শরিয়তের দৃষ্টিতে তালাকের প্রকার ও বিধান

একুশে জার্নাল ডটকম

একুশে জার্নাল ডটকম

আগস্ট ৩১ ২০২১, ০০:০৪

মুফতী আহমদ যাকারিয়া


তালাকের শাব্দিক অর্থ:

তালাক শব্দটি বাবে نَصَرَ- يَنْصُرُ থেকে এসেছে, যার শাব্দিক অর্থ হলো বন্ধন মুক্ত করা বা বিবাহ বন্ধন ছিন্ন করা। উত্থান করা, পরিত্যাগ করা, বন্ধন মুক্ত হওয়া, প্রত্যাখ্যান করা, বিবাহ বিচ্ছেদ করা ইত্যাদি।

পরিভাষায় তালাক বলা হয়-

১. বিশেষ কিছু শব্দ দ্বারা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার বিবাহ বন্ধন ছিন্ন করাকে তালাক বলা হয়।

২. বিবাহের মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার অর্জিত সম্পর্ক শরিয়ত নির্ধারিত কিছু শব্দ প্রয়গ করার মাধ্যমে ছিন্ন করাকে তালাক বলা হয়।

৩. বিবাহ বন্ধন তুলে নেওয়া এবং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার সকল সম্পর্ক ছিন্ন করে দেওয়াকে তালাক বলে।

৪. নির্ধারিত শব্দাবলী দ্বারা হালান (সাথে সাথে) অথবা মালান (মাল-সম্পদের মাধ্যমে) বিবাহ বন্ধন বিচ্ছিন্ন করাকে তালাক বলা হয়। (বাহরুর রায়িক, আলমগীরী)

তালাকের ধর্মীয় হুকুম:

১. কখনো তালাক দেওয়া জুলুম,

২. কখনো তালাক দেওয়া মুস্তহাব,

৩. কখনো তালাক দেওয়া ওয়াজিব,

৪. কখনো তালাক দেওয়া হারাম।

 

১ তালাক দেওয়া যখন জুলুম:

যখন স্ত্রী কোনো অন্যায় না করবে বরং সে সতীসাধ্বী থাকবে এমতাবস্থায় স্বামী তার অধীনে থাকা স্ত্রীকে তালাক দেওয়া জুলুম হবে। আল্লাহ বলেন-

فَإِنْ أَطَعْنَكُمْ فَلَا تَبْغُوا عَلَيْهِنَّ سَبِيلًا

অর্থ: যদি তারা তোমাদের অনুসরণ করে তাহলে তোমরা তাদের উপর কোন অন্যায় রাস্তা অবলম্বন করো না। (সূরা নীসা: ৪/৩৪)

২. তালাক দেওয়া যখন মুস্তহাব: 

স্ত্রী যদি ফরজ নামাজ আদায় না করে, অথবা সে নামাযই পড়ে না। স্ত্রী যদি ধর্মীয় যেকোন ফরজ বিধান পালনে অস্বীকৃতি জানায় বা শরীয়তের আমলে অভ্যস্ত না হয় তখন তাকে তালাক দেওয়া মুস্তহাব। (ফতোওয়ায়ে শামী: খন্ড নাম্বার:৪, পৃষ্ঠা নাম্বার:৪১৬)

অথবা স্ত্রী যদি স্বামীর জন্য যেকোন বিষয়ে প্রতিনিয়ত কষ্ট প্রদানকারীণী হয়। তখন তালাক দেওয়া মোস্তাহাব।(ফতোওয়ায়ে শামী: খন্ড নাম্বার:৪, পৃষ্ঠা নাম্বার:৪১৬)

৩. তালাক দেওয়া যখন ওয়জিব:

স্বামী যখন স্ত্রীর হক পুরন করার ক্ষেত্রে অপারগ হয় বা অক্ষম হয় তখন স্বামীর জন্য স্ত্রীকে তালাক দেওয়া ওয়াজিব। (ফতোওয়ায়ে শামী:৪ নং খন্ড: ৪১৭ পৃষ্ঠা)

৪. তালাক দেওয়া হারাম:

