কারবালা ট্রাজেডি ও আশুরার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

একুশে জার্নাল

একুশে জার্নাল

সেপ্টেম্বর ১০ ২০১৯, ০৭:২২

কারবালা ট্রাজেডি : ৬০ হিজরী সালে ইরাকের ফুরাত নদীর তীরে কারবালার প্রান্তরে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর দৌহিত্র ইমাম হুসাইন রা. এর মর্মান্তিক শাহাদাতের ঘটনাই কারবালা ট্রাজেডি হিসেবে খ্যাত। সেদিন ইমাম হুসাইন রা. স্বপরিবারে শহীদ হয়েছিলেন। কিন্ত কেন? নবীপরিবার কেন এই মর্মান্তিক ঘটনার শিকার হয়েছিলেন? ইয়াযিদতো একজন মুসলিম শাসক ছিল! ইয়াজিদ ছিল কাতিবে ওহী হযরত আমীরে মুয়াবিয়া রা. এর ছেলে।
ইয়াযিদ চেয়েছিল সে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় নেতা থাকবে আর ইমাম হুসাইন রা. সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা থাকবেন। ইয়াজিদ ইমাম হুসাইন রা. এর কাছে প্রস্তাব পাঠিয়েছিল, “মুহতারাম, আপনি আমাকে রাষ্ট্রীয় নেতা হিশেবে মেনে নিন, আমি আপনাকে পীর বা আধ্যাত্মিক নেতা হিশেবে মেনে নেব। দেশ চলবে আমার কমান্ডে আর ধর্ম চলবে আপনার কমান্ডে। দেশীয় বা রাজনৈতিক ব্যাপারে আমার কথাই চুড়ান্ত এবং ধর্মীয় ব্যাপারে আপনার কথাই চুড়ান্ত বলে গন্য হবে।”
কিন্তু ইমাম হুসাইন রা. সেটা মেনে নেননি। তিনি দিপ্ত কন্ঠে বলেছিলেন, “না!, এটা কক্ষনো হতে পারে না, এটা আমার নানা বিশ্বনবী মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আদর্শের পরিপন্থি। রাষ্ট্র এবং ধর্মকে কখনো পৃথক করা যাবে না। সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় নেতা ও সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা একজনই হবেন। অর্থাৎ যিনি হবেন সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা, তার হাতেই রাষ্ট্র ক্ষমতা দিতে হবে অথবা যিনি রাষ্ট্রনেতা হবেন, তাকেই সর্বোচ্চ ধার্মিকে রূপান্তরিত করতে হবে। হয় রাষ্ট্র ক্ষমতা ধর্মীয় নেতার কাছে দাও, নতুবা তুমি পরোপুরী ধার্মিক হয়ে যাও।”
কিন্তু ইয়াযিদ ইমাম হুসাইন রা. এর আদর্শিক ও যৌক্তিক প্রস্তাব মেনে নেয়নি। ফলে সৃষ্টি হয় কারবালা ট্রাজেডি। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পরিবারের সবাই শাহাদাত বরণ করেন কিন্ত বাতিল চিন্তার সাথে আপোষ করেননি। এটাই কারবালা ট্রাজেডির মূল শিক্ষা। প্রয়োজনে ইসলামের জন্য, ইসলামী আদর্শের জন্য জীবন দিতে হবে, কিন্তু আদর্শ থেকে বিচ্যুত হওয়া যাবেনে।
তাই বাংলাদেশসহ বিশ্বের যেকোন দেশে মানবাধিকার ও কাংখিত শান্তি প্রতিষ্টার পূর্বশর্ত হলো, ধার্মিকদেরকে নেতা বানাতে হবে নতুবা নেতাদেরকে ধার্মিক বানাতে হবে। আর কোন বিকল্প নেই।

