প্রশ্নোত্তরে কুরবানীর আধুনিক জরুরি মাসায়েল

একুশে জার্নাল

একুশে জার্নাল

জুলাই ২০ ২০২১, ১৪:৪১

প্রশ্ন- ১. একজন সচ্ছল ও সামর্থবান ব্যক্তির উপর কয়টি কুরবানী করা ওয়াজিব?
উত্তর : একটি।
প্রশ্ন– ২. কতটুকু সম্পদের মালিক হলে কুরবানী ওয়াজিব হয়?
উত্তর : ১০ জিল হজ ফজর থেকে ১২ জিল হজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত কোনো স্বাধীন, মুকিম প্রাপ্ত বয়স্ক ও সুস্থ্য মস্তিস্ক সম্পন্ন নর-নারীর কাছে নিত্য প্রয়োজনের অতিরিক্ত সারে বায়ান্ন ভরি রূপা বা সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ অথবা সমপরিমাণ মূল্যের সম্পদ বা নগদ অর্থ থাকলে কুরবানী ওয়াজিব। (ফতোওয়ায়ে শামী ৯/৪৫৩, ফতোয়ায়ে মাহমুদীয়া ১৪/৩৩৫, ফাতাওয়ায়ে রহিমীয়া ১০/৩৫)
টাকা-পয়সা, স্বর্ণ-রূপা, অলঙ্কার, ব্যবসায়িক পণ্য ও অপ্রয়োজনীয় আসবাবপত্র—সব কিছুর মূল্য কুরবানীর নেসাবের ক্ষেত্রে হিসাবযোগ্য। (আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩১৬, ফতোয়ায়ে আলমগীরি ৫/২৯২)
প্রশ্ন- ৩. সামর্থের অভাবে কুরবানী করা সম্ভব না হলে, ঋণ করে কুরবানী করা যাবে কি?
উত্তর : হ্যাঁ।
প্রশ্ন- ৪. ঋণী ব্যক্তি কুরবানী করবে, নাকি তার ঋণ পরিশোধ করবে?
উত্তর : নেসাব পরিমাণ মালের মালিক হলে কুরবানী করবে। অন্যথায় কুরবানী করবে না।
প্রশ্ন- ৫. কুরবানী করার সুন্নত নিয়ম কী?
উত্তর : কুরবানী করার সুন্নত নিয়ম:
* কুরবানীর পশুকে মাটিতে শুইয়ে তার মুখ কেবলামুখী করে নিম্নের দোয়া পাঠ করা উত্তম:
إِنِّي وَجَّهْتُ وَجْهِيَ لِلَّذِي فَطَرَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ حَنِيفًا وَمَا أَنَا مِنَ الْمُشْرِكِينَ – إِنَّ صَلاَتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ – لاَ شَرِيكَ لَهُ وَبِذَلِكَ أُمِرْتُ وَأَنَاْ من الْمُسْلِمِينَ – اللهم منك و لك
অতঃপর بسم الله الله اكبر বলে জবেহ করবে। এ দোয়া পড়তে না পারলে শুধু বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার বলে জবেহ করলেও চলবে।
অতপর নিম্নের দোয়া পড়া উত্তম:
الهم تقبله منى (منا، منهم) كما تقبلت من حبيبك محمد و خليلك ابراهم عليهما الصلاة و السلام
* নিজের কুরবানীর পশু নিজেই জবেহ করা উত্তম। নিজে জবেহ না করলে বা করতে না পারলে জবেহের সময় সামনে থাকা ভালো। মেয়ে লোকের পর্দার বেঘাত হওয়ার কারণে সামনে না থাকতে পারলে ক্ষতি নেই।
* জবেহ করার সময় জন্তু ও জবাইকারী উভয়ের মুখ কিবলার দিকে থাকা সুন্নতে মুয়াক্কাদা। (ফতোয়ায়ে শামী। আহাসানুল ফাতাওয়া)
প্রশ্ন- ৬. সচ্ছল মুসাফিরের উপর কুরবানী ওয়াজিব হবে কি?
