কেন গঠিত হলো হাটহাজারীর নতুন শিক্ষাবোর্ড?
একুশে জার্নাল ডটকম
অক্টোবর ২৮ ২০২৪, ১১:৩১
ইলিয়াস সারোয়ার: আমি চট্টগ্রামে প্রায় ১০ বছর পড়াশোনা করেছি। আবার গত ১০ বছর ধরে বেফাকের সিলেবাস পড়াচ্ছি। সেই সুবাদে জানি– চট্টগ্রামের মাদ্রাসাগুলোর সিলেবাস বেফাকের সিলেবাসের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও প্রত্যেক ক্লাসেই কিছু না কিছু কিতাব এদিক-সেদিক আছে। বেফাক দিন দিন তাদের স্বকীয় সেই সিলেবাসকে উপেক্ষা করে আসছিল। যে কারণে বেফাক থেকে বের হওয়ার জন্য মাদ্রাসাগুলো বারবার উম্মুল মাদারিসকে তাগাদা দিয়ে যাচ্ছিল।
মেখল মাদ্রাসার মতো কিছু মাদ্রাসার সিলেবাস বেফাকের সিলেবাসের সাথে এতই অমিল যে তারা বেফাকে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কথা চিন্তাই করতে পারে না। এই মাদ্রাসাগুলোর শিক্ষা-সিস্টেমও সুযোগ্য আলেম বানানোর জন্য খুবই উপযোগী বলে মনে করেন তাঁরা। তাদের অধিকাংশ উস্তাযই দুনিয়ামুখী জাগতিক শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা আছে বলেও স্বীকার করেন না। যে কারণে বরাবরই তাঁরা ক্বদীম নেসাবকে সংরক্ষণ করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
উপরোক্ত বিষয় বিবেচনায় নিলে হাটহাজারী মাদ্রাসার সিনিয়র শিক্ষক মাওলানা আশরাফ আলী নিজামপুরী সাহেবের স্ট্যাটাসের মর্ম বোঝা যায়। তিনি চট্টগ্রাম কেন্দ্রিক মাদ্রাসাগুলোর স্বকীয় সিলেবাস উপেক্ষা করাকেই বেফাকের অবহেলা হিসেবে বোঝাতে চেয়েছেন। আরেকটা বিষয় এখানে যুক্ত হতে পারে– বেফাকের খাস কমিটিতে হাটহাজারী মাদ্রাসার মুহতামিমকে রাখার বাধ্যবাধকতা থাকলেও তাঁকে বাদ দিয়ে খাস কমিটি করা হয়েছে। বিপরীতে অনাকাঙ্ক্ষিত অনেককেই এখনও পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নানা পদে আসীন করে রাখা হয়েছে। এটাকেই বিমাতাসুলভ আচরণ বলে মাওলানা আশরাফ আলী নিজামপুরী বুঝিয়ে থাকতে পারেন।
নতুন শিক্ষাবোর্ড গঠনের আরও একটি বড় কারণ হলো– দাওরাতে পরীক্ষা দেওয়ার জন্য শরহে বেকায়া থেকে পরীক্ষা দিয়ে যুক্ত থাকতে হবে অর্থাৎ শরহে বেকায়াতে স্বীকৃতি প্রাপ্ত যে কোনো বোর্ডে পরীক্ষা দিতে হবে। অন্যথায় দাওরা পরীক্ষা হাইয়্যাতে দিতে পারবে না। অথচ হাটহাজারী মাদ্রাসাকে বেফাকে অন্তর্ভুক্ত করার শর্তই ছিল– তারা কেবল দাওরা হাদীসের ক্লাসটাই বোর্ডে পরীক্ষা দিবে, অন্য কোনো ক্লাসের শিক্ষার্থী বোর্ড পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করবে না। বেফাকের নতুন নিয়ম এখানেও হাটহাজারী মাদ্রাসাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছে। গত প্রায় ২ দশক ধরে চলা সিস্টেম ভাঙতে গিয়ে হাটহাজারীর শর্তের কোনো তোয়াক্কা করেনি বর্তমানের বেফাক।
সরকার কর্তৃক দাওরায়ে হাদিসের সনদকে মাস্টার্সের সমমান দেওয়ার পর আল্লামা শাহ আহমদ শফী রহ. শোকরানা মাহফিলের আয়োজন করে স্বীকৃতি প্রদানকারী সরকারকে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিলেন। কিন্তু একই প্রতিষ্ঠানের ২য় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী রহ. এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের বিপক্ষে ছিলেন। তখন অধিকাংশ উলামায়ে কেরাম বাবুনগরী রহ. এর পক্ষাবলম্বন করেন এবং শোকরানা মাহফিলকে কটাক্ষ করে স্বীকৃতির বিপক্ষে নিজেদের অবস্থান জানান দেন। তারা আশঙ্কা করেন যে, সরকারি স্বীকৃতির ফলশ্রুতিতে কওমি মাদ্রাসা ধীরে ধীরে আলিয়া মাদ্রাসায় রূপান্তরিত হবে।
