অমানিশা | নাহিদ নজরুল

একুশে জার্নাল

একুশে জার্নাল

ডিসেম্বর ০৩ ২০১৮, ০৫:০৫

জনাব আরীফ সাহেব সহজ-সরল প্রকৃতিক গ্রামের একজন মানুষ!
পেশাদার একজন ব্যবসায়ী!
সৎ ভাবে বেশ পরিশ্রমে আয় উপার্জন করে হাল ধরে রেখেছেন তার এই ছোট্ট সংসারটির।
কামাই রোজগারের পরিমান খুব বেশি
না হলেও বাপ,দাদার ওয়ারিশিসূত্রে যে পরিমান জায়গা-জমি পেয়েছে
তা দিয়েই মোটামুটি চলছে আরীফ সাহেবের ছোট্ট সংসারটি।
এক ছেলে ও এক মেয়ের জনক সে।
আরীফ সাহেব নিয়মিতই নামায,কালাম সহ ইসলামের অানুষাঙ্গিক বিধি বিধানগুলোও ঠিকঠাক মতো আদায় করে। এককথায় আরীফ সাহেব যথার্থ ধর্মপরায়ন মানুষ।
ছেলে মেয়ের প্রতি যথেষ্ঠ দায়িত্ববানও সে। সারাদিন ব্যবসা বানিজ্য শেষে সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে এসে কলিজার টুকরো দু’জন ছেলে- মেয়ের হাসিমাখা মুখের আব্বু ডাক শুনে
সারাদিনের কষ্ট- ক্লান্তি এক নিমেষেই যেন ভুলে যায়।
এভাবেই কেটে যায় আরীফ সাহেবের জীবন থেকে কয়েকটা বছর!
ধীরে ধীরে ছেলে মেয়ে বড় হতে থাকে
আর ক্রমেই যেন আরীফ সাহেবের দায়িত্ব বাড়তে থাকে।
তাদেরকে সু’শিক্ষায় শিক্ষিত করার মানসে জীবন সঙ্গিনী বিবি সাহেবার বুদ্ধির ফাঁদে পা দিয়ে বহুআদরের মেয়ে তোহফা কে প্রাইমারী শেষে হাইস্কুলে
ভর্তি করিয়ে দেয়।
আর ছোট ছেলে তালহা কে ভর্তি করে দেয় হাফিজিয়া মাদরাসায়!
যদিও আরীফ সাহেবের প্রবল ইচ্ছা
ছিলো ছেলে-মেয়ে দু’জনকেই মাদরাসায় পড়ানোর। কিন্তু তা আর হয়ে উঠলো না।
ধীরে ধীরে তুহফা বড় হতে থাকে আর কৈশোরের সমস্থ সৌন্দর্যরূপ ছাপিয়ে ওঠে তার সর্বসত্তায়। সেই সাথে তোহফা তার বান্ধবী ও অন্যান্য ছাত্রীদের মতো বেপর্দা
অর্থাৎ বোরকা ছাড়াই
স্কুলে যাওয়া-আসা শুরু করে।
তার বাবা বারংবার বোরকা পড়ার তাগিদ দেওয়া সত্ত্বেও মায়ের সরলতার সুযোগে তুহফা সায় পেয়ে ইসলামী শরিয়তের অমোঘ বিধান অমান্য করতে শুরু করে।
ফলে স্কুলের বখাটে ছেলেরা তোহফার রূপ
লাবণ্যে মুগ্ধ হয়ে রীতিমত তার পিছু নেয়।
তাদের মধ্যকার একজন ওর ক্লাসমেট!
নাম তার রাসেল! সে তোহফাকে প্রেমের প্রস্তাব করে বসে।তৎক্ষণাৎ তোহফা ভ্যাবাচ্যাকায় পড়ে গেলেও পরবর্তিতে বান্ধবিদের প্ররোচনায় সে রাজি হয়ে যায়।
তুহফা দু’বছর হলো কলেজে ওঠেছে।
পরিবেশের কুপ্রভাবে তুহফা তখন অনেকটাই বদলে গেছে।
বান্ধবী ও অন্যান্য ছাত্র-ছাত্রীদের চাল-চলন দেখতে দেখতে নিজের ধর্মপরায়ন বাবার কথা যেনো একেকারেই বেমালুম!
নিজের জন্মদাতা বাবার কথা ভুলে গিয়ে গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে
হাবুডুবু খেতে থাকে রাসেলের প্রেমে।
সুযোগ পেলেই রাসেলের সাথে খোশ-গল্প ও হাসি তামাশায় মেতে ওঠে।
কথা চলে প্রাণ খলে। ইতিমধ্যে ওদের প্রেমালাপ স্কুলের গণ্ডি পিরিয়ে মুঠোফোনে এসে পৌঁছে। তোহফার ব্যক্তিগত কোন ফোন ছিলো না বিধায় সুযোগ পেলেই বাসায় ওর আম্মুর ফোন দিয়ে রাসেলের সাথে কথা বলে।
শুরু হয় ওদের মধ্যে মধুর সম্পর্ক।
যেনো একে অপরের জন্য বেকারার।
ওদের দু’জনের বাড়ি ছিলো পাশাপাশি দুটি
