শবে বরাতের প্রামাণ্যতা: আমাদের করণীয় ও বর্জনীয়

একুশে জার্নাল

একুশে জার্নাল

এপ্রিল ১৮ ২০১৯, ১১:৪৯

মুফতী সাঈদ আহমদ পালনপুরী: 

পনেরোই শাবান সম্পর্কে চারটি বিষয় সঠিক এবং আমল যোগ্য-
১/ এই রাতে আল্লাহ তা’আলা যে পরিমাণে তৌফিক দান করেন, সে পরিমাণে ঘরে বসে একাকি ইবাদত করা।
কিন্তু, আমরা এই রজনিটিকে হৈ-হোল্লোরের রাত বানিয়ে ফেলেছি। মসজিদগুলোতে ও করবস্থানসমূহে ভীড় করি, রকমারি খাবারের আয়োজন করি, হাঁক-ডাক করি, এসব অবাঞ্ছনীয় এবং বর্জনীয় ৷ এসবের কোনো প্রামাণ্যতা নেই, বাস্তবতার সাথে কোনো প্রকার সম্পর্ক নেই।

এ রাতে নফল নামাজ আদায় করা চাই, তবে পূর্ণ রাত জেগে নাফল পড়তে হবে এটি জরুরি নয়। আল্লাহ তা’আলা যতটুকু পড়ার তৌফিক দান করেন, ততটুকুই একাকি ঘরে আদায় করা, দল বেঁধে মসজিদসমূহে সমবেত না হওয়া। কেননা, এটি ব্যক্তিগত আমল, যৌথ বা সমবেত হয়ে আদায়ের কোনো আমল নয়।

২/ পরদিন রোজা রাখা, এটি একটি মুস্তাহাব আমল।

৩/ এই রাতে নিজের জন্য, আপন আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে যারা ইন্তেকাল করেছেন তাদের জন্য এবং সমস্ত উম্মতে মুসলিমার জন্যে মাগফিরাতের দোয়া করা। আর এ জন্য করবস্থানে যাওয়া অবশ্যক নয়।

এ রাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম করবস্থানে গিয়েছেন, কবরবাসীদের জন্যে দোয়া করেছেন, এটি সত্য। তবে প্রকাশ্যে নয় বরং গোপনে গিয়েছেন, আর ঘটনাক্রমে এটি হযরত আয়েশা সিদ্দিকা রাজিয়াল্লাহু আনহা জেনে যান।

কিন্তু, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ রাতে করবস্থানে যাওয়ার জন্যে কোনো প্রকার হুকুম দেননি। সেজন্য আমাদের সমাজে যেই তামাশা হয়, কবরস্থান সমূহে উপস্থিত হয়ে দোয়ার হিড়িক জমে, তা সম্পূর্ণরূপে ভুল ও কুসংস্কার প্রথা।

৪/ যে দুজন মুসলমান ভাইয়ের মধ্যে লড়াই-ঝগড়া ও ভেদাভেদ বিদ্যমান, তারা এ রাতে পরস্পরকে ক্ষমা করে সন্ধি করে নিবে। যতক্ষণ পর্যন্ত পরস্পরকে ক্ষমা করে সন্ধিবদ্ধ না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষমা পাবে না।

পনেরোই শাবানের রাতে এই চারটি আমলই যায়িফ হাদীসের দ্বারা প্রমাণিত। আর যতক্ষণ পর্যন্ত সহিহ হাদিস বিদ‍্যমান থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত যায়িফ হাদীসের উপর আমল করা যাবে না ৷ কেননা, সহিহ হাদিসের বিপরীতে যায়িফ হাদিসের উপর আমল গৃহীত নয়।

তবে যদি কোনো বিধানের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র যায়িফ হাদিসই পাওয়া যায়, সহিহ কোনো হাদিস না থাকে। তখন যায়িফ হাদীসের উপরই আমল করা হবে।

এমন বিধান একটিই নয়, বরং আরও অনেক বিধান আছে, যেগুলোর ক্ষেত্রে শুধু যায়িফ হাদীসই পাওয়া যায়। তাই যায়িফ হাদীসের মাধ্যমেই সেগুলোর আমল গৃহীত হয়েছে। যেমন, সালাতুত তাসবীহ্ সম্পর্কিত এগারোটি বর্ণনা, এগুলো সব যায়িফ হাদিস। তা সত্ত্বেও পূর্ববর্তী সলফে সালেহীনদের থেকে সালাতুত্ তাসবীহ্ এর আমল প্রচলিত।

তবে হ্যাঁ, যায়িফ হাদিস দ্বারা ওয়াজিব, সুন্নাত এর সমপর্যায়ের আমল প্রমাণিত হবে না। সুতরাং যে হুকুম সালাতুত্ তাসবীহ’র ক্ষেত্রে (এটি পড়া মুস্তাহাব) ঠিক একই হুকুম শাবানের পনেরো তারিখ রাতের ক্ষেত্রেও।

অর্থাৎ এ রাতে একাকি ইবাদত করা মুস্তাহাব। কেননা, এব্যপারে যে সমস্ত বর্ণনা পাওয়া যায়, সবগুলো যায়িফ বা দুর্বল। তাই এগুলোর দ্বারা মুস্তাহাব আমলই প্রমাণিত হতে পারে। সুতরাং হাদিসসমূহে বর্ণিত, উপরে উল্লেখিত চারটি আমলই মুস্তাহাব বলে গণ্য করা হবে।

শবে বরাত মানা, এ সম্পর্কিত আমল গুলো করা, এবং এর প্রামাণিকতাকে একেবারেই অস্বীকার করা, আর এগুলোকে ভিত্তিহীন মনে করা কোনো ভাবেই ঠিক নয়।

অনুবাদ: আশরাফ আলম কাসেমী নদভী
তথ্যসূত্র: ইলমী খুতুবাত, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ২৪৭।