বাঙ্গালীর সীমাহীন অদূরদর্শিতা : রেসালায়ে নূর থেকে হক্কানী তাফসীর

একুশে জার্নাল

একুশে জার্নাল

নভেম্বর ০৯ ২০১৯, ১৪:০৮

সৈয়দ শামছুল হুদা

বেশকিছুদিন ধরে বদিউজ্জামান সাঈদ নূরসি রহ.কে পড়ছি। তাঁর ছোট ছোট পুস্তিকাগুলো খুব মনযোগ দিয়ে অধ্যয়ন করছি । আত্মস্থ করতে চেষ্টা করছি। বর্তমান তুরস্ক যার আধ্যাত্মিক চেতনা ধারণ করে বিশ্ব শাসনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে তিনি আর কেউ নন, তিনি হলেন বদিউজ্জামান সাঈদ নুরসী রহ.। তাঁর প্রতিটি কথা, প্রতিটি উক্তি, প্রতিটি লেখা যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে। হেফাজত করা হয়েছে। চরম প্রতিকূল পরিবেশকে উপেক্ষা করেও তাঁর মুখ থেকে নিঃসৃত কথা, তাঁর কলম থেকে বের হওয়া শব্দকে তুরস্কের কোটি কোটি মানুষ ধরে রেখেছে।

তাঁর সমগ্র রচনাকেই রেসালায়ে নূর হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়েছে। তিনি তুরস্কের উসমানী খেলাফতের শান-শওকত ও জৌলুস যেমন দেখেছেন, তেমনি কামাল আতাতুর্কের সময় রাষ্ট্রশক্তির নির্মমতাও দেখেছেন। ইসলামকে কীভাবে নির্মূল করা হয়েছিল, কীভাবে তরুন প্রজন্ম ইসলাম থেকে দূরে চলে গিয়েছিল, সে সমস্যার সমাধান কী? তা তিনি যেভাবে ভেবেছেন, সেভাবে লিখে গেছেন। তার ভক্ত অনুসারীরা তা সংরক্ষণ করেছে। শুধু সংরক্ষণ বললে ভুল হবে, পুরোপুরি হৃদয়াঙ্গম করতে আত্মস্থও করে যাচ্ছে। আজ তুরস্কে মনস্তাস্তিক পুন:র্গঠনের কাজ চলছে। এ কাজে নেপথ্যে থেকে যিনি আধ্যাত্মিক শক্তি যোগাচ্ছেন তিনি হলেন বদিউজ্জামান সাঈদ নূরসি রহ. ।

আজ সারাবিশ্বে বদিউজ্জামান সাঈদ নুরসীকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে যাতে শুধু তুরস্কবাসীই নয়, সারাবিশ্ববাসীই তাকে আপন করে নেয়। তাঁর সমস্ত রচনা বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ করা হচ্ছে।তিনি যখন যেটা যেভাবে বলা প্রয়োজন, যে রোগে যে ধরণের চিকিৎসা দেওয়া প্রয়োজন, সময় ও পরিস্থিতির আলোকে তার সমাধান দেওয়া প্রয়োজন তা তিনি দিয়ে গিয়েছেন। সবচেয়ে বড় কথা, তাঁর সেই মুল্যবান কথাগুলো তুরস্কের নাগরিকগন হেফাজত করেছেন। তাকে কেন্দ্র করেই এখন বিরাট কিছু হয়ে যাচ্ছে। আমরা অনেকেই হয়তো এর কোন খবরই রাখি না।

প্রতিদিন বিভিন্ন ওয়েবসাইটের মাধ্যমে, হোয়াটসএ্যাপ গ্রুপের মাধ্যমে তাঁর বাণী পাই। কিন্তু আফসোসের কথা হলো- আমাদেরও একজন বদিউজ্জামান ছিলেন। বদিউজ্জামান যে দরদী ভাষায় তার দেশের মানুষগুলোকে কথা বলে গিয়েছেন, তাঁর সময়কার আধ্যাত্মিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক সমস্যাগুলোর যে সমাধান দিয়ে গিয়েছেন ঠিক তেমনিভাবে আমাদেরও একজন এভাবেই আমাদের সমস্যাগুলোর সমাধান দিয়ে গিয়েছেন। কিন্তু আমরা সেটা গ্রহন করিনি। আমরা সেটার হেফাজত করিনি। কারণ আমরা এক কপালপোড়া জাতি। আর সেই মহান ব্যাক্তিটি হলেন আল্লামা শামসুল হক ফরিদপুরী রহ।

আল্লামা শামসুল হক ফরিদপুরী রহ. এমনভাবে দরদের সাথে কথাগুলো বলে গেছেন যা পড়লে মনে হয় এগুলোই বাঙ্গালী মুসলমানদের চূড়ান্ত সমাধান। আজকে যদি আপনি সদর সাহেব হুজুরের বইগুলো সামনে রেখে পড়তে বসেন, আর দেশের সমসাময়িক সমস্যাগুলোও সামনে রাখেন দেখবেন কী সুন্দর সমাধান দিয়ে গিয়েছেন। ধর্মীয় সমস্যা, সামাজিক সমস্যা, পারিবারিক সমস্যা, রাষ্ট্রের সমস্যা, আলেমদের নৈতিক স্খলন সমস্যা, নেতৃত্বের সমস্যা, সাংগঠনিক সমস্যা, মানসিকতার সমস্যা এর সবকিছুর সমাধান কি তিনি তাঁর ছোট ছোট পুস্তিকার মাধ্যমে দিয়েগিয়েছেন। কিন্তু আমরা যে খুব বড় চালাক এক জাতি, খুব বেশি সতর্ক এক জাতি!! আমরা কি সহজে এগুলো গ্রহন করবো? আমরা এগুলো গ্রহন করিনি। তাঁর দরদী কথাগুলোর কোন মূল্য দিইনি। আমরা সদর সাহেব হুজুর এর রচনাগুলোর হেফাজত করতে পারিনি। তাঁর পরিবার পারেনি। আমরা আকাবির আকাবির করে মুখে ফেনা তুলি বটে , কিন্তু আকাবিরদের কথাগুলো অনুসরণ করিনি। মেনে চলতে চেষ্টাও করিনি। যে কারণে আজ বাঙ্গালী আলেম সমাজের দূরাবস্থা।