তালাক প্রদানের মোট তিনটি প্রকার রয়েছে, যার তৃতীয় প্রকারটি হলো তালাকে বিদআত, তালাকে বিদআতের তিনটি প্রকার রয়েছে, এর যেকোনো এক প্রকার তালাক দেওয়া হলো হারাম। (ফতোওয়ায়ে শামী: ৪ নং খন্ড, ৪১৭ পৃষ্ঠা)

তালাকের প্রকারভেদ ও তার হুকুম:

মূলগত দিক থেকে কিন্তু তালাক হলো তিন প্রকার। যেমনটি “ফতোয়ায়ে শামী” এর মধ্যে রয়েছে যে,

اٌقسامه ثلاثة

অর্থাৎ তালাক তিন প্রকার।

(১) احسن বা অতি উওম

(২) حسن বা উওম

(৩) بدعة বা বিদ‘আত

(১) احسن বা অতি উওম তালাক বলা হয় এমন তালাক প্রদান করাকে যে, স্ত্রী তার মাসিক (ঋতু) থেকে পবিত্র হওয়ার পর স্বামী ঐ পবিত্রতা অবস্থায় তার সাথে কোন ধরনের সহবাস না করে বরং ঐ পবিত্রতায় স্ত্রীকে এক তালাক দিবে; এরপর থেকে পরবর্তি তিন হায়েজ (ঋতু) পর্যন্ত অপেক্ষা করবে এবং এর মধ্যে স্ত্রীর সাথে সহবাস করবে না। এভাবে তিন হায়েজ শেষ হলে স্ত্রী তালাক হয়ে যাবে।

এ ধরনের তালাকের হুকুম হলো;

সময় শেষ হলে স্ত্রী তালাক হয়ে যাবে এবং নতুন বিবাহ ছাড়া তারা দু’জনে আর এক সাথে হতে পারবে না। আর এক্ষেত্রে দ্বিতীয় আরেকজনের কাছে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া এরপরে সে তালাক প্রদান করার পর প্রথম স্বামীর কাছে নতুন করে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া লাগবে না। বরং সরাসরি ই প্রথম স্বামী নতুন আকদ এর মাধ্যমে তার স্ত্রীকে বিবাহ করতে পারবে।

(২) حسن বা উত্তম তালাক বলা হয়

ঋতু থেকে পবিত্র হলে তার পরবর্তি প্রথম পবিত্রতায়- এক তালাক দেবে এবং এই পবিত্রতায় আর সহবাস করবে না, দ্বিতীয় পবিত্রতায়- আবার দ্বিতীয় তালাক দেবে এবং সহবাস করবে না এভাবে আবার তৃতীয় পবিত্রতায়- তৃতীয় তালাক প্রদান করবে এবং কোন সহবাস করবে না।

হাসান তালাকের ব্যখ্যায় বলা হয়,

والحسن أن يطلقها واحدة في طهر لم يجامعها فيه ثم في طهر آخر أخرى ثم في طهر آخر أخرى كذا في محيط السرخسي

তালাকে হাসান হলো, সহবাসমুক্ত তুহুরে (তুহুর হল, স্ত্রী মাসিক অবস্থা মুক্ত পবিত্রতম সময়)তালাক প্রদান করা। অতঃপর দ্বিতীয় সহবাসমুক্ত তুহুরে দ্বিতীয় তালাক দেয়া। অতঃপর তৃতীয় সহবাসমুক্ত তুহুরে তৃতীয় তালাক প্রদান করা। (ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া-১/৩৪৮)

এর হুকুম হলো যে, প্রথম ও দ্বিতীয় তালাকের পর রাজআত করা যায়। তথা ইদ্দতের ভিতর স্বামী তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিয়ে আসবে।এর জন্য কোনো আনুষ্টানিকতার প্রয়োজন নেই।

