৫ লাখ টাকা লিমিট নিয়ে নতুন মোবাইল অর্থ লেনদেন সেবা নগদ

একুশে জার্নাল

একুশে জার্নাল

অক্টোবর ২৩ ২০১৮, ১৪:০৫

নগদ কি?

ডাক বিভাগ বাংলাদেশের ১৫০ বছরেরও অধিক সময়ের ঐতিহ্যবাহী একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের তেমন দৃঢ় আস্থা না থাকলেও অধিক ইন্টারেস্ট প্রদানের কারণে ডাক বিভাগের সঞ্চয়পত্র সবার মাঝে বেশ জনপ্রিয়। নগদ হল ডাক বিভাগের একটি নতুন ডিজিটাল ফাইন্যান্সিয়াল সেবা যা পরিচালিত হবে থার্ড ওয়েভ টেকনোলজিস লিমিটেডের মাধ্যমে। নগদ দিয়ে অন্যান্য আর সকল মোবাইল ব্যাংকিং সেবাগুলোর মতই টাকা জমা করা যাবে, নগদ উদ্যোক্তা পয়েন্ট থেকে টাকা তোলা যাবে, টাকা পাঠানো যাবে যেকোনো মোবাইল নম্বরে। এছাড়াও মোবাইলে রিচার্জ করা যাবে এবং মার্চেন্ট পেমেন্টসহ আরও বেশ কিছু আকর্ষণীয় সুবিধা আসবে ভবিষ্যতে। এছাড়াও নগদের থাকা টাকার ওপর ইন্টারেস্ট পাওয়া যাবে।

নগদ ব্যবহারের পদ্ধতিসমূহ

কিভাবে নগদ ব্যবহার করা যাবে?

অন্যান্য মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মতই নগদ ব্যবহার করা যাবে USSD (*167#) ডায়াল করে এবং মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে। এর পাশাপাশি নগদ অ্যাকাউন্ট খোলার সময় আপনাকে একটি ১৬ ডিজিটের অ্যাকাউন্ট নম্বর প্রদান করবে। এই অ্যাকাউন্ট নম্বর ব্যবহার করলেও লেনদেনের কাজ করা যাবে। এছাড়াও নগদ কার্ড নামে একটি সুবিধার কথা জানা গেলেও সেটি ভার্চুয়াল নাকি প্লাস্টিক কার্ড সে বিষয়ে সঠিক তথ্য পাওয়া যায়নি। নগদ উদ্যোক্তা পয়েন্ট এবং মার্চেন্ট পয়েন্ট থেকে QR কোডের মাধ্যমে টাকা উত্তোলন এবং পেমেন্ট করা যাবে।

যেভাবে নগদ অ্যাকাউন্ট খুলবেন

নগদ অ্যাকাউন্ট খোলা একদম সহজ। আপনি আপনার নিকটস্থ যেকোনো নগদ উদ্যোক্তা পয়েন্ট থেকেই নগদ অ্যাকাউন্ট খুলতে পারবেন। অ্যাকাউন্ট খুলতে নিচের ডকুমেন্টগুলো প্রয়োজন হবে।

  • ন্যাশনাল আইডি কার্ড / পাসপোর্ট / ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং ১টি ফটোকপি
  • ১ কপি পাসপোর্ট সাইজ ছবি

পরিচয়পত্রের মূল কপি সাথে আনতে হবে এবং প্রদর্শন করতে হবে। পরিচয়পত্রের সাথে ফর্মের সকল তথ্য মিল থাকতে হবে। পরিচয়পত্র হিসেবে ন্যাশনাল আইডি কার্ড, পাসপোর্ট এবং ড্রাইভিং লাইসেন্স গ্রহণযোগ্য হবে। বাংলাদেশের যেকোনো টেলিকম অপারেটরের নম্বর দিয়েই নগদ অ্যাকাউন্ট খোলা যায়। অ্যাকাউন্ট খোলার সময় একটি অতিরিক্ত জরুরী যোগাযোগের নম্বরও ফর্মে প্রদান করতে হবে।