বিশ্বকল্যাণ পাবলিকেশন্স থেকে আল্লামা শামসুল হক ফরিদপুরী রহ. এর গ্রন্থাবলী প্রকাশ করা হযেছে। ৩খন্ডে তাঁর লেখাগুলোর আংশিক প্রকাশ হয়েছে। কিন্তু হারিয়ে গেছে হক্কানী তাফসীর। বাঙ্গালী মুসলমানদের মধ্যে তিনিই প্রথম ব্যাক্তি যিনি কুরআনকে আমাদের মাতৃভাষায় এমনভাবে তুলে নিয়ে এসেছিলেন যা থেকে গোটা বাঙ্গালী সমাজ উপকৃত হতে পারতো। আজ বদিউজ্জামান সাঈদ নুরসীর রেসালায়ে নূর আমরা পাঠ করি। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, আমরা রেসালায়ে ফরিদপুরী রহ.কে হেফাজত করতে পারিনি। তাঁর তাফসীরই শুধু নয়, তাঁর দরদী কথাগুলো এদেশের আলেম সমাজ মনে রাখেনি। মনে রাখার চেষ্টা করেনি। আত্মস্থ করাতো অনেক দূরের কথা।

আমরা গুনীদের কদর করতে জানি না। আমরা ভালোটা একটু কম দেখি। মানুষের খারাপটাই একটু বেশি দেখি।মাওলানা মওদুদীর তাফহীমুল কুরআন যাতে এদেশের মানুষ না পড়ে, তার জন্য কত চেষ্টা করেছি, কত ফতোয়া দিয়েছি। কিন্তু হাক্কানী তাফসীর যাতে পড়তে পারে তার জন্য সম্মিলিত কোন ব্যবস্থা নিতে পারিনি। রেসালায়ে নূর আল্লামা বদিউজ্জামান এর গতানুগতিক কোন তাফসীর নয়। আল কুরআনের ধারাবাহিক কোন আলোচনা নয়। কিন্তু আল কুরআনের গোটা বার্তাটি তাঁর সময়কে ধারণ করে সময়ের ভাষায় উপস্থাপন করেছেন।

তেমনি হক্কানী তাফসীর এর কিছু অংশ যা আমাদের সামনে আছে, বা ছোট ছোট পুস্তিকাগুলোতে যেভাবে কুরআনের প্রতিটি আয়াতের ভিন্নস্বাদে অনুবাদ করেছেন তা এক কথায় অসাধারণ। খুব সহজ-সাবলিল ভাষায় আল কুরআনকে মাতৃভাষায় তিনি জাতির সামনে তুলে ধরে ছিলেন। কিন্তু আমরা সেটার হেফাজত করিনি। তাঁর ছোট ছোট পুস্তিকাগুলোকে সামনে রেখে অনেক গবেষণা হতে পারতো, পাঠচক্র হতে পারতো, কিন্তু এর কিছুই হয়নি। তাঁর এক একটি ছোট পুস্তিকা বড় আকার ধারণ করতে পারতো। কিন্তু হয়নি। রেসালায়ে নূর হয়েছে। বদিউজ্জামান সাঈদ নুরসীর প্রতিটি কথা নিয়ে বিশ্বব্যাপি আজ গবেষণা হচ্ছে। নতুন নতুন ভাবে তাকে উপস্থাপন করা হচ্ছে। কিন্তু আল্লামা ফরিদপুরী রহ.কে নতুনভাবে তো দূরের কথা মূল কপিগুলোরই হেফাজত হয়নি। আর দশজনের লিখনী থেকে সদর সাহেব হুজুর এর লিখনীগুলোর অনেক পার্থক্য আছে।

আপনি যদি হক্কানী তাফসীর বা হুজুরের ছোট ছোট বইগুলো পড়েন, আর সেখানের আয়াতগুলোর অর্থটা পড়েন তাহলে দেখবেন হুজুরের অনুবাদের মধ্যে আলাদা একটি বার্তা আছে। আলাদা একটি দরদ আছে।স্বাদ আছে। যেটা অন্য কোন তাফসীরে পাওয়া যায় না। তিনি তাঁর লেখায় সতর্ক করে বলেছিলেন, আমার লেখাগুলোর হেফাজত করবা। এর প্রতিটি হরফ খুব দরদ দিয়ে লেখা। এগুলো হারিয়ে গেলে সারাজীবন খুঁজেও আর পাবা না “ সত্যিই, এগুলো আর পাওয়া সম্ভব নয়। হাতে লেখা প্রায় ১৬হাজার পৃষ্ঠার হক্কানী তাফসীর আজ আমাদের কাছে হেফাজত নেই। তাঁর দরদী কথাগুলো নাকি হারিয়ে গেছে। পরিবারের নানা ঠেলাঠেলিতে এগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। আফসোস। আমরা এমনই। এমনই আমাদের দূরদর্শিতা!!

যে দেশে গুণীর কদর নেই, সে দেশের মানুষের মর্যাদা কে রক্ষা করবে?