রানুর ঈদ -বনশ্রী বড়ুয়া

একুশে জার্নাল

একুশে জার্নাল

জুন ০৯ ২০১৯, ০৫:২৯

আজ পাঁচদিন হল মেয়েটার জ্বর,কোনভাবেই জ্বর কমছে না।তাপমাত্রা কত সেটা পরিমাপের সুযোগ নেই।থার্মোমিটার কি বস্তু সেটা রানু জানে না।জ্বর গায়ে নিয়ে মেয়েটা একা একা পড়ে থাকে বস্তির এইঘরে। রানু সকাল হলেই কাজে ছোটে।কাজ বলতে আসলে কিছু না। অনেক বলে কয়ে একটা বাসা বাড়ীর বাসন মাজা আর কাপড় কাঁচার কাজ পেয়েছে।মাস শেষে আটশো টাকা দেবে বলেছে।রোজার মাস বলেই হয়ত দয়া করে কাজে রেখেছে ওরা।ঈদের পর কি হয় আল্লাহ জানেন।

আগে কখনো রানু বাসা বাড়ীতে কাজ করেনি।মিজান রিক্সা চালিয়ে দু’বেলা হয়ত খেতে দিতে পারত না কিন্তু রানু কারো বাড়িতে গিয়ে কাজ করবে সেটা হতে দেয়নি কোনদিন।সারাদিন রিক্সার প্যাডেল ঘুরিয়ে যখন রাতে বাড়ি ফিরত মিজান তখন রানুর দিকে হাসি হাসি মুখ করে বলত,বউ তোমাগো দেখলেই আমার সব ক্লান্তি দুর হইয়া যায়।আমার ম্যায় কই,,,ম্যায়,,, ও ম্যায়,,,
মেয়েটাও দৌড়ে এসে বাবাকে জড়িয়ে ধরত।সেকি গলাগলি,জড়াজড়ি বাপবেটির।

রোজ কিছু না নিয়ে আসত মিজান মেয়ের জন্য। দু’টাকার আচার,লজেন্স,,, বিস্কুট। যা কিছু হোক।মেয়েকে আদর করতে করতেই বলত,রানু আমার ম্যায় তো বড় হইয়া যাইতাছে।বিয়া দেওন লাগবু।শুনেই বাপবেটির মারামারি শুরু হয়ে যেত।সারাঘর একজন আরেকজনের পিছনে দৌড়াত।মিজান ভুলে যেত প্যাডেল ঘুরাতে গিয়ে পায়ের তীব্র ব্যাথার কথা।ব্যাথাকে ছাপিয়ে পিতৃত্ব সারা ঘরময় ভালবাসা ছড়াত।
রানু রেগে গিয়ে বলত,যান,আর ম্যাইয়ারে লইয়া ডঙ করা লাগবো না,,,গোসল কইরা আসেন ভাত খামু।

সেদিন ভাত খেতে গিয়ে মিজান দেখল, মেয়েটা কিচ্ছুটি খাচ্ছে না।মেয়েটা রাগ করলেই মিজান ওকে আদর করে কোলে তুলে নেয়।
আজ কোলে নিতে যাবে তখন মেয়েটা বলল,আব্বা আগে কও এবার ঈদে আমারে কি দিবা?
মিজান বলল, কও ম্যায়,কি লাগবু আমার ম্যায় এর?
আমার ম্যায়র লাইগ্যা গোটা দোহান লইয়া আমু।
সেকি খুশি মেয়েটার।বলল,আব্বা, আমার শুধু একখান লাল জামা চাই….টকটকে লাল জামা আব্বা…

রোজা আইতে আর একদিন বাকি।পরিশ্রম আর একটু বাড়ানো লাগবে..মিজান মনে মনে ঠিক করে ফেলে,এবার সে মেয়েকে লাল জামা দিবই…

সবে পেঁয়াজ ভাজা আর শুকনো লংকা দিয়ে সেহরির ভাতটা শেষ করেছে মিজান। বাইরে তখন গাড়ির শব্দ। সবাই চিৎকার করে বলছে পুলিশ এসে, পুলিশ এসেছে। মিজান তাড়াহুড়ো করে বেরোলো কি হয়েছে দেখার জন্য। বাইরে তখন চারজন পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে। আজ মিজানের আর রিক্সা শ্রমিকদের সাথে মহাজনের ঝগড়া হয়েছে কিছুটা। মারামারিও হয়েছে। অবশ্য সেটা সমাধান হয়ে গিয়েছিল।কিন্তু মহাজন’ যে পুলিশ পাঠাবে সেটা বুঝতে পারেনি মিজান।