উত্তর : না। (আদ্দুর রুল মুখতার ৯/৮৫৭)
প্রশ্ন- ৭. যে ব্যক্তির উপর কুরবানী ওয়াজিব সে যদি বিশেষ কোনো কারণে কুরবানী করতে না পারে, তাহলে সে কী করবে?
উত্তর : একটি ছাগল বা ভেড়া বা একটি বড় জন্তুর সাত ভাগের এক ভাগের মূল্য সমপরিমাণ অর্থ সদকা করা তার উপর ওয়াজিব। (ফতোয়ায়ে শামী ৯/৪৫৩, ফতোওয়ায়ে রহীমিয়া ১০/২৬)
প্রশ্ন- ৮. মৃত ব্যক্তির নামে কুরবানী করা যাবে কি?
উত্তর : হ্যাঁ, যাবে।
প্রশ্ন- ৯. কয় প্রকারের প্রাণী দ্বারা কুরবানী করা বৈধ?
উত্তর : বকরী, পাঠা, খাশী, ভেড়া, ভেড়ী, দুম্বা, গাভী, ষাঁড়, বলদ, মহিষ, উট—এই কয় প্রকার গৃহপালিত জন্তু দ্বারা কুরবানী করা বৈধ।
প্রশ্ন- ১০. কুরবানী পশুর বয়স সম্পর্কে জানতে চাই।
উত্তর :
* বকরী, খাসি, ভেড়া, ভেড়ী, দুম্বা—কমপক্ষে পূর্ণ এক বছর বয়সের হতে হবে। বয়স যদি কিছু কমও হয়, কিন্তু এরূপ মোটা তাজা যে— এক বছর বয়সিদের মধ্যে ছেড়ে দিলেও তাদের চেয়ে ছোট মনে হয় না—তাহলে তার দ্বারা কুরবানী জায়েয। তবে অন্তত ছয় মাস বয়স হতে হবে।
বকরির ক্ষেত্রে এরূপ ব্যতিক্রম নেই। বকরি কোনো অবস্থায় এক বছরের কম বয়সের হতে পারবে না।
* গরু ও মহিষের বয়স কম পক্ষে দুই বছর হতে হবে।
* উটের বয়স কম পক্ষে পাঁচ বছর হতে হবে।
প্রশ্ন- ১১. কুরবানীর পশুর চামড়ার বিধান কী? বিস্তারিত জানতে চাই।
উত্তর: কুরবানীর পশুর চামড়ার বিস্তারিত বিধান:
* কুরবানীর পশুর চামড়া শুকিয়ে বা প্রক্রিয়াজাত করে নিজেও ব্যবহার করা জায়েজ।
* কুরবানীর চামড়া দানও করা যায়। তবে বিক্রি করলে সে মূল্য নিজে ব্যবহার করা যায় না। দান করে দেয়া জরুরি। এবং ঠিক সেই টাকাটাই দান করা জরুরি। ঐ টাকা নিজে খরচ করে অন্য টাকা দান করলে আদায় হবে বটে তবে অন্যায় হবে।
* কুরবানীর চামড়ার দাম মসজিদ মাদরাসার নির্মাণ কাজে বা বেতন বাবত বা পারিশ্রমিক বাবত বা অন্য কোনো নেক কাজে খরচ করা জায়েয নয়। দানই করতে হবে।
প্রশ্ন- ১২. কুরবানীর গোশত বানাবার মজুরি স্বরূপ পশুর চামড়া, রশি, গোশত দেয়া জায়েয আছে কি?
উত্তর : না।
প্রশ্ন- ১৩. কুরবানীর গোশত বণ্টনের পদ্ধতি কী, কুরবানী-দাতা সম্পূর্ণ গোশত খেতে পারবে কি না? জানতে চাই।
উত্তর : প্রশ্নটির দুটি অংশ। ক. গোশত বণ্টনের নিয়ম। খ. কুরবানীদাতা কুরবানীর সব গোশত খেতে পারবেন কিনা?
