প্রিয় তরুণ উলামাগণ! একটু কি লজ্জা করছে না!

একুশে জার্নাল

একুশে জার্নাল

মার্চ ১৬ ২০১৯, ১৬:৩১

সাইফ সিরাজ:একটু পেছন থেকে: দুই হাজার তের সালের আগে বাংলা ভার্চুয়াল জগতের যুদ্ধটা মূলত ছিল ইসলাম এবং নাস্তিকতার। তর্ক-বিতর্ক, যুক্তি আর প্রমাণের যুদ্ধটা অনেকটাই ছিল জ্ঞান-প্রজ্ঞা আর পাঠ নির্ভর। বাংলা ব্লগস্ফিয়ারে এই যুক্তি-প্রমাণ ও তর্ক-বিতর্কের ভেতর দিয়ে একটা গালিবাজ ও খিস্তিওলা দলের আবির্ভাব হতে থাকে। এই দলটির মধ্যে আবার দুইটা ধারা হয়ে যায়।

একটা, পলিটিক্যালি গালিগালাজ করে নিজেদের হাতে ব্লগের নেতৃত্ব রাখার চেষ্টা করে। এদের মধ্যেও দুইটা গ্রুপ দেখা যায়। ক. এন্টি জামাত। খ. ব্লগীয় সিন্ডিকেট। এন্টি জামাতের প্রায় অধিকাংশ ব্লগারই ইসলামের পক্ষের সবাইকে জামাত ভাবতে শুরু করে। ব্লগীয় সিন্ডিকেট মূলত কর্তৃত্বের জন্য গালাগাল শুরু করে।

দুই, এন্টি ইসলাম। এন্টি রাসূল। এন্টি উলামা। এরা কোন ধরণের যুক্তির ধার না ধেরেই গালাগাল আর উদ্ভট কথায় ইসলাম ও নবীজীকে আক্রমণ করতে শুরু করে। যাদেরকে এক কথায় শাতিমে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলা যায়।

দুই হাজার আট থেকে নিয়ে তেরো শালের শেষ সময় পর্যন্ত অনেকেই ব্লগে চেষ্টা করেছেন ইসলামের পক্ষে কাজ করতে। অনেকেই ব্লগের বিপরীতে ব্লগ তৈরি করেছেন। ইসলামের পক্ষে কথা বলতে। যেমন, সদালাপ, নক্ষত্র এইরকম কিছু ব্লগ ছিল ইসলামী কন্টেন্ট নিয়ে লড়াই করার জন্য। যদিও এই জাতীয়তাবাদী ব্লগিং মূলত মুখ থুবড়ে পড়েছিল।

এমন সময় ইসলাম ভালোবাসেন এমন কম জ্ঞানী ব্লগারগণ চাইতেন আমাদের বড় বড় আলেমগণ যেন ব্লগে আসেন। কিন্তু সেটা নানা কারণেই সম্ভব ছিল না। এরপরও যাঁরা এসেছিলেন। তারা ব্লগীয় নাস্তিকতার জ্ঞানীয় বিতর্কে খুব কমই গিয়েছেন। ব্যতিক্রম তরুণ দু’একজন বাদে। ফলে ব্লগারদের মধ্যে আলেমদের ব্লগে আসার কামনা তীব্র হতে লাগল।

এমন সময়ে হেফাজতের উত্থানের ফলে ব্লগ খানিকটা ঝিমিয়ে পড়ে। ফেসবুকের উত্থান শুরু হয়। দলে দলে আলেম তালাবা ফেবুতে আসতে থাকেন। অনেকেই আশার আলো দেখতে থাকেন।

আরেকটু পরে ইউটিউব জনপ্রিয় হয়ে ওঠে তরুণ আলেমদের কাছে। অনেকেই ইউটিউব সেলেব হয়ে ওঠেন অল্প সময়ে। চলতে থাকে আলেম-উলামা-তালাবার ভার্চুয়াল উত্থান। জমতে থাকে আলোচনা-পর্যালোচনা। চলতে থাকে তর্ক-বিতর্ক। আসতে থাকে অনেক কন্টেন্ট।

কিন্তু দুঃখের বিষয় এই আলেম-উলামা-তালাবাদের একটা বিরাট অংশ এই ভার্চুয়াল টুলসগুলোর যতরকম নেগেটিভ ব্যবহার আছে তার পুরোটাই করতে শুরু করে।

ইসলামী রাজনীতির ভার্চুয়াল জজবা:

