বুকের দুধ সংরক্ষণে হিউম্যান মিল্ক ব্যাংকের যাত্রা শুরু: ধর্মপ্রাণদের চাপা ক্ষোভ

একুশে জার্নাল

একুশে জার্নাল

ডিসেম্বর ২১ ২০১৯, ০৯:৪৬

ইলিয়াস সারোয়ার: যে মায়েদের সন্তান জন্মের পর মারা গেছে বা নিজের সন্তানকে খাওয়ানোর পরও মায়ের বুকে অতিরিক্ত দুধ আছে, সেই মায়েরা হিউম্যান মিল্ক ব্যাংকে দুধ সংরক্ষণ করে রাখতে পারবেন। অন্যদিকে যে নবজাতকের জন্মের পরই মা মারা গেছেন বা যাদের মা অসুস্থতার জন্য দুধ খাওয়াতে পারছেন না, সেই নবজাতকেরা এ দুধ খেতে পারবে। এছাড়া দত্তক নেওয়া সন্তানের অভিভাবকেরা এখান থেকে দুধ নিয়ে খাওয়াতে পারবেন। বিভিন্ন সময় স্বজনেরা নবজাতককে ফেলে দেন, এ স্বজন-পরিত্যক্ত নবজাতকদের বাঁচাতেও মিল্ক ব্যাংক কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। মায়েদের কাছ থেকে দুধ সংগ্রহ ও বিতরণে কোনো ধরনের আর্থিক সুবিধা নেওয়া হবে না বলে জানায় কর্তৃপক্ষ।

তবে এর অন্য একটি দিক‌ও রয়েছে। ইসলাম ধর্ম মতে, দুধ ভাই ও দুধ বোনের মধ্যে বিয়ে হারাম। দুধ পানের কারণে আরও বেশ কিছু সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিবাহ হারাম হয়ে যায়। হিউম্যান মিল্ক ব্যাংক থেকে যারা দুধ গ্রহণ করবেন তারা জানবেন না এ দুধ কার। এটি না জানার ফলে অজান্তেই হারাম বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপিত হতে থাকবে। এই দিক বিবেচনা করে ধর্মপ্রাণ মানুষ বিক্ষোভ প্রদর্শন করছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে পোস্ট করে ও কমেন্টে তারা এর প্রতিবাদ জানাচ্ছেন।

অন্যদিকে ইনস্টিটিউটের এনআইসিইউ এবং স্ক্যানোর ইনচার্জ এবং মিল্ক ব্যাংকের সমন্বয়ক মজিবুর রহমান জানালেন, সবচেয়ে বেশি (২১৬টি) হিউম্যান মিল্ক ব্যাংক রয়েছে ব্রাজিলে, যার মাধ্যমে ২৮ শতাংশ নবজাতকের মৃত্যু রোধ এবং ৭৩ শতাংশ শিশুর অপুষ্টি রোধ করা সম্ভব হয়েছে। এমনকি ভারতেও ব্যাংক স্থাপনের পর নবজাতকের মৃত্যু রোধ করা সম্ভব হয়েছে।

আইসিএমএইচ স্বায়ত্তশাসিত একটি প্রতিষ্ঠান। এর যাত্রা শুরু ১৯৯৮ সালে। সরকার, বিভিন্ন দেশি–বিদেশি প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা বা ব্যক্তির অনুদান এবং ইনস্টিটিউটের নিজস্ব অর্থ মিলিয়ে এটি পরিচালিত হচ্ছে। ইনস্টিটিউটটির দেওয়া তথ্য বলছে, গত বছর স্ক্যানো এবং এনআইসিইউতে ১ হাজার ৮৬৫ জন নবজাতক ভর্তি হয়। এর মধ্যে ৪৮৮ জনই ছিল গুরুতর অসুস্থ।

মায়ের বুকের দুধ সংরক্ষণে দেশে প্রথমবারের মতো যাত্রা শুরু করেছে ‘হিউম্যান মিল্ক ব্যাংক’। ব্যাংকটি ১ ডিসেম্বর চালু হলেও আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের অপেক্ষায় আছে। হিউম্যান মিল্ক ব্যাংকের উদ্যোগটি ঢাকা জেলার মাতুয়াইলের শিশু-মাতৃস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের (আইসিএমএইচ) নবজাতক পরিচর্যা কেন্দ্র (স্ক্যানো) এবং নবজাতক আইসিইউ (এনআইসিইউ)-এর নিজস্ব উদ্যোগ। বেসরকারি আর্থিক সহায়তায় ব্যাংকটি স্থাপন করা হয়েছে।

অন্যদিকে রাকিব হাসান নামে একজন এ বিষয়ে তাঁর মন্তব্যে বলেন, এক্ষেত্রে আমার মনে হচ্ছে ভালো উদ্দ্যোগ। তবে কমেন্টগুলো দেখে বুঝতে পারলাম ইসলামে মনে হয় এটা বৈধ নয়। তাহলে দাতা এবং গ্রহীতার সম্পূর্ণ তথ্য রাখা উচিত, যেন দাতার পরিবারের সাথে আত্মীয়র সম্পর্কে হতে বিরত থাকতে পারে।

বিশিষ্ট লেখক আরজু আহমদ জানান, জ্ঞাত তথ্যানুসারে মুসলিম বিশ্বের কোথাও এ ধরনের কোনও মিল্কব্যাংক নেই। ওআইসি এর ইসলামি ধর্মীয় বিধান বিষয়ক বোর্ড ‘মাজমাউল ফিকহিল ইসলামী’ (International Islamic jurist of OIC) মিল্কব্যাংককে হারাম ঘোষণা করেছে।

ইসলামি শরীয়াতের অন্যতম ভিত্তি হচ্ছে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা। মিল্কব্যাংক এই পদ্ধতিকে ধ্বংস করবে। বহু অজানা দুধ ভাই বোন হবে। যাদের মধ্যে বিয়ে হারাম। অথচ অজ্ঞাতেই বহু হারাম বিবাহ হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।

ফলত তাঁরা ঐক্যমতের ভিত্তিতে মিল্কব্যাংককে হারাম বলেছেন-
১। মিল্কব্যাংকে দুধ দান করা।
২। মিল্কব্যাংক থেকে দুধ পান করানো।
৩। মিল্কব্যাংক স্থাপন।

এই সবকটিই হারাম। আল্লাহ কোরআনে স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘তোমাদের জন্য নিষিদ্ধ (বিয়ের জন্য)… তোমাদের দুধ মাতা, দুধ বোন।’- সূরা নিসা ২৩

আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘রক্তের সম্পর্কের ভিত্তিতে যেসব স্বজনেরা (বিয়ের জন্য) হারাম তদ্রূপ দুধপানের সম্পর্কের ভিত্তিতেও তারা হারাম।’ (বুখারী, মুসলিম)

এর উপরই উম্মতের ইজমা। সুতরাং মিল্কব্যাংক গড়ে তোলার মত অনৈসলামিক, ঈমান বিধ্বংসী কোনও প্রজেক্ট মেনে নেওয়া যায় না৷