ঘৃণাবাদী স্পষ্ট মিথ্যা প্রতিবেদনের কাজে সম্পৃক্ত দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান পদক্ষেপ চাই

আরজু আহমাদ

২০০৯ সালের এপ্রিলে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন যমুনায় বাংলাদেশের আলেমদের উচ্চ পর্যায়ের প্র‍তিনিধি দল প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতে যুক্ত বিবৃতিতে ইসলামের নামে করা সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদের নিন্দা করেন এবং এর বিরুদ্ধে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দেন।

সেই দলের নেতৃত্বে ছিলেন ৯১ বছর বয়সী প্রবীণ আলেম আল্লামা আজিজুল হক্ব রহ.। পাকিস্তানের কালে একসময় নেজামে ইসলাম পার্টি করলেও স্বাধীনতার পর গঠিত জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ এর সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি।

আইয়্যুব বিরোধী আন্দোলনের সময় নেজামে ইসলাম পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির নির্বাহী সদস্য হিসেবে এতে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। এ কথা জেনে রাখা ভালো, আইয়্যুব বিরোধী ‘৬৯ এর গণ অভ্যুত্থানে তিনিও অন্যতম শরিক ছিলেন।

জমিয়েত উলামা ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে যেমন লড়েছে তেমনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতিও ছিল এর অকুণ্ঠ সমর্থন। পরবর্তীতে খেলাফত মজলিস বাংলাদেশ ও ইসলামি ঐক্যজোটের সভাপতি হয়ে চারদলীয় জোট সরকারেরও শরিক ছিলেন তিনি। দলগুলো নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধনপ্রাপ্ত।

আজীবন সুস্থ গণতান্ত্রিক রাজনীতি করে আসা মরহুম শায়খুল হাদীস আজিজুল হককে একটি বেসরকারি টেলিভিশন তাদের প্রতিবেদনে নিষিদ্ধ ঘোষিত সন্ত্রাসী সংগঠন ‘হুজি’র প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে।

অথচ, যাবতীয় সন্ত্রাসবাদী, জঙ্গিসংগঠনের বিরুদ্ধে লড়বার প্রতিশ্রুতি তাঁরই নেতৃত্বে প্রধানমন্ত্রীকে দেওয়া হয়েছিল।

তিনি ১৯৫৫ সাল থেকে প্রায় আমৃত্যু অর্ধাশতাব্দীরও বেশিকাল বুখারী শরিফের দরস দিয়েছেন যা কালের বিচারে পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল ঘটনার একটি। বাংলা ভাষায় তিনিই প্রথম কোনও পূর্ণাঙ্গ ও মৌলিক হাদীস গ্রন্থের অনুবাদ করেন।

বুখারীর বাংলা অনুবাদ ছাড়াও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও তিনি কিছুকাল বুখারীর পাঠদান করেন। বহু মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতাও ছিলেন। জাতীয় ঈদগাহের খতিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

মহান এই কর্মবীর আলিম ও বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদের মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান এবং তদানীং বিরোধী দলীয় বেগম খালেদা জিয়া, আওয়ামীলীগের তদানীং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং স্থানীয় সরকার ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক প্রমূখ গণমাধ্যমে শোকবার্তা প্রেরণ করেন।

একজন নিষিদ্ধ ঘোষিত সন্ত্রাসী সংঘটনের প্রতিষ্ঠাতার মৃত্যুতে নিশ্চয়ই প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি, বিরোধী দলীয় নেতা শোক বার্তা প্রেরণ করেন না। এইসব ঘটনা তো কারোরই অবিদিত নয়। তবুও যার সাধারণ সম্পৃক্ততাও কোনও সন্ত্রাসী কার্যক্রমে ছিল না। যিনি এ দেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসের অংশ।

বাংলাদেশের ইসলামি শিক্ষা ও রাজনীতির সেই বাতিঘরকে কলঙ্কিত করার অপচেষ্টা কেবল ঘৃণ্যই নয় বরং জলজ্যান্ত ইতিহাসকে বিকৃত করার মধ্য দিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বিপথে তাড়িত করার মত গর্হিত কাজ।

আদতে, মিডিয়ার এই ‘সন্ত্রাস’-এর আশু প্রতিকার ভিন্ন কোনও উপায়ন্তর নেই। এই ঘটনায় মরহুমের পরিবার ও জাতির কাছে সেই টেলিভিশন কর্তৃপক্ষকে আনুষ্ঠানিক ক্ষমা চাইতে হবে।

প্রতিবেদক, নিউজরুম এডিটর, নির্বাহী সম্পাদকসহ এই ঘৃণাবাদী, স্পষ্ট মিথ্যা প্রতিবেদনের প্রচার ও সম্পাদনা কাজে সম্পৃক্ত দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।