ভোররাতেই পুলিশ ধরে নিয়ে যায় মিজানকে।রানুর তখনও খাওয়া হয়নি।দৌড়ে এসে পুলিশকে অনেক অনুনয় করে মিজানকে ছেড়ে দেয়ার জন্য। মেয়েটাও কান্নাকাটি করে কিন্তু পুলিশ মিজানকে নিয়ে উঠে যায় পুলিশ ভ্যানে।

সকালে রানু মহাজনের কাছে যায়। ক্ষমা চাই পা ধরে।কোন কাজ হয়না, উলটো আজেবাজে কিছু কথা শুনতে হয়। উপায় না দেখে পুলিশ স্টেশনে যায় আবার। অনেক দৌড়াদৌড়ি করে। এর ওর সাথে কথা বলে। কিন্তু কি এক অদ্ভুত কারণে মিজানের সাথে দেখা হয়ে ওঠে না রানুর।

দুদিন পরে আবার থানায় যায় রানু।শোনে মিজানকে চালান করে দিয়েছে কোর্টে।এই কোর্ট কি রানু জানে না। থানা, কোর্ট কোন কিছু সম্পর্কে ধারণা নেই রানুর।কি করবে ভেবে পায় না।এদিকে ঘরে কোন টাকা পয়সা নেই। পেটে খাবার নেই দু’দিন।মেয়েটার দিকে তাকানো যাচ্ছে না।তাই নিজেই সিদ্ধান্ত নেয় অন্যের বাড়িতে কাজ করবে।
বস্তির সখিনা খালার হাত ধরেই রানু এ বাড়িতে কাজে আসে। কাপড়চোপড় ধোয়,থালাবাসন মাঝে।সন্ধ্যা হলেই বাসি ভাত, তরকারি নিয়ে ঘরে ফিরে আসে।
মা মেয়েতে খায়।মিজান থাকলে রানুর এত কষ্ট করতে হত না।মানুষটা রানুকে ভীষণ ভালবাসত।

রানু কিছু টাকা জমাতে পারলেই মিজানকে ছাড়িয়ে আনবে। এদিকে মেয়েটার জ্বর।কোন মতেই কমছে না। ক’দিন পরেই ঈদ।খালাম্মা বলেছে ঈদের আগেই টাকাটা দিয়ে দেবে। এই মহিলাটাকে রানুর খুব ভাল মনে হয়।সেদিন মিজানের ঘটনা শোনার পর কাকে কাকে জানি ফোনে কি সব বলছিল।মিজানের ছাড়ানোর ব্যাপারে কথাও বলেছে খালাম্মা।কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছিল না।পরে রানুই আশা ছেড়ে দেয়।

রানু অবশ্য টাকার চিন্তায় আছে।টাকা পেলেই মেয়েটার জন্য একখান লাল ফ্রক কিনবে রানু।জ্বরের মধ্যে মেয়েটা সারাদিন আব্বা আব্বা করছে আর বলছে, আব্বা কখন লাল ফ্রক আনবে?

মেয়েটার মুখের দিকে তাকানো যায়না সারাক্ষণ আব্বা আব্বা করতে থাকে। অন্যের বাড়িতে কাজ করে বলে রানু মিজানের ছাড়ানোর জন্য এদিক ওদিক দৌড়াতে পারে না। একজনকে বলে রেখেছে মিজানের কোন খোঁজ পেলে, কোন থানায় আছে বা কোন জেলে আছে জানতে পারলে রানু গিয়ে দেখা করে আসবে।

মানুষটার জন্য খুব কষ্ট হয় রানুর।বুকের মধ্যে হু হু করে উঠে।মিজান থাকলে অন্যের বাড়িতে কাজ করে খেতে হতো না। মেয়েটার জ্বর হয়েছে শুনলে ডাক্তারের কাছ নিয়ে যেতো, ওষুধ নিয়ে আসতো।মানুষটা মেয়ের জন্যে পাগল ছিল।একদিন মেয়ের মুখ না দেখে থাকতে পারত না।আর আজ একমাস হতে চলল,মিজান কোথায় আছে,কেমন আছে রানু জানে না।

মেয়েটাকে একা রেখে যেতে খুব কষ্ট হয় রানু কিন্তু কি করবে? কাজ না করলে এই মেয়েটার মুখে খাবার দিতে পারবে না।আর লাল ফ্রক?ঈদের দিন লাল ফ্রক না পেলে মেয়েটা তো কেঁদেই ঘর ভাসিয়ে দেবে।মিজানকেও ছাড়াতে হবে।রানু ভেবে পায় না আল্লাহ কেন তাকে এমন শাস্তি দিল?