আশুরার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট : আশুরা মানে মুহাররামের ১০ তারিখ! উপলব্দির সীমাবদ্ধতা থাকলেও জনসাধারণের কাছে আশুরা-মুহাররাম-কারবালা ট্রাজেডি প্রায় সমার্থক। অনেকের ধারণা যে, একমাত্র কারবালার মর্মান্তিক ঘটনার কারণেই আশুরা তাতপর্যপূর্ণ হয়েছে। কারবালা ট্রাজেডি দ্বারা আশুরা মহিমান্বিত হলেও আশুরার রয়েছে অনেক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। তাই আশুরাকে কারবালা ট্রাজেডির মাঝে সীমাবদ্ধ না রেখে এর বিস্তৃত তাৎপর্য জনসম্মুখে তুলে ধরতেই এই প্রয়াস-
০১. রূহ জগতে সমস্থ সৃষ্টি কূলের আত্মা আল্লাহ পাক সৃষ্টি করেছেন আশুরার দিনে। তাই আশুরার দিন মানে মুহাররামের ১০ তারিখ সৃষ্টিকূলের আত্মার জন্মদিন।
০২. পৃথিবীর সকল পাহাড়-পর্বত, নদী-নালা, সাগর-মহাসাগর এসবই আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন আশুরার দিনে।
০৩. আদি পিতা হযরত আদম আলাইহিস সালামকে আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন আশুরার দিনে। আদম আলাইহিস সালাম সর্ব প্রথম বেহেস্তে প্রবেশ করেন আশুরার দিনে। দীর্ঘদিন ক্ষমাপ্রার্থনার পর আদম আলাইহিস সালাম এর তাওবা কবুল হয় আশুরার দিনে।
০৪. এই আশুরার দিনে হযরত নূহ আলাইহিস সালাম সঙ্গী-সাথীসহ নৌকা আরোহণ করেন। আল্লাহ তাদেরকে গজব থেকে হেফাজত করেন।
০৫. আশুরার দিনে আল্লাহ হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস সালামকে সৃষ্টি করেণ। এই আশুরার দিনে হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম নমরুদের অগ্নিকূন্ড থেকে বেরিয়ে আসেন।
০৬. আশুরার দিনে হযরত মুসা আ এর উপর তাওরাত অবতীর্ণ হয়। এই আশুরা দিনেই মুসা আলাইহিস সালাম অলৌকিক ভাবে নীলনদ পেরিয়ে যান এবং ফেরাউন বাহিনীর সলিল সমাধি হয়।
০৭. আশুরার দিনে ধৈর্যের প্রতিক হযরত আইয়ূব আলাইহিস সালাম দীর্ঘদিন পর রোগমুক্ত হন।
০৮. অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে হারিয়ে যাওয়া হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম এই আশুরার দিনেরই স্বীয় পিতা হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালাম এর সাথে মিলিত হন।
০৯. আশুরার দিনে হযরত ইউনুস আলাইহিস সালাম তিনটি অন্ধকার থেকে মুক্তি পান। নবী ইউনুস আলাইহিস সালাম কে যে মাছ খেয়েছিল সে মাছকে আরেকটি বড় মাছ খেয়ে ফেলে। তাই পানির নিচ এক অন্ধকান, তার ভেতর বড় মাছের পেট ২য় অন্ধকার, তার ভেতর তুলনা মূলক ছোট মাছের পেট ৩য় অন্ধকার।
১০. সমস্ত মানব-দানব ও প্রাণীকূলের সম্রাট হযরত সুলাইমান আলাইহিস সালাম এই আশুরার দিনেই তার হারানো সাম্রাজ্য ফিরে পান। (বিশেষ কারণে নবী সুলাইমান আলাইহিস সালামএকবার রাজ্যহারা হয়েছিলেন।)
১১. আল্লাহর কুদরতে পিতাহীন ভাবে হযরত ইসা আলাইহিস সালাম আশুরার দিনেই জন্ম লাভ করেন। পরবর্তীতে এই আশুরার দিনেই আল্লাহ পাক তাকে জিবিত অবস্থায় আকাশে উঠিয়ে নেন। তিনি এখনো স্বশরীরের, সুস্থ্য অবস্থায় জিবিত আছেন।
১২. আশুরার দিনে আমাদের নবী. বিশ্বনবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে সর্ব প্রথম ওহী আসে। তাই ইসলাম ধর্মেরও জন্মদিন আশুরা।
১৩. পৃথিবীতে সর্ব প্রথম বৃষ্টি হয় আশুরার দিনে।
১৪. এই আশুরার দিনই আবার পৃথিবী ধ্বংস করা হবে।
এবং
১৫. এই আশুরার দিনে কারবালার প্রান্তরে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি সালাম এর দৌহিত্র, হযরত ফাতেমা রা. তনয় ইমাম হুসাইন রা. স্বপরিবারে শাহাদাত বরণ করেন।