ভিন্ন ভিন্ন গ্রামে তাই প্রত্যেকদিন বিকেলবেলা রাসেল তোহফার সাথে দেখা করতে আসতো। কিন্তু তোহফার পক্ষে প্রতিদিন বাড়ি থেকে বের হয়ে রাসেলের সাথে দেখা করাটা সম্ভব হয়ে ওঠতো না তোহফার আম্মুর কারণে। তাই ওরা চিন্তাভাবনা করলো যে, নাহ এভাবে আর অস্বস্তিকর অবস্থায় চলতে পারে না।
যেভাবেই হোক পালিয়ে যেতে হবে বাসাথেকে।
আর ভালো লাগে না বাবা-মা’র এমন দমন-পীড়ন। যেমন ভাবা তেমন কাজ পরস্পরে আলাপ আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিলো তাই হবে। হঠাৎ একদিন রাতে তোহফা রাসেলের হাত ধরে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যায়। এদিকে রাসেল অনেক আগ থেকেই তার আরো দু’য়েকজন বন্ধুকে খবর দিয়ে রাখে! তাদের সহযোগীতায় ওরা সবাই মিলে সরাসরি চলে চলে যায় কাজী অফিসে।
সেখানেই রেজেস্টির মাধ্যমে ওরা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়।
তারপর আত্মীয় স্বজনদের এ’বাড়ি ও’বাড়ি করে অতিবাহিত করে কয়েকটাদিন।
ওদিকে বেচারা আরীফ সাহেব মেয়ের দুশ্চিন্তায় মৃতপ্রায়। পরবর্তিতে আত্মীয় স্বজনদের বাড়িতে খোঁজ খবর নিয়ে জানতে পারে পাশের গ্রামের আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে রাসেলের সাথে কাজী অফিসে গিয়ে সাক্ষী সরায়েতের মাধ্যমে রেজিস্টার করে কাজী সাহেবের দ্বারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে।
একথা শুনা মাত্রই আরীফ সাহেবের মাথায় যেনো আকাশ ভেঙে পড়ে।
দুঃখ ও লোকলজ্জায় বেচারা খুবই বিমর্ষ হয়ে পড়ে। বেচারা আরীফ সাহেব একেবারেই বেচাইন হয়ে যায় একমাত্র মেয়ে তোহফার এমন কর্মকাণ্ডের জন্য।
মূহুর্তের মধ্যেই আরীফ সাহেবের সাজানো গোছানো শত স্বপ্নের প্রাসাদ ভেঙে চূর্ণবিচূণ হয়ে যায়।
ভাবনার অথৈ সাগরে তলিয়ে হাবুডুবু খেতে থাকে। কী করবে এখন সে?
খুঁজে পায় না তার কোন কূল-কিনারা।
পরিশেষে তাদের দু’জনকেই বাড়িতে নিয়ে আসে। অবাধ্য হয়েই মেনে নিতে হয় এমন ন্যক্কারজনক পরিস্থিতি।
এভাবেই চলতে থাকে তোহফার নতুন দাম্পত্য জীবন। বাবার বাড়িতেই।
দিন ফুরিয়ে আসে সপ্তাহ! সপ্তাহ পেরিয়ে যায় মাস।এভাবেই কেটে যায় কয়েকটামাস।
তারপরই শুরু হয় আসল খেলা!
তোহফার জীবনে শুরু হয় ঘোর অন্ধ্যকারের অধ্যায়।
কয়েকটা মাস গত হতে না হতেই
বখাটে রাসেল প্রেমে পড়ে আরেক যুবতি মেয়ের ! কমতে শুরু করে তোহফার প্রতি রাসেলের প্রেম-ভালোবাসা!
শুরু হয় তোহফাদের দাম্পত্য জীবনের কলহ পর্ব।দাম্পত্য জীবনে ধরে চিরচিরে ফাটল।
তিনবেলা খাবারের মতো লেগেই থাকে রাগারাগি ও মনোমালিন্য।
হঠাতই রাসেল একদিন ঐ মেয়ের সাথে অাপত্তিকর অবস্থায় ধরা পড়ে যায় লোকের চোখে।
মূহুর্তেই বাতাসের গতিতে এই খবর ছড়িয়ে পড়ে তোহফাদের এলাকায়।
এমনকি পার্শবর্তি অন্যান্য এলাকায়ও।
শুরু হয় একেক রকমের আলোচনা-সমালোচনা । বিভিন্ন ধরণের কথা রটতে মানুষের মুখে মুখে।নেমে আসে তোহফার সুন্দর জীবনে ঘুটঘুটে অমানিশা।
তোহফার নিজের প্রতি জন্ম নেয় একরাশ ঘৃণা!কপাল চাপড়ে বলতে থাকে সে- হায় এ কী করলাম আমি! যদি বাবার কথা অনুযায়ী চলতাম তবে হয়তো আজ এই দিনটি আমার দেখতে হতো না।
এভাবেই আফসোসের সহস্র অঙ্গারে পুড়তে থাকে তোহফা।
কোনভাবেই সে নিজেকে আর ক্ষমা করতে পারে না…………।