নগদ অ্যাকাউন্ট খোলার পদ্ধতি। ছবিসুত্রঃ www.nagad.com.bd

ফর্ম পূরণ করলে এজেন্ট আপনার মোবাইল নম্বর দিয়ে তার ডিভাইসে অ্যাকাউন্ট খুলবে এবং আপনার নম্বরে একটি কনফার্মেশন মেসেজ আসবে। এরপর আপনাকে *167# নম্বরে ডায়াল করে ৪ ডিজিটের একটি পিন নম্বর সেট করতে হবে। তাহলে আপনার অ্যাকাউন্ট চালু হয়ে যাবে এবং আপনার মোবাইলে ১৬ ডিজিটের একটি অ্যাকাউন্ট নম্বর আসবে। সে নম্বরটি আপনার এজেন্টের সাথে শেয়ার করুন। নম্বরটি আপনার ফর্মে লিখে দেয়া হবে। ফর্মের নিচের অংশটি ছিঁড়ে আপনাকে দিয়ে দেয়া হবে। ব্যাস, আপনার নগদ অ্যাকাউন্ট চালু হয়ে গেলো।

অ্যাকাউন্ট খোলার পর প্রাথমিকভাবে আপনার অ্যাকাউন্টটি লিমিটেড অবস্থায় থাকবে। লিমিটেড অবস্থায়ও আপনি মোবাইলে রিচার্জ এবং ক্যাশ আউট করতে পারবেন। তবে অ্যাকাউন্ট খোলার ১-৩ দিনের মধ্যে অ্যাকাউন্টটি আপনার প্রদানকৃত ডকুমেন্ট নিরীক্ষা করে ভেরিফাই করে দেয়া হবে। আমার অ্যাকাউন্ট খোলার পরেরদিনই অ্যাকাউন্ট ভেরিফাই হয়ে গিয়েছে। অ্যাকাউন্ট ভেরিফাই হলে আপনাকে মেসেজ পাঠানো হবে যে, Dear XYZ, Your trust level is upgraded. Current trust level is Full for account XXYYZZ. অ্যাকাউন্ট ট্রাস্ট লেভেল FULL হলে আপনি নগদের পূর্ণ ব্যবহার এবং সর্বোচ্চ লেনদেন করতে পারবেন।

কোথায় নগদ অ্যাকাউন্ট খুলতে পারবেন?

আপনার নিকটস্থ যেকোনো নগদ উদ্যোক্তা পয়েন্ট থেকেই নগদ অ্যাকাউন্ট খোলা যাবে। তবে যেহেতু নগদ একটি নতুন সার্ভিস, তারা তাদের উদ্যোক্তার পরিমাণ বাড়াচ্ছে। আমার অফিসের আশেপাশে ৫টির অধিক নগদের উদ্যোক্তা পয়েন্ট চোখে পড়েছে।

নগদ উদ্যোক্তা পয়েন্ট

আপনার এলাকার সাধারণ বিকাশ, রকেন্ট, ফ্লেক্সিলোডের এজেন্ট পয়েন্টগুলোতে গিয়ে খোঁজ নিলেই জানতে পারবেন নগদ সেবা পাওয়া যাবে কিনা। সাধারনত নগদ উদ্যোক্তা পয়েন্টের বাইরে নগদের ব্যানার চোখে পড়ে। ব্যানার দেখলেই বুঝতে পারবেন এখানে নগদের সেবা পাওয়া যায়।

নগদে লেনদেনের লিমিট

নগদের সবচেয়ে বড় আকর্ষণীয় দিক হল এর অনেক বেশি লেনদেনের লিমিট। নগদের সাহায্যে অবিশ্বাস্য ধরনের বড় অ্যামাউন্টের লেনদেন করা সম্ভব যা অন্য কোন মোবাইল ব্যাংকিং সেবা প্রদান করছে না।

