সত্যের তুলাদণ্ডে কাতেবে ওহী হযরত মুয়াবিয়া রাযি. (২)

একুশে জার্নাল ডটকম

একুশে জার্নাল ডটকম

সেপ্টেম্বর ০২ ২০২১, ১৯:৩৬

মাওলানা মুফতি রাশেদুল ইসলাম: রাসুলের হাদিস ও ইসলামী ইতিহাসের সঠিক জ্ঞান যাদের নাই কিংবা এসব জ্ঞানের ক্ষেত্রে যাদের যথেষ্ট সংকীর্ণতা রয়েছে, তারাই হুব্বে আহলে বাইতের অন্তরালে কাতেবে ওহী হযরত মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুর শানে অযাচিত ও কুরুচিপূর্ণ ভাষায় মন্তব্য ও কটাক্ষ করার দুঃসাহস দেখায়।

হযরত মুয়াবিয়া রা. উল্লেখযোগ্য ওহী লেখকদের একজন। হাদিস গ্রন্থে যার সনদে শতাধিক হাদীস বর্ণিত আছে ।

আমীরুল মু’মিনীন হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব রা. কর্তৃক তৎকালীন শাম (সিরিয়া) রাজ্যের প্রাদেশিক গভর্নর নিযুক্ত হয়ে সুদীর্ঘ ২০ বছর যাবত দায়িত্ব পালন করেছেন। চতুর্থ খলীফা হযরত আলী মুর্তজা রা. এর শাহাদাতের পর হযরত হাসান রা. এর প্রায় অর্ধ বছরের খেলাফান্তে ৪১ হিজরীতে একক আমিরুল-মু’মিনীন নির্বাচিত হয়ে ৬০ হিজরী পর্যন্ত দীর্ঘ ২০ বছর যাবৎ অর্ধ দুনিয়ায় মুসলিম উম্মাহর শাসক ছিলেন।

মক্কা বিজয়ের শুভ মুহূর্তে ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দিয়ে ( যদিও প্রকৃতপক্ষে অনেক আগেই তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, তবে বেশ কিছু ওজর-অসুবিধার কারণে তখন তিনি তা প্রকাশ করতে অপারগ ছিলেন)। নবীজির সার্বক্ষণিক সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। ফলে নবীজির পক্ষ থেকে তার উপর অর্পিত হয় ওহী লিপিবদ্ধ করার সুমহান দায়িত্ব।

এছাড়া দরবারে রেসালত থেকে প্রেরিত যাবতীয় চিঠিপত্র ও আদেশ ফরমানের “মুসাবিদাও” তিনি তৈরি করতেন। আল্লামা ইবনে হাযম রহ. লিখেছেন , নবী করীম সা. এর লেখকদের মধ্যে হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত রা. সর্বাধিক হাজির থাকতেন। এরপর দ্বিতীয় স্থান ছিল হযরত মুয়াবিয়া রা. এর। দিন-রাত এ দু’জন সাহাবী ছায়ার মত নবীজির সঙ্গে সঙ্গে থাকতেন। এই সার্বক্ষণিক সেবা ও দায়িত্বপূর্ণ খেদমত এবং অতুলনীয় জ্ঞান ও প্রজ্ঞাসহ আল্লাহ প্রদত্ত বিভিন্ন গুন ও যোগ্যতার কারণে তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ সা. এর অতি প্রিয় পাত্র।

ফলে নবীজির যে পরিমাণ দোয়া ও স্নেহ তিনি লাভ করেছেন খুব কম সাহাবীরই সে সৌভাগ্য হয়েছিল। তিরমিজি শরীফে বর্ণিত হয়েছে , নবীজি সা. একবার তাকে এভাবে দোয়া দিয়েছিলেন اللهم اجعله هاديا مهديا واهد به

অর্থাৎ হে আল্লাহ! তাকে পথপ্রদর্শক ও পথপ্রাপ্ত করে দাও এবং তার মাধ্যমে মানুষকে হেদায়েত দান করো । (জাওয়ামিউস সহীহ খ. ২ পৃ.২৪৭)

অন্য হাদীসে ইরশাদ হয়েছে,

للهم علم معاوية الكتاب والحساب وقه العذاب ا

হে আল্লাহ! মুয়াবিয়াকে হিসাব ও কিতাবের জ্ঞান দান করো। জাহান্নামের আজাব থেকে তাকে রক্ষা করো। (উসদুল গাবাহ খ.৪ পৃ৩৮৬)

অদূর ভবিষ্যতে হযরত মুয়াবিয়া রা. এর হাতে যে মুসলিম উম্মাহর দায়িত্বভার অর্পিত হবে সে সম্পর্কে স্বয়ং নবী করীম সা. ভবিষ্যদ্বাণী করে গিয়েছিলেন। হযরত মুয়াবিয়া রা. বলেন, একবার আমি নবী করীম সা. এর জন্য ওযুর পানি নিয়ে গেলাম । তা দিয়ে অজু করে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, মুয়াবিয়া! তোমার হাতে যদি শাসন ক্ষমতা অর্পিত হয় তাহলে তখন তুমি আল্লাহকে ভয় করে চলবে এবং ইনসাফ কায়েম করবে। হাদীস বর্ণনার পর হযরত মুয়াবিয়া রা. বলেন রাসূলুল্লাহ সা. এর এই এরশাদের কারণে আমার বদ্ধমূল ধারণা হলো যে , অবশ্যই আমি এ পরীক্ষার তথা শাসন ক্ষমতার সম্মুখীন হব। শেষ পর্যন্ত তাই হল। (আল ইসাবাহ পৃ ৪১৩)।