তরুণ আলেমগণ যখন ফেসবুকে আসলেন ইসলামের কাজ করতে তখন তারা ইসলামী রাজনীতি নিয়ে কাজ করতে চাইলেন। ফলাফল হলো বিভাজনের যত রকমের প্রকার আছে তার সবগুলোই এপ্লাই করলেন তারা। শিল্প-সাহিত্য, ইসলাহ-তাসাউফ, কওমী-আলিয়া, কওমীর সংস্কার, কওমী শিক্ষার্থীদের আত্মসমালোচনা ইত্যাদি হেন বিষয় নাই যার সমাধানের জন্য ফেসবুকের নীল আদালতে তারা আর্গুমেন্ট করেননি এবং করছেন না। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো যেই কওমীর সন্তানদের আদব-আখলাক-ইখলাস কিংবা শিষ্টাচার নিয়ে আমাদের গর্ব হতো; তাদের ভাষিক ঔদ্ধত্য এবং উগ্র আচরণে রীতিমত সাধারণ মানুষ অবাক হয়ে গেছেন। অনেক আলেম ভার্চুয়াল জগৎ ছেড়ে দিয়েছেন। ফলে কখনও আহমদ শফী, কখনও নূর হোসাইন কাসেমী, কখনও মামুনুল হক, কখনও চরমোনাইর পীর আক্রান্ত হতে থাকলেন নিজেদের সন্তাদের দ্বারাই বেরহমভাবে। এমন অনেক তরুণ পলিটিক্যাল এক্টিভিস্টের আবির্ভাব হয়েছে যারা সম্মানের তৈল মর্দন করতে করতে চূড়ান্ত অপমান করে বসে। সবাই সবার অবস্থানে এত অনড় হয়ে বসেন যেনো তারা একটা পাক-ভারত লড়াই নেছেন। বিনা যুদ্ধে দেবেন না ‘সূচাগ্র মেদীনি’। ভার্চুয়ালি তাদের এই লম্ফ-ঝম্ফ দেখে মনে হতে থাকে অল্প কদিনেই ইসলামী শাসন কায়েম হতে যাচ্ছে। জাস্ট অপেক্ষার পালা। ইহলামী রাজনীতির কর্মীদের ভার্চুয়াল এক্টিভিটিকে জাস্ট ‘আস্ফালন’ মনে হয়। তাদের হুংকারগুলোকে বিজ্ঞাপনের ফানী কন্টেন্ট মনে হতে থাকে।

অনেকের নাম নিয়ে স্ক্রীনশট দিয়ে এসব উগ্রতা, অভব্যতা, অশিষ্ট আচরণের প্রমাণ দেওয়া যাবে। বাট ভার্চুয়াল জীবনের এগারো বছরের অভিজ্ঞতা বলে প্রমাণে আরও কেওয়াজ বাড়তে থাকে।

শুধু কয়েকটি উদাহরণ দেব।
“আমিনী সাহেব ইন্তেকাল করেছেন বেশিদিন হয়নি।” হযরতের প্রতি মুগ্ধতার জবাবে এক পলিটিশিয়ানের মন্তব্য।

“মামুনুল হক সাহেব হিট সীকার” লাইভে ঐক্যের আহ্বানের ‘অপরাধে’ এক এক্টিভিস্টের মন্তব্য।

‘ইআবা, চুরমোনাই, মিরাছখোর, ইত্যাদি তো ইসলামী রাজনীতির এক্টিভিস্টের নিয়মিত ভাষা।

আরেকদল আছেন, সবসময়ই লাইমলাইটে থাকতে ভালোবাসেন। নিজের বয়স, অবস্থান, জ্ঞানীয় স্টেজ, প্রজ্ঞার গভীরতা, নিজের বক্তব্যের ভাষা, সমালোচনার এটিকেট, ভাষার পোলাইটনেস, বিনয়, বক্রোক্তির সীমানা, ইত্যাদি বিষয়ে কোন জ্ঞান ছাড়াই কথা বলতে থাকে হরদম। কোনটা ফান, কোনটা বেয়াদবী, কোনটা সমালোচনা কোনটা গীবত, কোনটা পর্যালোচনা কোনটা তহমত ইত্যাদি নিয়ে কেয়ারলেস আরেকদল।

আরেকদল আছে দায় দিতে। দেদারছে বদমাশ, বাটপার, দালাল ইত্যাদি বলে গালি দিয়েই আগা-গোড়া না জেনেই দায় একজন কিংবা কোন সংগঠনকে দিয়ে দিচ্ছে।

অথচ গালাগালির ব্যাপারে ইসলামের নিষেধাজ্ঞা নিয়ে তাদের কোন পরোয়া নেই। গীবত, তহমত নিয়ে কোন হেডেক নেই। জাস্ট রোষ ঢালতে পারলেই হলো।

অথচ আমরা কেন ভার্চুয়ালে:

আমরা ভার্চুয়ালে এসেছিলাম। জ্ঞান চর্চার জন্য। জ্ঞানের যুদ্ধে পরাজিত করতে ইসলাম বিদ্বেষীদের। ইসলামের বিপক্ষে যত ধরণের প্রশ্ন ওঠে তার ইলমী ও আকলী দলিল দিয়ে মানুষকে আল্লাহর পথে ডাকতে। সাধারণ শিক্ষিত মুসলমানদের ঈমান হেফাজত করতে।

আমাদের কাজ ছিল জুলুমের বিপক্ষে বলা। এহসানের সঙ্গে কারো ভুলটা গোপনে বলে দেওয়া। কিন্তু আমরা কী করছি? নিজেদের কাপড় নিজেরাই খুলছি। নিজেদের কবর নিজেরাই খুড়ছি।

আর এই দিকে যাদেরকে আমরা জেনারেল শিক্ষিত মনে করে তাদের ঈমান রক্ষার জন্য দলে দলে ভার্চুয়াল জগতে মঙ্গলে প্লট দখল করার মতো আইডি দখল করেছিলাম। সেই তারাই (জেনারেল ভাইয়েরা) নাস্তিকতাবাদ, জ্ঞানবাদ, আজ্ঞেয়বাদ, বিজ্ঞানবাদ, বিবর্তনবাদ ইত্যাদি মতবাদের বিপক্ষে সরব থাকছেন। কাজ করছেন।
কি!প্রিয় উলামাগণ, একটু কী লজ্জা করছে না!

লেখক-কবি,গীতিকার