নগদের দৈনিক ও মাসিক লেনদেনের লিমিট

একজন ব্যবহারকারী দৈনিক পৃথকভাবে ২,৫০,০০০ টাকা করে ক্যাশ ইন, ক্যাশ আউট এবং সেন্ড মানি করতে পারবে। প্রতিদিন ১০ বার করে ক্যাশ ইন ও ক্যাশ আউট এবং ৫০ বার সেন্ড মানি করা যাবে। প্রতিটি লেনদেনে সর্বোচ্চ ৫০,০০০ টাকা করে পাঠানো যাবে। প্রতি মাসে একজন ব্যবহারকারী পৃথকভাবে ৫,০০,০০০ টাকা করে ক্যাশ ইন, ক্যাশ আউট এবং সেন্ড মানি করতে পারবে। মাসে সর্বোচ্চ ৫০ বার করে ক্যাশ ইন ও ক্যাশ আউট এবং ১৫০ বার সেন্ড মানি করা যাবে। এছাড়াও প্রতিবার সর্বোচ্চ ১০০০ টাকা করে আনলিমিটেড বার মোবাইল রিচার্জ করা যাবে। এ ধরণের বিশাল লিমিট ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য অনেক উপকারী হবে।

লেনদেনের চার্জ

নগদ অ্যাকাউন্টে লেনদেনের চার্জ বিকাশ এবং রকেটের চাইতে কম। ক্যাশ ইন করলে তা সম্পূর্ণ ফ্রি। এজেন্ট পয়েন্ট থেকে সাধারণভাবে ক্যাশ আউট করলে প্রতি হাজারে ১৮ টাকা চার্জ প্রযোজ্য হবে। তবে নগদ মোবাইল অ্যাপ দিয়ে ক্যাশ আউট করলে হাজারে ১৭ টাকা ফি কাটবে। এছাড়াও অন্য নগদ ইউজারদের সেন্ড মানি করলে যেকোনো অ্যামাউন্টের জন্য ৪ টাকা কাটা হবে। তবে মোবাইল অ্যাপ দিয়ে সেন্ড মানি করলে তা সম্পূর্ণ ফ্রি, অর্থাৎ কোন চার্জ কাটা হবে না।

নগদে লেনদেনের লিমিট

এছাড়াও মোবাইলে রিচার্জ করলে তা সম্পূর্ণ ফ্রি। তবে আপাতত, শুধুমাত্র এয়ারটেল, রবি এবং টেলিটক নম্বরে রিচার্জ করা যাচ্ছে। তবে শীঘ্রই অন্যান্য সকল অপারেটরে রিচার্জের সুবিধা আসছে।

নগদ মোবাইল অ্যাপ

অ্যান্ডয়েড মোবাইলের জন্য নগদ নিয়ে এসেছে Nagad (Beta) অ্যাপ যা দিয়ে ব্যালেন্স চেক করা, সেন্ড মানি, ক্যাশ আউট, রিচার্জ, পেমেন্ট, পিন পরিবর্তন এবং প্রোফাইল আপডেট করা যায়। পেমেন্ট অপশনটিও খুব শীঘ্রই মোবাইল অ্যাপে যুক্ত হবে। অ্যাপটি গুগল প্লে স্টোর থেকে যেকোনো অ্যান্ড্রয়েড মোবাইলে ডাউনলোড করা যাবে।

নগদ অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল অ্যাপের ইন্টারফেস। ছবিসুত্রঃ play.google.com

নগদের অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপটি বেশ দৃষ্টিনন্দন এবং ব্যবহারও বেশ সহজ। সব ধরণের মানুষ যেন সহজেই অ্যাপটি ব্যবহার করতে পারে সে লক্ষ্যেই অ্যাপটি বানানো হয়েছে। বাংলা ভাষায় থাকলেও ভাষা পরিবর্তন করে ইংরেজিটে অ্যাপটি ব্যবহার করা যায়। এখন পর্যন্ত আইফোনের জন্য নগদের অ্যাপ বের হয়নি, তবে তা শীঘ্রই অ্যাপ স্টোরে রিলিজ হবে।

বিকাশ, রকেট নাকি নগদ?