ক. গোশত বণ্টনের তরিকা:
আলোচনাটি দু’দিক থেকে হতে পারে। নিজের কুরবানীর গোশত বণ্টনের তরিকা। এবং অংশিদার কুরবানীর গোশতের বণ্টনের তরিকা। আমরা দু’টোই বলছি—
মুস্তহাব ও উত্তম হলো গোশত তিন ভাগ করে একভাগ নিজেদের জন্য রাখা, এক ভাগ আত্মীয়স্বজনকে দেয়া এবং এক ভাগ গরিব-মিসকিনকে দান করা।
* অংশিদারগণ সকলে একান্নভুক্ত হলে গোশত বণ্টনের প্রয়োজন নেই। অন্যতায় বণ্টন করতে হবে।
* অংশিদারগণ গোশত অনুমান করে বণ্টন করবে না। বরং পাল্লায় মেপে বণ্টন করতে হবে। অন্যথায় ভাগের মধ্যে কমবেশ হয়ে গেলে গোনাহগার হতে হবে। অবশ্য কোনো অংশিদার মাথা পায়া ইত্যাদি বিশেষ কোনো অংশ গ্রহণ করলে তার ভাগে গোশত কিছু কম হলেও তা জায়েয হবে। কিন্তু যে ভাগে গোশত বেশি সে ভাগে মাথা পায় ইত্যাদি বিশেষ অংশ দেয়া যাবে না।
* অংশিদারগণ সকলে যদি সম্পূর্ণ গোশত দান করে দিতে চায় বা সম্পূর্ণটা রান্না করে বিলাতে বা খাওয়াতে চায়, তাহলে বণ্টনের প্রয়োজন নেই।
খ. সাধারণ কুরবানী হলে পারবে। মান্নত বা মৃত ব্যক্তির অসিয়তের কুরবানী হলে সম্পূর্ণ গোশত দান করা ওয়াজিব। নিজে খেতে পারবে না।
প্রশ্ন- ১৪. কুরবানীর গোশত অমুসলিমদেরকে দেওয়া জায়েয আছে কি?
উত্তর : জায়েয আছে। কোনো অসুবিধা নেই। বিশেষত যদি সে প্রতিবেশি হয়।
প্রশ্ন- ১৫. কুরবানী-দাতা কুরবানীর গোশত তিন দিনের বেশি খেতে পারবে কি না?
উত্তর : পারবে।
প্রশ্ন- ১৬. বৈদ্যুতিক মেশিনে গরু, ছাগল প্রভৃতি জবেহ করার বিধান জানতে চাই।
উত্তর : এ প্রশ্নের উত্তর একটু আলোচনা সাপেক্ষ বিষয়। যদি জবেহ করার পূর্বে পশুকে নিস্তেজ ও দুর্বল করার জন্য আঘাত, গ্যাস-ওষুধ ও ইনজেকশন প্রয়োগ ইত্যাদি প্রক্রিয়া গ্রহণ না করা হয়—তবে জায়েয হবে। অবশ্য—জবেহের সময় বিসমিল্লাহ বলে নেবে। একাধিক পশু একসাথে জবেহ করলে পৃথক পৃথক বিসমিল্লাহ আল্লাহু আকবর বলা নিশ্চিত করতে হবে।
প্রশ্ন- ১৭. (একটি প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন) বর্তমানে মুরগি আধুনিক যন্ত্র দ্বারা জবেহ করা হয়, এর বিধান সম্পর্কে জানতে চাই।
উত্তর : জায়েয। অবশ্য—মেশিনে দেওয়ার সময় বিসমিল্লাহ আল্লাহু আকবর বলে নেবে। একসাথে অনেকগুলো মুরগি মেশিনে দিলে প্রত্যেকটার সময় পৃথক বিসমিল্লাহ বলার ব্যবস্থা করা। এ ক্ষেত্রে সতর্কতা জরুরি।
প্রশ্ন- ১৮. আমাদের এলাকায় দেখি যে—অনেক সময় কুরবানীর পশুকে মাটিতে শোয়ানোর সময় ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে পশুর পা ভেঙ্গে যায়, এমতাবস্থায় কেউ বলে যে—এ পশু দ্বারা কুরবানী করা যাবে না। কেউ বলে যাবে। সঠিক মাসয়ালা জানতে চাই।
উত্তর : এ জাতীয় দুর্ঘটনা জবেহ করার সময় হলে কুরবানী জায়েয হবে। আর তার আগে ঘটলে মাসয়ালা হলো—ভালো পশু ক্রয় করার পর যদি কুরবানীর পশুতে এমন কোনো দোষ-ত্রুটি দেখা দেয়, যার কারণে কুরবানী জায়েয হয় না—এরূপ হলে ঐ জন্তু রেখে আরেকটি পশু ক্রয় করে কুরবানী করতে হবে। তবে ক্রেতা গরিব হলে সেটি কুরবানী দিতে পারেবে।
প্রশ্ন- ১৯. কোনো কোনো গ্রামে দেখা যায়—ঈদুল আযহার দ্বিতীয় দিন অথবা তৃতীয় দিন বিবাহ বা ওলিমা অনুষ্ঠানের তারিখ নির্ধারণ করা হয়। এবং কুরবানীর গোশত দিয়েই এসব অনুষ্ঠানের দাওয়াত খাওয়ানো হয়। আমার প্রশ্ন হলো—কুরবানীর গোশত দিয়ে বিবাহ বা ওলিমা অনুষ্ঠানের দাওয়াত খাওয়ানো কি জায়েয হবে? এবং এ উদ্দেশ্যে কুরবানী করা কি বৈধ হবে?
উত্তর : কুরবানী হবে আল্লাহর জন্য। অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্যে কুরবানী করা জায়েয হবে না। কুরবানীর তিন দিনের যে কোনো দিন কুরবানী করা যায়। কুরবানীর গোশত ওলিমা বা বিবাহ অনুষ্ঠানে খাওয়ানো জায়েয আছে। কোনো অসুবিধা নেই।
প্রশ্ন- ২০. আমাদের গ্রামে অনেক বাড়িতে এরকম প্রচলন আছে যে—কুরবানীর সময় কসাইয়ের সাথে তারা এভাবে চুক্তি করে—এ গরুটিা বানিয়ে দিলে এত টাকা পাবে। আর সাথে এত কেজি গোশত পাবে। প্রশ্ন হলো—এভাবে টাকা ও গোশতের বিনিময়ে চুক্তি করা কি বৈধ? কেউ যদি এমনটি করে তাহলে সে ক্ষেত্রে তার করণীয় কী?
উত্তর : না, বৈধ হবে না। গোশত না দিয়ে মজুরি-ই দেবে।
প্রশ্ন- ২১. আমরা তিন ভাই। মা জীবিত আছেন। বাবা মারা যাওয়ার পর তার রেখে যাওয়া সম্পত্তি বণ্টন করা হয়নি। অবশ্য বাবা খুব বেশি সম্পত্তি রেখে যাননি। আমরা তিন ভাই চাকুরি করি। প্রত্যেকের নিজস্ব কিছু কিছু সম্পদ আছে। কুরবানীর সময় আমরা তিন ভাই মিলে মায়ের নামে একটি ছাগল কুরবানী করে থাকি। আমি জানতে চাই, এভাবে আমাদের কুরবানী করা সহিহ হচ্ছে কি না?
উত্তর : আপনার মার উপর যদি কুরবানী ওয়াজিব হয়ে থাকে আর আপনারা তার অনুমতি সাপেক্ষ কুরবানী দিয়ে দেন তবে আপনাদের কুরবানী সহিহ হচ্ছে। ওয়াজিব না হয়ে থাকলে নফল হিসেবে আদায় হবে।
অবশ্য—আপনার মার কুরবানী দেওয়ার মাধ্যমে আপনাদের কারও কুরবানী আদায় হবে না। আপনাদের কারও উপর কুরবানী ওয়াজিব হয়ে থাকলে অবশ্যই তাকে পৃথকভাবে কুরবানী দিতে হবে।
-মাসুম আবদুল্লাহ
বনশ্রী, রামপুরা, ঢাকা