অনুরূপভাবে নবীজি সা. হযরত মুয়াবিয়া রা. কে একবার সওয়ারিতে নিজের পিছনে বসিয়ে কোথাও যাচ্ছিলেন। কিছুদূর গিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন,মুয়াবিয়া! তোমার দেহের কোন অংশ আমার দেহের সাথে মিশে আছে ? তখন মুয়াবিয়া রা. আরজ করলেন,হে আল্লাহর রাসূল! আমার পেট ও বুক । তখন নবীজি সা. এভাবে দোয়া করলেন اللهم املاه علما

হে আল্লাহ! মিশে থাকা অঙ্গকে ইলম দ্বারা পূর্ণ করে দাও। ( তারিখুল ইসলাম খ-২. পৃ- ৩১৯)

বুখারির হাদিসে এসেছে, নবী করীম সা. এরশাদ করেছেন,

اول جيش من امتي يغزون البحر قد اوجبوا

“আমার উম্মতের যে প্রথম বাহিনী সমুদ্র অভিযানে অংশ নেবে তারা নিজেদের জন্য জান্নাত ওয়াজিব করে নিয়েছে”। (বুখারী, খন্ড ১ , পৃষ্ঠা ৪১০)

আল্লামা ইবনে খালদুন র. লিখেছেন হযরত মুয়াবিয়াই রা. ইসলামের ইতিহাসে সর্বপ্রথম সাহাবাদের এক মোবারক জামা’আত নিয়ে সমুদ্রপথে “সাইপ্রাস” অভিযানে রওনা হন। এজন্য হযরত মুয়াবিয়াই হলেন প্রথম ওই ব্যক্তি যিনি ইসলামী ফৌজের জন্য নৌবহর তৈরি করে মুসলমানদের মধ্যে নৌযুদ্ধের গোড়াপত্তন করেন। (মুকাদ্দামা ইবনে খালদুন – ৪৫৩)

হযরত মুয়াবিয়া রা. আমিরুল মু’মিনীন মনোনীত হওয়ার পর মৃতপ্রায় জিহাদের মোবারক আমল নতুন উদ্যম ও নতুন প্রাণ পেল। রোমকদের বিরুদ্ধে একে একে ১৬ টি যুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন। তার খেলাফত আমলেই সম্পদ সমৃদ্ধ সিসিলি দ্বীপপুঞ্জ মুসলমানদের হাতে বিজিত হয়। সেইসাথে সিজিস্থান থেকে কাবুল পর্যন্ত বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডসহ সুদানের গোটা অঞ্চলে ইসলামের হিলালী ঝান্ডা উড্ডীন হয়।

ঐতিহাসিক আল্লামা ইবনে কাসীর রহ. হযরত মুয়াবিয়া রা. এর সুদীর্ঘ শাসনকালের সামগ্রিক পর্যালোচনা শেষে মন্তব্য টেনে বলেন, তার শাসনামলে জিহাদের ধারা অব্যাহত ছিল। আল্লাহর দ্বীন অপ্রতিরোধ্য গতিতে প্রাধান্য বিস্তার করে চলেছিল এবং বিভিন্ন অঞ্চল থেকে গনিমত লব্ধ সম্পদের ঢল নেমে এসেছিল।

মোটকথা, তার শাসন-ছায়ায় মুসলমানগণ সুখ-শান্তি এবং ইনসাফ ও সমৃদ্ধি পূর্ণ জীবন যাপন করেছিল। ( আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ১২৭)

এমন একজন রাসূলের সান্নিধ্য লাভকারী স্নেহাস্পদ কর্মবীর সাহাবী যার দক্ষ নেতৃত্ব ও সাহসিকতায় সাইপ্রাস, রোড়েসিয়া, সুদান, কনস্টান্টিনোপল, কাবুল ও হিন্দুস্থানের গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু ভূ-খন্ড বিজিত হয়েছিল। বহু বছরের বিভেদ-রক্তপাতের পর যিনি ৪১ হিজরী পরবর্তী সময়ে গোটা মুসলিম উম্মাহ্কে পুনরায় এক পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন। তার শানে আবোল-তাবোল, অপলাপ ও কুরুচিপূর্ণ ভাষায় মন্তব্য করা এবং তাকে সমালোচনার পাত্র বানানো নিজের ইহকাল-পরকাল বরবাদ করা ছাড়া বৈ কিছু নয়।

মনে রাখতে হবে ইমাম হোসাইন ও আহলে বাইতের সম্মান ও আদর্শ ধারণ করে কেউ যদি ইয়াজিদের বিরোধিতায় সরব না হয় , তাহলে সে গুনাগার হবে না এবং আহলে বাইতের আশেকীনের তালিকা থেকে বাদ পড়বে না। কিন্তু ইয়াজিদের বিরোধিতায় জবানের লাগাম হযরত মুয়াবিয়া রা. পর্যন্ত পৌঁছালে নিঃসন্দেহে সে সাহাবী বিদ্বেষী হয়ে চরম গুনাহগার হবে এবং তার ঈমানের ব্যাপারে যথেষ্ট খতরাও থাকবে।

আল্লাহপাক আমাদেরকে সঠিক বুঝ দান করুন। আমীন।


সিনিয়র শিক্ষক- আল-জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম-হাটহাজারী, চট্টগ্রাম।