আপনি নিশ্চয়ই ইতিমধ্যে ইতিমধ্যে বিকাশ, রকেট বা অন্যান্য মোবাইল ব্যাংকিং সার্ভিস ব্যবহার করছেন। এত ভালো ভালো সার্ভিস থাকা সত্ত্বেও কেন নগদ ব্যবহার করবেন সে প্রশ্ন থেকেই যায়। বিকাশের এজেন্ট সারা দেশব্যাপী। রকেট কম ফি দিয়ে অনেক ইউজারদের পছন্দের তালিকায় থাকলেও সম্প্রতি ফি বাড়িয়ে একই কাতারে নিয়ে আসার পর জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েছে। যদিও তারা নেক্সাসপে দিয়ে বিভিন্ন বোনাস প্রদান করে টিকে থাকার চেষ্টা করছে। কিন্তু তারপরও কেন মানুষ নগদ ব্যবহার করবে?

এর অন্যতম কারণ হতে পারে নগদের মাধ্যমে বিশাল অ্যামাউন্টের টাকা প্রতিদিন লেনদেন করা যাবে। যেখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী বিকাশ-রকেটে প্রতিদিন ১০,০০০ টাকা করে ক্যাশ আউট এবং সেন্ড মানি করা যায়, সেখানে নগদে দৈনিক লেনদেন করা যাচ্ছে দিনে ২.৫ লাখ টাকা কারণ তা বাংলাদেশ পোস্টাল অ্যাক্ট অনুসারে পরিচালিত হবে। সরকারি ডাক বিভাগের সার্ভিস হওয়ার কারণে বাংলাদেশ পোস্টাল অ্যাক্ট অনুযায়ী এত বেশি লিমিট নগদ দিতে পারছে যা অন্যান্য মোবাইল ব্যাংকিং সার্ভিস দিতে পারছে না। যারা ব্যক্তিগতভাবে ছোট ফেসবুক বা ইন্সটাগ্রাম পেইজের মাধ্যমে ইকমার্স ব্যবসা করেন, তারা সবচেয়ে বেশি যে সমস্যায় পড়েন তা হল দিনে মাত্র ১০,০০০ টাকা রিসিভ করা যায় কোন গ্রাহকের কাছ থেকে। কিন্তু নগদের মাধ্যমে পেমেন্ট নিলে ২.৫ লাখ পর্যন্ত নেয়া সম্ভব হবে।

নগদের কার্যক্রমে মন্ত্রী মোস্তফা জব্বার এবং সোলায়মান শুখন

এছাড়াও, যেহেতু এটি ডাক বিভাগের একটি সেবা, তাই সঞ্চয়পত্রের মত নগদেও অ্যাকাউন্টে রাখা টাকার ওপর অধিক ইন্টারেস্ট দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও অ্যাকাউন্ট খোলার সময় আপনি অ্যাকাউন্টে ইন্টারেস্ট না পেতে চাইলে তা বন্ধ রাখতে পারবেন। তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বিকাশের মত এমন বৃহত্তর এজেন্ট নেটওয়ার্ক তৈরি করা। তবে যেহুতু এটি ডাক বিভাগের সেবা এবং সারা দেশে ডাক বিভাগের শাখা আছে, তাদের পক্ষে এই শাখা ব্যবহার করলে দ্রুত দেশের সব জায়গায় সম্প্রসারণ করা সম্ভব হতে পারে। এছাড়াও বিকাশ-রকেট অসংখ্য ডিসকাউন্ট এবং ক্যাশব্যাক অফার দিচ্ছে যা ব্যবহারকারীদের আকৃষ্ট করছে। এ ধরণের অফার না আনলে নগদের পক্ষে জনপ্রিয় হওয়া কঠিন হবে। এছাড়াও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে প্রতারণা এবং মানি লন্ডারিং আটকানো একটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে।

সময়ই বলে দেবে নগদ জায়গা করে নিতে পারবে কিনা। তবে যেকোনো নতুন প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী সার্ভিস আসা আমাদের ব্যবহারকারীদের জন্য শুভ, কারণ মার্কেটে যত প্রতিদ্বন্দ্বী আসবে, প্রতিটি প্রতিষ্ঠান আরও ভালো সেবা প্রদানে সচেষ্ট করবে, আর তাতে উপকৃত হবো আমরা ব্যবহারকারীরাই। এখন দেখা যাক আসলেই কি – আর সবের দিন শেষ, নগদ হবে বাংলাদেশ?