নতুন বোর্ড যারা গঠন করেছেন তারা আশঙ্কা করছেন– বেফাককে আজীবন অপছন্দ করা এবং বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের ঘনিষ্ঠ একটা গ্রুপ হঠাৎ বেফাকের উচ্চ পদে সমাসীন হয়ে বেফাককে পথভ্রষ্ট করার পথে এগুচ্ছেন। অলরেডি এমন কিছু আপত্তিকর কাজও পরিলক্ষিত হয়েছে। (ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া এমনসব কর্মকাণ্ডের ফিরিস্তি তুলে ধরা একটি ছবি পোস্টে যুক্ত করে দিচ্ছি।) এটি হলেও বলতেই হয়, নতুন বোর্ড গঠনে পদ-পদবী মোটেই মুখ্য নয়।
হাটহাজারীতে নতুন বোর্ড গঠন প্রক্রিয়া ২০২২ সালেই শুরু হয়েছিল। হাটহাজারী মাদ্রাসার তৎকালীন মহাপরিচালক মাওলানা ইয়াহইয়া রহ. এটির প্রাথমিক আলোচনা শুরু করেছিলেন। এরপর ধীরে ধীরে চলতে থাকে এগিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া। ২০২৪ সালের শেষ দিকে এসে এটার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়। ফেসবুকে লেখকদের অধিকাংশের যে মতামত দেখছি– বেফাকের সাথে ঝগড়া করে বের হয়ে আসার ফলাফল বা পদ-পদবী হাসিল করার জন্য এই বোর্ড গঠিত হয়েছে– এমনটা সত্য নয় বলে আমি দৃঢ়ভাবে মনে করি।
বেফাক ব্যতীত বাকি সবগুলো বোর্ড বিভিন্ন মাদ্রাসা কেন্দ্রিক। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কওমী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হাটহাজারী মাদ্রাসা কেন্দ্রিক আরো একটা বোর্ড হলে সমস্যার কিছু দেখছি না। উপরন্ত ৬ শিক্ষাবোর্ডকে নিয়ে হাইআতুল উলয়া যখন আলিয়া মাদ্রাসার মত উচ্ছন্নে যাবে (যদি যায় কখনও) তখন যষ্ঠের কাঠি হিসেবে হাটহাজারীর বোর্ড আমাদের আলো দেখাতে পারে। তাই নতুন এই বোর্ড গঠনকে কেন্দ্র করে এর বিরোধিতা করার কোনো দরকার নেই।
আমরা প্রত্যেকেই নিজেদের বোধ বিবেচনার উপর বিচার করি। আমরা মনে করি- মুরুব্বিরা কিছুই বোঝেন না। তাদেরকে পদলোভী আখ্যায়িত করি। অথচ তাদের বুক চিরে দেখিনি- মূলত তাদের নিয়তটা কী? নিজের বুঝ মতো ট্যাগ লাগিয়ে দিই। অথচ এমন অনেক ঘটনার সাক্ষী আমি নিজে, যা এখনকার চেয়ে কম বয়সে মনে হয়েছিল মুরুব্বীরা ভুল করছেন, কিন্তু এই বয়সে (৩৫) এসে মনে হচ্ছে মুরুব্বীরা ঠিকই ছিলেন। এদিক বিবেচনায় মনে হচ্ছে, যখন আমরা মুরুব্বী হবো তখন আমরা ঠিকই বুঝবো।
হযরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা সহজ কর, কঠিন করো না এবং মানুষকে সুসংবাদ দাও, তাদের মধ্যে ঘৃণা, বিদ্বেষ সৃষ্টি করো না বা দূরে সরিয়ে দিও না। (সহিহ বুখারী ৬৯, সহিহ মুসলিম ৪৬২৬)
বুখারীর আরেকটি বর্ণনায় ‘বাশশিরু বা সুসংবাদ দাও’ এর জায়গায় এসেছে ‘সাককিনু’ অর্থাৎ মানুষের মনে প্রশান্তি-স্থিরতা সৃষ্টি করো, অশান্তি-বিতৃষ্ণা সৃষ্টি করো না। (সহিহ বুখারী, ৬১২৫)
ওয়ামা আলাইনা ইল্লাল বালাগ।