তালাকে হাসান এবং তালাকে আহসানের মধ্যে পার্থক্য-

(أَمَّا) الطَّلَاقُ السُّنِّيُّ فِي الْعَدَدِ وَالْوَقْتِ فَنَوْعَانِ حَسَنٌ وَأَحْسَنُ فَالْأَحْسَنُ أَنْ يُطَلِّقَ امْرَأَتَهُ وَاحِدَةً رَجْعِيَّةً فِي طُهْرٍ لَمْ يُجَامِعْهَا فِيهِ ثُمَّ يَتْرُكُهَا حَتَّى تَنْقَضِيَ عِدَّتُهَا أَوْ كَانَتْ حَامِلًا قَدْ اسْتَبَانَ حَمْلُهَا وَالْحَسَنُ أَنْ يُطَلِّقَهَا وَاحِدَةً فِي طُهْرٍ لَمْ يُجَامِعْهَا فِيهِ ثُمَّ فِي طُهْرٍ آخَرَ أُخْرَى ثُمَّ فِي طُهْرٍ آخَرَ أُخْرَى كَذَا فِي مُحِيطِ السَّرَخْسِيِّ

«الفتاوى الهندية (১/৩৪৮)

১- তালাকে আহসান হল, সহবাস মুক্ত তুহুরে (তুহুর হল, স্ত্রী মাসিক অবস্থা মুক্ত পবিত্রতম সময়) তালাক প্রদান করা। অতঃপর আর কোন তালাক প্রদান না করা। যে পর্যন্ত না ঐ স্ত্রীর ইদ্দত খতম হয়ে যায়, এবং গর্ভবর্তী থাকলে তার গর্ভ ভুমিষ্ট হয়ে যায়।

২- আর তালাকে হাসান হলো, সহবাসমুক্ত তুহুরে (তুহুর হল, স্ত্রী মাসিক অবস্থামুক্ত পবিত্রতম সময়) তালাক প্রদান করা।অতঃপর দ্বিতীয় সহবাসমুক্ত তুহুরে দ্বিতীয় তালাক দেয়া।অতঃপর তৃতীয় সহবাসমুক্ত তুহুরে তৃতীয় তালাক প্রদান করা।(ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া-১/৩৪৮)

(৩) بدعة বা বিদআত তালাক বলা হয়-

নিম্নে বর্ণিত তিন সূরতের যে কোনো একভাবে তালাক দিলে তাকে বিদআত তালাক বলা হবে।

১- এক বৈঠকে বা একেবারে তিন তালাক দেওয়া।

২- হায়েজ তথা মাসিক অবস্থায় তালাক দেওয়া।

৩- স্ত্রীর যে পবিত্রতায় সহবাস হয়েছে ঐ পবিত্রতার মধ্যে তালাক দেওয়া।

এই ৩ ধরনের তালাকের হুকুম হলো;

এরকম তালাক দিলে তালাক পতিত হয়ে যায় ঠিক। তবে এমন পদ্ধতিতে তালাক দেওয়া হারাম ও গুনাহের কাজ। পাশাপাশি আরেকটি কথা হলো যে, এক সাথে তিন তালাক দিলে তার দ্বারা “তালাকে মুগাল্লাযা” হয়ে যায়, বিধায় এমন পরিস্থিতিতে দ্বিতীয় আরেকজনের সাথে স্ত্রীর নতুন করে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে হবে পরে ঐ ব্যক্তি তালাক দিলে তালাকের পর ইদ্দত পালনের পর পূর্বের স্বামী নতুন করে বিয়ে করতে পারবে। দ্বিতীয় আরেকজনের সাথে স্ত্রীর নতুন করে বিবাহ না হলে সরাসরি প্রথম স্বামী নতুন করে আকদ করে স্ত্রীকে বিবাহ করতে পারবে না।

হুকুমের দিক দিয়ে তালাক তিন প্রকার:

১। তালাকে রাজঈ-

তালাকে রাজঈ হলো এমন তালাক; যা প্রদান করলে স্ত্রীর উপর স্বামীর অধিকার অবশিষ্ট থেকে যায়। স্বামী ইচ্ছা করলে স্ত্রীকে সাথে সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া ব্যতীত পূনরায় নিজের বন্ধনে ফিরিয়ে আনতে পারে। অর্থাৎ উক্ত স্ত্রীর সাথে নিরিবিলি অবস্থান করা কিংবা নিরিবিলি অবস্থানের দিকে আকর্ষনকারী কার্যকলাপে লিপ্ত হওয়া, অথবা খাহেশাতের সাথে স্পর্শ করা, চুমু দেওয়া কিংবা আমি তোমাকে ফিরিয়ে নিলাম বললেও রাজায়াত বা ফিরিয়ে আসা হবে।