কাল ঈদ। খালাম্মা বলেছে তাড়াতাড়ি যেতে।অনেক কাজ আজকে।আরো বলছে মেয়েটাকে সঙ্গে নিয়ে যেতে।মেয়েটার জ্বর কিছুটা কমেছে।কিন্তু পুরোটা সুস্থ নয়।তারপরও নিয়েই যাবে রানু।ওবাড়িতে গেলে ভালমন্দ খেতে তো পারবে।কতদিন মেয়েটা ভালমন্দ খায় না।অবশ্য মেয়েটা সঙ্গে থাকলে আসার সময় ওর মাপের লাল ফ্রকটাও কিনে নিতে পারবে।আজ টাকা দেবে বলেছে খালাম্মা।রানুর একটু খুশি খুশি লাগছে।আবার মিজানের জন্যে মন খারাপও লাগছে।মিজান থাকলে রানু ঈদের দিন কিশমিশ দিয়ে সেমাই রান্না করতো।মানুষটা সেমাই এত ভালবাসে।বারবার রান্না ঘরে উঁকিঝুঁকি মারত আর বলত,বউ তাড়াতাড়ি দেও….

রানু কাজের জন্যে বের হয় মেয়েকে সঙে নিয়ে।ওবাড়িতে গিয়েই দেখে সবাই রেডি হয়ে আছে।ওরা বাড়িতে যাচ্ছে ঈদ করতে।রানু ভেবে পাচ্ছে না গ্রামের বাড়িই যদি যাবে তাহলে রানুকে আসতে বলল কেন?
রানুকে দেখেই খালাম্মা রেগে গিয়ে বলল,এই তোমার আসার সময় হল?এত দেরী করলে কেন?

যাও, যাও,তাড়াতাড়ি রেডি হও।তুমিও চল আমাদের সাথে।একসাথে ঈদ করবো।রানুর হঠাৎ মন কেমন করে উঠে।মিজানকে এই শহরে রেখে ও কোথাও যাবে না।আর মেয়েটার জন্যে লাল টকটকে ফ্রকটাও কেনা হয়নি….খালাম্মা এসব কি বলছে রানুর মাথায় ডুকছে না।ও ভাবছে মিজানের কথা।যদি মিজান ফিরে আসে? এসে যদি মেয়েকে আর রানুকে না পায়?

না, না, রানু কিছুতেই যাবে না।খালাম্মাকে বলতেই হবে ওর পক্ষে এই শহরে মিজানকে একা একা রেখে যাওয়া সম্ভব নয়।খালাম্মাকে ডাকতে যাবে এমন সময় মেয়ের চিৎকারে পেছন ফিরে তাকায় রানু।নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না।কি দেখছে ও?

মেয়েটা মিজানকে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে।মিজান মিটমিট করে হাসছে।পাশে খালাম্মা আর তার পুরো পরিবার দাঁড়িয়ে। কি করে সম্ভব এটা?রানুর চোখ গড়িয়ে জল পড়ছে।রানু কি করবে ভেবে না পেয়ে দৌড়ে খালাম্মার পায়ের কাছে এসে দাঁড়ায়।খালাম্মাকে জান্নাতের পরীর মতন মনে হচ্ছে রানুর।
রানুকে ঈদে চমকে দেবে বলেই খালাম্মা এই পরিকল্পনা করেছে।এমন ঈদ রানুর জীবনে কোনদিন আসেনি।

খালাম্মার বকুনিতে রানুর কান্না থামে।মেয়ের হাতে লাল ফ্রকের প্যাকেটটা খালাম্মায় এনে দেয়।মেয়েটার খুশি যেন দ্বিগুণ হয়ে যায়।পৃথিবীতে এখনও এমন মানুষ আছে বলেই রানুরা ফিরে পায় ঈদ,ফিরে পায় ভালবাসা…

ততক্ষণে গাড়ি চলতে থাকে গ্রামের পথে।শহরের কোলাহল ছাড়িয়ে মেঠোপথের ঠিকানায়।মিজানের কাঁধে মাথা রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে রানু।বুকে চেপে ধরে আছে ছোট্ট মেয়েটাকে।নতুন করে বাঁচার আশায়…

সামনের সীটে বসে তখন পরম সুখে ভাসছেন এক আধবয়সী মহিলা।ঈদের আনন্দ হাজার গুন বেড়ে গেছে,,,রানুকে সুখ ফিরিয়ে দিতে পেরে ভীষণ শান্তি পাচ্ছেন এই ভদ্র মহিলা।এখনো এই সমাজে কিছু মানুষ অন্যের হাসিতেই নিজের সুখ খুঁজে পান,,,,