কথিত গণপিটুনিতে হত্যার প্রতিবাদে স্বজনদের মানববন্ধন

Mahbubur Rahman

Mahbubur Rahman

জানুয়ারি ১৪ ২০২২, ১৩:১৮

স্টাফ করেসপন্ডেন্টঃ

নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁওয়ের বস্তল মোড়ে প্রধান সড়ক অবরোধ করে কথিত গণপিটুনিতে হত্যার প্রতিবাদে স্বজনদের মানববন্ধন চলছে।

এতে এলাকাবাসীসহ নিহতের স্বজনদেরকে ক্ষোভ প্রকাশ ও আহাজারি করতে দেখা গেছে।

এছাড়া প্রধান সড়ক অবরোধ করে মানববন্ধন করার ফলে সড়কে কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। এবং যানজটে আটকে পড়া পথচারীদের ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।

গত ১৩/১/২২ রোজ বৃহস্পতিবার ভোরে জেলার আড়াইহাজার উপজেলার ইলমদী এলাকা থেকে লাশ উদ্ধার করেছে আড়াইহাজার থানা পুলিশ।

আড়াইহাজার থানার ওসি আনিচুর রহমান জানান, বৃহস্পতিবার ভোর ৫টার দিকে উপজেলার ইলমদী এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

নিহতরা হলেন- নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ বস্তল এলাকার মো. মফিজুল, জহিরুল ইসলাম জেসলু ও মো. নবী। তাদের সবার বয়স ২০ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। জেসলু একটি লেগুনার মালিক এবং নবী ও মফিজুল লেগুনার চালক ছিলেন।

ওসি আনিচুর রহমান বলেন, সকাল ৬টায় স্থানীয় চেয়ারম্যানের কাছ থেকে গণপিটুনির খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে তারা দেখেন দুই জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত অবস্থায় উদ্ধার করে আরেকজনকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাকেও মৃত ঘোষণা করেন।

নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “ডাকাত সন্দেহে রাতের কোনো এক সময় ওই তিনজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। সকালে তাদের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়।

নিহত মফিজুলের মা মনোয়ারা বেগম বলছেন, তার ছেলে রূপগঞ্জের গাউছিয়া থেকে গার্মেন্টস কারখানার শ্রমিকদের আনা নেওয়া করে। বুধবার রাত ১০টার দিকে লেগুনা নিয়ে তিনি বাসা থেকে বের হন।

“সকালে জানলাম, আমার ছেলেকে পিটাইয়া মাইরা ফালাইসে। আমি আমার ছেলেরে মারার বিচার চাই।

নিহতের স্বজন ও স্থানীয়দের অভিযোগ তাদেরকে পূর্ব শত্রুতার জেরে পরিকল্পিত ভাবে হত্যা করা হয়েছে।

এলাকাবাসীর বরাত দিয়ে অতিঃ পুলিশ সুপার বলেন, ‘ভোর ৫টায় রূপগঞ্জের একটি গার্মেন্টসের শ্রমিকবাহী মিনিবাস আড়াইহাজার উপজেলার সিংহদী এলাকায় আটক করে ছিনতাইয়ের চেষ্টা করে তিন জন। পরে শ্রমিকেরা তাদের আটক করে ইলুমদী বাজারে নিয়ে আসে। এ সময় শ্রমিকদের কাছ থেকে তিন জনকে ছিনিয়ে নিয়ে ডাকাত সন্দেহে এলাকাবাসী গণপিটুনি দেয়। গণপিটুনিতেই তিন জন মারা গেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ময়নাতদন্তের পর সঠিকভাবে বলা যাবে। নিহতদের ব্যবহৃত লেগুনা গাড়ি দুটি উদ্ধার করা হয়েছে। এ বিষয়ে তদন্ত চলছে। এখনই কিছু বলতে পারছি না। এ ঘটনায় মামলা দায়ের করা হবে। যারাই অপরাধী, তাদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হবে।

আড়াইহাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের ডাক্তার গোলাম দস্তগীর প্রিন্স বলেন, ‘তিন জনকেই মৃত অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। তিন জনের মাথায় ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন আছে। এছাড়া শরীরে লাঠি ও রড দিয়ে পেটানোসহ কিলঘুষির চিহ্নও আছে। ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন দেখে পরিকল্পিতভাবে মাথায় আঘাত করা হয়েছে বলেই মনে হচ্ছে।

নিহত মফিজুলের মা মনোয়ারা বেগম বলেন, ‘প্রতিদিনের মতো মফিজুল ভোর ৪টায় ইলমদী এলাকার শ্রমিক নেওয়ার জন্য গাড়ি নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়। তার সঙ্গে লেগুনার মালিক জেসনুও ছিল। এলাকাবাসীর কাছে সকালে খবর পেয়ে হাসপাতালে গিয়ে আমার ছেলের লাশ দেখতে পাই।’ তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে ডাকাত না। গাড়ি চালায়। তাকে ওরা মেরে ফেলেছে।

নিহত জহিরুলের ছোট ভাই তারেক বলেন, ‘আমার ভাই রাত ৪টার দিকে লেগুনার ড্রাইভার মফিজুলের সঙ্গে শ্রমিক নেওয়ার জন্য ঐ এলাকায় যায়। আমার ভাই একজন ভালো মানুষ। তাকে শত্রুতাবশত হত্যা করা হয়েছে।

নিহত জেসনুর বোন হেলেনা বলেন, ‘আমার ভাই এসএসসি পর্যন্ত পড়ালেখা করে বিদেশে চলে যায়। ৬ মাস আগে দেশে এসে একটি লেগুনা কেনে। সেই লেগুনা ভাড়ায় চালিয়ে সংসার চালাত। আমার ভাই ডাকাত না। তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই।

নিহত জহিরুলের বন্ধু গোলজার বলেন, ‘আমরা একসঙ্গে গাড়ির ব্যবসা করি। সে ডাকাত না। একজন ভালো মানুষ। কেউ শত্রুতা করে তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছে। গাড়ি নিয়ে কারো সঙ্গে কোনো বিরোধের কথা কখনো শুনিনি।’ কারা এবং কেন তাদের হত্যা করেছে, সে বিষয়ে স্বজন ও বন্ধুবান্ধবের কেউই কিছু বলতে পারেননি। ঘটনাস্থলে গিয়ে ডাকাতির বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। এমনকি ডাকাতি বা ছিনতাই হয়েছে বলে কেউ স্বীকারও করেনি। পুরো বিষয়টিই রহস্যজনক বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।