বাল্য বন্ধু | লিজা জাহান

একুশে জার্নাল

একুশে জার্নাল

জানুয়ারি ১৭ ২০১৯, ১৮:১১

আমার সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে আনিস। যেন সে একটা মস্ত বড় অপরাধী আর আমি পুলিশ। অবশ্য, আমি তাকে পুলিশের মতই একের পর এক প্রশ্ন করেই চলেছি। আর সে মাথা নিচু করে অপরাধীর মত দাঁড়িয়ে আছে।

আজ প্রায় পনের বছর পর আনিসের সাথে দেখা। তবুও চিনতে এতটুকুও কষ্ট হয়নি। কিন্তু আনিস কে রাজমিস্ত্রি রুপে দেখে বেশ চমকে উঠেছি। ওর মত একজন প্রতিভাবান স্টুডেন্ট রাজমিস্ত্রিদের সাথে শ্রমিকের কাজ করছে ভাবতেই পারছি না।
– এই তুমি আনিস না? আমায় চিনতে পারছো।
– হঠাৎ করে একটা মেয়েকে দেখে আনিস যেন চমকে উঠলো। কিছুক্ষন তাকানোর পর মাথা নিচু করে জবাব দিল, আপনি তো লিজা! হুম চিনেছি।
– এই আমায় আপনি করে বলছো কেন। আমি তো তোমার বন্ধু। আর তুমি এসব কাজ করছ কেন। কোথায় পড়ো তুমি?
– না মানে আমি তো পড়িনা। সিক্সে ভর্তি হয়েছিলাম কিন্তু বাবা মারা যাওয়ার পর পড়ালেখা বন্ধ করে দেই। সংসার চালাতে হয় তাই এই কাজ করি। আর আপনি পড়াশুনা জানা শিক্ষিত মেয়ে আপনাকে কি তুমি বলা যায়, কথাগুলো মাথা নিচু করে বলল আনিস।
– কি বলো এসব আমি তো কিছুই জানিনা কত খুঁজেছি তোমায়।

আনিস আমার বাল্যবন্ধু। ক্লাস ওয়ান থেকে ফাইভ পর্যন্ত এক সাথেই পড়েছি আমরা। আমাদের গ্রাম থেকে ওই স্কুলে আমি একাই যেতাম। তাই একা একা স্কুলে যেতে হত এবং স্কুলেও খুব একা একা লাগত। ক্লাস টু,তে পড়াকালে আনিসের সাথে আমার বন্ধুত্ব হয়। ক্লাস টুতেই আনিসের হাতের লেখা অসম্ভব সুন্দর ছিলো। সে নাকি তার নানুর কাছে লেখা শিখেছে পরবর্তীতে সেই আমায় লেখা শিখিয়েছে।
দুজনের মাঝে অদ্ভুত মিল ছিলো আমাদের। আমার গান,নাচ, খেলাধুলা সব কিছুতেই তার সাপোট অনেক বেশি ছিলো। সেবার গান গেয়ে যখন পুরস্কার পেলাম তার কি আনন্দ মনে হচ্ছিলো পুরস্কার সেই পেয়েছে। এত টুকুও হিংসা ছিলোনা তার মনে।

তারপর আমি অন্য স্কুলে ভর্তি হয়ে নানু বাড়িতে চলে যাই। অনেক খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম এতদিন কিন্তু খোঁজ পাইনি ভেবেছিলাম সে হয় তো কোন শহুরে স্কুলে পড়ছে। তবে বিশ্বাস ছিলো একদিন না একদিন ঠিক খুঁজে পাব আমার বন্ধুকে কিন্তু আমার সেই বাল্যবন্ধুকে এভাবে দেখব কল্পনা করতে পারিনি।

– আমি তার সাথে সেই ভাবে কথা বললেও আনিস বলছেনা। কেমন যেন লজ্জা আর নার্ভাস হয়ে আছে সে আমার দিকে ঠিক ভাবে তাকাতেও যেন পারছেনা অথচ আমি তার মাঝে সেই ছোটবেলাকার আনিস কে খুঁজতেছিলাম।
– আনিস। তোমার বাসায় কে কে আছে?
-হুম! মা আর ছোট একটা ভাই। বোনটাকে বিয়ে দিয়েছি। বেশ ধরা গলায় বলল সে।
বুঝলাম এতদিন পর আমায় দেখে পড়ালেখা করতে না পারার কষ্টটা তাকে পোড়াচ্ছে।
-এতদিনে আমার কথা মনে পড়েনি তোমার? খোঁজ নিতে ইচ্ছে হয়নি। বেশ অভিমানী কন্ঠেই বললাম।
– হুম নিয়েছি তো।আমি জানতাম তুমি কোথায় পড় কোথায় থাকো।তোমার অল টাইম খোঁজ নিয়েছি।কিন্তু কখনো সামনে যাইনি।আমি চাই তুমি আরো অনেক বড় হও। আমি তো কিছু হতে পারলাম না তবুও এই ভেবে ভাল লাগে আমার বন্ধুটি অনেক বড় হবে একদিন। দূর থেকে অনেকবার দেখেছি তোমায় কিন্তু কাছে যাওয়ার সাহস পাইনি যদি চিনতে না পারো। তবে আজ বেশ ভাল লাগছে, আমার বন্ধুটি আমায় ভোলেনি।

– আনিসের চোখ দিয়ে পানি পড়ছে,যেন অঝোর বৃষ্টি ঝড়ছে চারিদিকে। আর আমি স্তব্ধ হয়ে গেছি, কারন আমার সেই বাল্যবন্ধুকে শান্তনা দেওয়ার ভাষা আমার জানা নেই।
–সত্যি জানা নেই..!!