রাজআতের পদ্ধতি সম্পর্কে ফতোওয়ায়ে হিন্দিয়ায় উল্লেখ করা হয়,

الرجعة إبقاء النكاح على ما كان ما دامت في العدة كذا في التبيين وهي على ضربين: سني وبدعي (فالسني) أن يراجعها بالقول ويشهد على رجعتها شاهدين ويعلمها بذلك فإذا راجعها بالقول نحو أن يقول لها: راجعتك أو راجعت امرأتي ولم يشهد على ذلك أو أشهد ولم يعلمها بذلك فهو بدعي مخالف للسنة والرجعة صحيحة وإن راجعها بالفعل مثل أن يطأها أو يقبلها بشهوة أو ينظر إلى فرجها بشهوة فإنه يصير مراجعا عندنا إلا أنه يكره له ذلك ويستحب أن يراجعها بعد ذلك بالإشهاد كذا في الجوهرة النيرة.

রাজআত হল,ইদ্দতের ভিতরে বিয়েকে টিকিয়ে রাখা, স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিয়ে আসা। রাজআত দুই প্রকার:

১- সুন্নাহ সম্মত- এর ব্যখ্যা হলো যে, কথার মাধ্যমে রাজআত করা হবে। এবং রাজআত করার সময় দু’জন সাক্ষীকে উপস্থিত রাখা হবে। এবং তাদেরকে রাজআতের বিষয় সম্পর্কে অবগত করা হবে। যখন কথার মাধ্যমে রাজআত করা হবে, তখন স্বামী বলবে যে, আমি তোমাকে ফিরিয়ে নিলাম, বা বলবে যে, আমি আমার স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিলাম।

২- যদি দু’জন সাক্ষীর অনুপস্থিতিতে রাজআত করে বা সাক্ষী উপস্থিত কিন্ত তাদেরকে অবগত না করে কেউ রাজআত করে নেয়, তাহলে এটা রাজাত হবে। তবে এমন করা বিদআত হবে।

উল্লেখ্য যে, সরীহ বা সুস্পষ্ট তালাক (তালাক শব্দ উচ্চারণের মাধ্যমে) এভাবে বলা যে,

১- “তুমি তালাক” কিংবা

২- “আমি তোমাকে তালাক দিলাম।” এমন প্রকারের শব্দ দ্বারা তালাক দিলে তালাকে রাজঈ পতিত হয়।

২ তালাকে বায়িন

তালাকে বায়িন হলো এমন তালাক; যা প্রদান করলে স্ত্রীর উপর স্বামীর অধিকার থাকে না। বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। তবে স্বামী-স্ত্রী উভয়ের সম্মতিক্রমে (হিলা ব্যতীত, অর্থাৎ নতুন করে আরেকজনের সাথে স্ত্রীর নতুন করে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হবার পরে তালাক দিলে ইদ্দতের পর) নতুনভাবে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে।

উল্লেখ্য যে, তালাকের সাথে যদি কোন প্রকার কঠোরতার গুণ যুক্ত করা হয় তাহলে তালাকে বায়িন হয়। যেমন- কেউ বললো,

১. তোমার প্রতি তালাকে বায়িন,

২- তোমাকে অকাট্য তালাক। তাহলে এমতাবস্থায় স্বামী তিন তালাকের নিয়ত করলে তিন তালাকই পতিত হবে। আর যদি তিন তালিকের নিয়ত না করে তাহলে এক তালাকে বায়িন হবে।

৩. তালাকে মোগাল্লাযা

তালাকে মোগাল্লাযা হলো এমন তালাক, যার কারণে স্বামী-স্ত্রী উভয়ের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। এ স্ত্রী অপর কোন ব্যক্তির সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া, অতঃপর ঐ স্বামী তার সাথে সহবাস করার পর তালাক দিলে অথবা দ্বিতীয় স্বামী মৃত্যুবরণ করলে পুনরায় উক্ত স্ত্রী প্রথম স্বামীর সাথে উভয়ের সম্মতিক্রমে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে।