প্রভাবশালীদের জেলা নারায়ণগঞ্জে নেই “করোনা টেস্টল্যাব”: দ্রুত স্থাপনের দাবী নারায়ণগঞ্জবাসীর

একুশে জার্নাল ডটকম

একুশে জার্নাল ডটকম

এপ্রিল ০৮ ২০২০, ১৭:৫২

মাহবুবুর রহমান, নারায়ণগঞ্জ

নারায়ণগঞ্জে একের পর এক বাড়ছে করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। ইতোমধ্যে নারায়ণগঞ্জে ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে করোনা আক্রান্ত হয়ে। এছাড়া করোনা উপসর্গেও কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে। ডেঞ্জার জোন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে নারায়ণগঞ্জ। সে কারণে পুরো জেলাকে লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে।

এ অবস্থায় নারায়ণগঞ্জে দ্রুত করোনা রোগ শনাক্তকরণের ল্যাব স্থাপনের জোরালো দাবী উঠেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইতোমধ্যে নারায়ণগঞ্জে যারা মারা গেছেন তাদের কয়েকজনের রিপোর্ট এসেছে ২-৩দিন পর। ফলে ওই সময়ে আরো অনেকেই আক্রান্ত হয়েছে। এসব কারণে ১০০ শয্যা বিশিষ্ট নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের ডাক্তার, নার্স, ওয়ার্ডবয় সহ আরো কয়েকজন আক্রান্ত হয়েছে।

এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে সমালোচনার ঝড়। সংশ্লিষ্টরা অনেকেই বলছেন নারায়ণগঞ্জে গোলাম দস্তগীর গাজীর মত মন্ত্রী, সেলিম ওসমানের মত প্রভাবশালী ব্যবসায়ী নেতা থেকে শুরু করে সিটি করপোরেশনের দাপুটে মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী, এমপি শামীম ওসমানের মত দোর্দন্ডপ্রতাপশালী এমপি ও নজরুল ইসলাম বাবুর মত আলোচিত ছাত্রলীগ নেতা থেকে এমপি হলেও এ জেলাতে একটি পরীক্ষাগার না থাকাটা খুবই দু:খজনক।সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এসব ব্যক্তিদের নাম প্রকাশ করে তাদের দ্রুত এগিয়ে আসার আহবান জানানো হয়েছে।

এরই মধ্যে জেলা সিভিল সার্জন মোহাম্মদ ইমতিয়াজ জানান, আক্রান্তদের মধ্যে যাদের সাথে কথা হয়েছে তাদের প্রবাসীদের সংস্পর্শে আসার তথ্য আমরা তেমন একটা পাইনি। এখন এটি লোকাল কমিউনিটি ট্রান্সমিশন হচ্ছে। এখন আর এ রোগ বিস্তারের জন্য প্রবাসীদের প্রয়োজন হচ্ছেনা। তাই সকলকে এখনি সচেতন হতে হবে, ঘরে অবস্থান করতে হবে। কোনভাবেই বাইরে বের হওয়া যাবেনা।

মরণঘাতী করোনা ভাইরাসে ঢাকার পর সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন নারায়ণগঞ্জের বাসিন্দারা। ঢাকার পরই রয়েছে নারায়ণগঞ্জ জেলা। এজন্য নারায়ণগঞ্জকে করোনার “ক্লাস্টার” বলছে আইইডিসিআর। পরিচালক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা সোমবার ব্রিফিংয়ে বলেন, নারায়ণগঞ্জকে “ক্লাস্টার” (একই এলাকায় কম দূরত্বে একাধিক ব্যক্তি সংক্রমিত হওয়া) হিসেবে চিহ্নিত করেছি, সেখানে বেশ কিছু কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে, যাতে ওখান থেকে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে না পড়ে।

নারায়ণগঞ্জ সিটির ১৩ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মাকছুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ অবিলম্বে নারায়ণগঞ্জে করোনা টেস্ট ল্যাব স্থাপনের দাবী জানিয়েছেন।

এজন্য তিনি জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত আবেদনও করেছেন। খোরশেদ বলেন, নারায়ণগঞ্জ এখন দেশের করোনা আক্রান্ত পাঁচটি রেড জোনের একটি জনবহুল ও শ্রমিক নির্ভর শহর। সরকারি হিসাবেই ইতোমধ্যে ৫ জন মারা গেছে ও অর্ধশতাধিক আক্রান্ত তাই মৃত্যুর মিছিল থামাতে অবিলম্বে নারায়ণগঞ্জে করোনা টেস্ট ল্যাব স্থাপন করতে হবে।

