত্র বিশিষ্ট বিশাল সুসজ্জিত ও পরিপাটি জামিয়া ক্যাম্পাস উত্তরবঙ্গের ছাত্রদের কাছে ভর্তির জন্য বেষ্টচয়েজে থাকে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলো, দেশের অন্যতম এই দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার মূল ইতিহাস অনেকেই জানে না। এই প্রতিষ্ঠানের মূল নেপথ্যে ছিলেন মাসিক মদীনা সম্পাদক মাওলানা মুহিউদ্দীন খান রহ। মাওলানা মুহিউদ্দীন খান রহ. জামিল কোম্পানির তৎকালীন শীর্ষ দৈনিক পাসবান ও সাপ্তাহিক আজ এর এডিটর ছিলেন। সেই সুবাদে জামিল মাদরাসার জমিদাতা জামিল কোম্পানির সঙ্গে মাওলানা মুহিউদ্দীন খান রহ. এর গভীর সম্পর্ক ছিল। পরবর্তীতে বিশেষ একটি ঘটনার কারণে এই সম্পর্ক চূড়ান্ত পরিণতি লাভ করে খান সাহেবকে তাদের কাছে অত্যন্ত আস্থাভাজন করে দেয়।

ঘটনাটি মাসিক মদীনা প্রতিষ্ঠারও প্রায় বছর খানিক আগে ১৯৬০ সনের।তৎকালীন সরকারের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার স্বীকার হয়ে জামিল কোম্পানির চেয়ারম্যান জনাব জামিল আহমদ কারান্তরীন হন। তার পরিবারের সদস্যবৃন্দ বিভিন্ন চেষ্টা তদবির করেও কোনো কুলকিনারা করতে পারেননি। এমতাবস্থায় মাওলানা মুহিউদ্দীন খান রহ. জামিল পরিবারের সদস্যদের কাছে এ ব্যাপারে কিছু করার অনুমতি চাইতে গেলে তারা মোল্লা কিসিমের লোক কি করতে পারবে বলে প্রচ্ছন্নভাবে তাচ্ছিল্য প্রদর্শন করে তেমন গুরুত্ব দেননি। এরপর মাওলানা মুহিউদ্দীন খান রহ. তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক উপদেষ্টা রাও ফরমান আলীর সামরিক দফতরে চলে যান। উল্লেখ্য তখন রাও ফরমান আলী মাওলানা মুহিউদ্দীন খান রহ. এর কাছে বাংলা শিখতেন। সেই সুবাদে মাওলানা মুহিউদ্দীন খান রহ. রাও ফরমান আলীর কাছে জামিল আহমদ সাহেবের ব্যাপারে কথা বলেন। রাও ফরমান আলী বললেন, হুযুর! আপনি বসেন আমি একটু খোঁজ নিয়ে দেখি। উনি সঙ্গে সঙ্গে ফোন দিয়ে বললেন, হুযুর! তেমন সমস্যা নেই। এরপর একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে ডেকে বলে দিলেন, আমার হুযুরকে নিয়ে জেলখানায় যাও এবং জামিল আহমদ সাহেবকে ছেড়ে হুযুরের হাতে দিয়ে দাও।

এই ঘটনার পর মাওলানা মুহিউদ্দীন খান রহ. এর প্রতি জামিল আহমদ সাহেবের গভীর শ্রদ্ধা ও সীমাহীন কৃতজ্ঞতাবোধ সৃষ্টি হয়। এরপর বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও দেশের অর্থনৈতিক ডামাডোল অবস্থায় জামিল কোম্পানি পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যাওয়ার স্থির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে পূর্ব পাকিস্তানে তাদের অনেক জমি জিরাত দান সদকা ও ক্রয় করতে থাকে। উল্লেখ্য বর্তমান জাতীয় মসজিদ বায়তুল মুকাররমেও তাদের দানকৃত সম্পদ ছিল। তখন বগুড়া কলোনি বিহারি পট্রিতে তাদের একটি বিশাল জর্দা, সিগারেট ও সাবান তৈরীর ইন্ডাস্ট্রি ছিল। উক্ত জায়গা কি করা যায় এ বিষয়ে জামিল আহমদ সাহেব মাওলানা মুহিউদ্দীন খান রহ. এর কাছে পরামর্শ চান। মাওলানা মুহিউদ্দীন খান রহ. তাকে বললেন, জায়গাটা আমাকে দেন আমি এখানে একটি মাদরাসা করব। এরপর তারা উক্ত জায়গা মাওলানা মুহিউদ্দীন খান সাহেব রহ. কে মাদরাসা করার জন্য দান করেন।

মাওলানা মুহিউদ্দীন খান সাহেব রহ. শিক্ষকতার পেশায় নিয়োজিত না থাকার কারণে তিনি তত্বাবধায়ক থেকে পরিচালনার ভার পটিয়ার হাজী ইউনুস সাহেবের হাতে ন্যস্ত করেন। মাওলানা মুহিউদ্দীন খান রহ. দীর্ঘদিন যাবত জামিল মাদরাসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এরপর পরবর্তী দায়িত্বশীলগণ মাওলানা মুহিউদ্দীন খান রহ. এর আসা-যাওয়াকে প্রচ্ছন্নভাবে এড়িয়ে গেলে তিনিও সরে আসেন। প্রবীণদের অনেকেই জানেন হাজী ইউনুস সাহেব জামিল মাদরাসার মুহতামিম হিসেবে যে মাওলানা ইউসুফ নিজামী সাহেবকে নিয়োগ দিয়েছিলেন সেই মাওলানা নিজামী মাওলানা মুহিউদ্দীন খান রহ. এর সঙ্গে অত্যন্ত অভিভাবকতুল্য সম্পর্ক রাখতেন। একবার মাদরাসার অর্থনৈতিক দীনতার কারণে মাওলানা ইউসুফ নিজামী মাওলানা মুহিউদ্দীন খান রহ. এর শরণাপন্ন হলে মাওলানা মুহিউদ্দীন খান রহ. জনৈক ব্যাংক ম্যানেজারের মাধ্যমে এক কোটি টাকার চেকের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন।

অত্যন্ত দুঃখের বিষয় জামিল মাদরাসার এতবড় একজন হিতাকাঙ্ক্ষী প্রতিষ্ঠাতার ইতিহাস অাজ উক্ত মাদরাসার সম্ভবত শতকরা ৯৫% অধ্যয়নরত ছাত্ররাও জানে না। মাওলানা মুহিউদ্দীন খান রহ. সত্যিকার দ্বীনের একজন দরদী পাহারাদার ছিলেন। দেশ ও মুসলিম উম্মাহর জন্য জাতীয়ভাবে অবিরাম কাজ করে যাওয়া এক অতুলনীয় মনীষী ছিলেন। তিনি এসব প্রচার ও নামডাকের তোয়াক্কা করতেন না। আল্লাহ তা’আলা তাকে আখেরাতে উত্তম বিনিময় দান করুক। এমন হাজারো সেবামূলক ঘটনা খান সাহেবের জীবনের পরতে পরতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। আলহামদু লিল্লাহ এখন কুষ্টিয়া ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়, চবি ও ঢাবি সহ প্রায় পনেরো জনের মত ছাত্র খান সাহেবের উপর পি এইচডি করছে। মাওলানা মুহিউদ্দীন খান রহ. জাতীয় স্মারক সম্পাদনার কাজে জড়িত থাকার সুবাদে অনেক অজানা ইতিহাস বের হয়ে আসছে।