কাউন্সিলার খোরশেদ বলেন,আমরা নারায়ণগঞ্জবাসী নারায়ণগঞ্জ থেকে সরকারকে সর্বোচ্চ কর প্রদান করি। তাই আমরা প্রত্যাশা করতেই পারি আমরা আমাদের চরম বিপদের দিনে রাষ্ট্রের কাছে সুবিধা ও নিরাপত্তা পাবো।

নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি কবি ও সাংবাদিক হালিম আজাদ বলেন, বর্তমান অবস্থায় করোনা শনাক্তে নারায়ণগঞ্জে একটি ল্যাবের বড়ই প্রয়োজন। কারণ এর আগে নারায়ণগঞ্জের যে কয়জন করোনায় মারা গেছেন, তাদের লাশ দাফনের পর জানা গেছে তারা করোনায় মারা গেছেন। তাই ল্যাব থাকলে আরও দ্রুত করোনা সংক্রমিত লোকের তথ্য নিশ্চিত করার মাধ্যমে সঠিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হবে।

বন্দর নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক কবির সোহেল জানান, শিল্পাঞ্চল এবং ঘনবসতির কারণে নারায়ণগঞ্জে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছে অনেকে। রাজধানীর পার্শ্ববর্তী জেলা হিসেবে নারায়ণগঞ্জে এখন পর্যন্ত করোনা আক্রান্ত ও মৃত্যুর যে চিত্র দেখা যাচ্ছে তাতে প্রশাসনের এখনই উচিত এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া।

নারায়ণগঞ্জে করোনার ফোকাল পার্সন ডা. জাহিদুল ইসলাম জানান, আইইডিসিআর টিম নারায়ণগঞ্জে এসে নমুনা সংগ্রহ করে নিয়ে যান। রিপোর্ট তৈরি হওয়ার পর নারায়ণগঞ্জে পাঠানো হলে তার উপর নির্ভর করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। এই দীর্ঘ সময়ের জন্য নারায়ণগঞ্জের প্রকৃত করোনায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা নির্ণয় বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাই এখানে টিসিআর মেশিন এবং বায়োসেফ্টি থার্ড লেবেল ল্যাব থাকলে এই প্রক্রিয়া এখান থেকেই সম্পন্ন করা সম্ভব হতো।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নারায়ণগঞ্জের মন্ত্রী, এমপি মেয়র উদ্যোগী হলে হয়তো দ্রুত একটি ল্যাব স্থাপন করা সম্ভব।

প্রসঙ্গত নারায়ণগঞ্জ শহরের জামতলায় ৫ দিন ধরে করোনার উপসর্গ নিয়ে অসুস্থ থাকায় পর আফতাব উদ্দিন (৭০) নামে এক ব্যক্তি মারা গেছেন। বুধবার ৮ এপ্রিল তাকে নাসিকের পক্ষ থেকে দাফন করা হয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, ঘরের ভেতরে একটি খাটে মৃতদেহ পড়ে থাকলেও পরিবারের কেউ সেটা ধরেনি। পরে কাউন্সিলর লোকজন সাহায্যে মৃতদেহ নিয়ে মাসদাইর কবরস্থানে দাফন করেন। এর আগে করোনায় আক্রান্ত হয়ে নারায়ণগঞ্জের জামতলায় গিয়াসউদ্দিন (৬০) নামের এক ব্যক্তি ৫ এপ্রিল বিকেলে রাজধানীর কুর্মিটোলা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। ১৮নং ওয়ার্ডে করোনা আক্রান্ত হয়ে ফারুক আহমেদ (৫০) নামে এক ব্যক্তি মারা যায়। নাসিকের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মোস্তফা আলী শেখ জানান, দুই সপ্তাহ ধরে ফারুকের জ্বর ছিল,পরে রাজধানীর কুয়েত মৈত্রি হাসপাতালে ভর্তি করা হলে সেখানে টেষ্টে পজেটিভ রিপোর্ট আসে। ৬ এপ্রিল দুপুরে তিনি মারা যান। খবর পেয়ে ফারুকের বাড়ি ও আশপাশের এলাকা লকডাউন করা হয়।

আখরা এলাকায় চিত্তরঞ্জন ঘোষ নামের এক কাপড় ব্যবসায়ী মারা যান। আবু সাঈদ মাতব্বর (৫৫) করোনায় কুর্মিটোলা হাসপাতালে মারা যান।২৯ মার্চ বন্দরের শিউলি (৪৫) কুর্মিটোলায় মারা যায়।