ধর্মনিরপেক্ষতা বা অসাম্প্রদায়িকতাকে চিনুন 

Mahbubur Rahman

Mahbubur Rahman

জুলাই ০৭ ২০২১, ২২:২৬

মোঃ আব্দুল হাসিব:

ধর্মনিরপেক্ষতা একটি মতবাদ। দর্শনভিত্তিক মতবাদ হিসেবে ১৮৪৬ সালে ইংল্যান্ডে যার প্রবর্তন করে জ্যাকব হলিওক।যদিও এর প্রেক্ষাপট তৈরী হয়েছিলো আরো আগ থেকেই।রাষ্ট্র থেকে চার্চের পৃথকীকরণের উদ্দেশে। চার্চের পাদ্রীদের,পুরোহিতদের এককেন্দ্রিকতা,স্বেচ্ছাচারিতা,বৈষম্য এবংঅন্যায় আচরণের ফল স্বরূপ এর আবির্ভাব।

ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের মৌলিক উদ্দেশ্য হলো, ইহজগতমুখিতা,ধর্মবিমুখতা,বস্তুবাদ,ভোগবাদ,বিজ্ঞানমনস্কতা ও তথাকথিত উদার নৈতিকতা।বাস্তবায়ন ও প্রায়োগিক ক্ষেত্রে পৃথিবী দেখেছে ধর্মনিরপেক্ষতার ভিন্নরূপ।

এই মতবাদ ধর্মবিমুখতার কথা বললেও খ্রিস্ট ধর্মের প্রভাব থেকে বের হতে পারেনি।নানা প্রকারের বিভ্রান্তির জন্ম দিয়েছে এই মতবাদ।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা একে সংজ্ঞায়িত করতে গিয়ে বিভ্রান্তি বাড়িয়েছে।এই সুযোগে শাসকগোষ্ঠীও যে যার মতো করে একে চিত্রায়িত করার চেষ্টা করেছে।আর ইসলাম বিদ্বেষী পশ্চিমা সমাজ ইসলামের জাগরণ,এর মানবতার শিক্ষা,উদারনীতি এগুলো দেখে ভয় পেয়ে ইসলামের বিরুদ্ধ মতবাদ হিসেবে ধর্মনিরপেক্ষতাকে দাঁড় করানোর অপচেষ্টা করেছে।মানুষকে বোঝানোর চেষ্টা করেছে ধর্মনিরপেক্ষতার মাধ্যমে পৃথিবীতে শান্তি আসবে,আসবে সাম্যতা।যদিও বাস্তবে এর কোনো প্রতিফলন আজ পর্যন্ত কেউ দেখাতে পারেনি।ধর্মনিরপেক্ষতাকে লালন করে আধুনিক মহামানব বলে যারা কোনো কোনো মহলে বিপুলভাবে প্রশংসিত ও পূজিত হচ্ছে,যেমন মার্কস,লেনিন,স্ট্যালিন,ম্যাকিয়াভেলি,মাওসেতুং,তারা শ্রেণী বিদ্বেষ,দল বিদ্বেষ,জাতিবিদ্বেষ,বর্ণবিদ্বেষ, স্বার্থপরতা,সুবিধাবাদ ছাড়া ভালো কোন দর্শন মানুষকে দিতে পারে নাই।মানব রচিত প্রত্যেকটি মতবাদেরই এই হাল।এই মতবাদগুলোর ধারণকারী ও লালন কারীরা মানুষকে বিভ্রান্ত করা,অন্যায় আর অত্যাচারের যাঁতাকলে পিষ্ট করা ছাড়া আর কিছুই উপহার দিতে পারে নাই।

পক্ষান্তরে ইসলাম যে আদর্শ ও নীতি মানুষের সামনে দিয়েছে তা সর্বযুগে সর্বাধিক ন্যায়ানুগ ও সর্বজনীন।ইসলামী রাষ্ট্রনীতির ভিত্তি ও উৎসমূল হলো,ঐশ্বরিক প্রত্যাদেশ ও শরীয়তের সীমারেখার ভিতরে থেকে মানবতা,সাম্যতা এবং সহিষ্ণুতার উপরে।পরকালমুখীতা সদা জাগ্রত রেখে ইহকালমুখীতাকেও প্রয়োজন মাফিক স্বীকৃতি দেয়া।

ধর্মনিরপেক্ষতাকেন্দ্রিক অসাম্প্রদায়িকতার মূল কথা হলো,ধর্মীয় ক্ষেত্রে সবাই সম্প্রদায়হীন থাকবে আর রাষ্ট্র থেকে ধর্ম পৃথক থাকবে।সামাজিক,পারিবারিক, রাষ্ট্রীয়সহ অন্য সকল ক্ষেত্রে সাম্প্রদায়িকতাকে ঠিকই জিইয়ে রাখা হবে।শ্রেণী বিভাজনের নামে দুর্বল ও অসহায়দেরকে অত্যাচারের যাঁতাকলে পিষ্ট করা হবে। এখানেই ইসলামের সাথে মৌলিক পার্থক্য।

ইসলামের নীতি হলো,আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাসী হয়ে ধর্মীয় সীমাবদ্ধতার ভিতর থেকে সকল ধরনের সাম্প্রদায়িকতার বীজকে উপড়ে ফেলা।বর্ণ বৈষম্য,জাতীয়তাবাদের নামে জাতি বৈষম্য, ধনী-গরিবের শ্রেণীবিভাজন,দল-মতের নামে মানুষের মাঝে অশান্তিময় বিভাজন ও বিভেদ কোনটাই ইসলাম সমর্থন করেনা।মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে কারীমে ইরশাদ করেছেন,

يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُمْ مِنْ ذَكَرٍ وَأُنْثَىٰ وَجَعَلْنَاكُمْ شُعُوبًا وَقَبَائِلَ لِتَعَارَفُوا ۚ إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ ۚ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ.

হে মানব, আমি তোমাদেরকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পরে পরিচিত হও। নিশ্চয় আল্লাহর কাছে সে-ই সর্বাধিক সম্ভ্রান্ত যে সর্বাধিক পরহেযগার। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সবকিছুর খবর রাখেন।(সুরা হুজুরাত)

এই আয়াতে আল্লাহ তায়া’লা মানুষের মাঝে বিভাজনের নীতি বিলুপ্ত করে জানিয়েছেন,মানুষের বংশীয় ও গোত্রীয় ভিন্নতা শুধুমাত্র পরিচয়ের জন্য।এর মাধ্যমে কোনো বৈষম্য ও বিভাজন মোটেও গ্রহণযোগ্য না।শ্রেষ্ঠত্ব শুধুমাত্র আল্লাহমুখীতার উপর নির্ভরশীল। হুজুর আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিদায় হজের ভাষণে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেছেন,কৃষ্ণাঙ্গের উপর শেতাঙ্গর কোন শ্রেষ্ঠত্ব নাই। অনারবের উপর আরবের কোন শ্রেষ্ঠত্ব নাই।এভাবেই নবী করিম সা.নিজ কথা ও কাজের মাধ্যমে সকল প্রকারের অন্যায়,অসমতা ও বৈষম্যের মূলোৎপাটন করেছেন।সর্বোৎকৃষ্ট এক আদর্শ মানবজাতির জন্য রেখে গিয়েছেন।তার বাস্তবায়িত ইসলামী আদর্শে রয়েছে মানবজাতির প্রকৃত কল্যাণ।অবোধরা না বুঝুক,শত্রুরা স্বীকার না করুক তাতে কিচ্ছু যায় আসেনা।ইসলামই একমাত্র নিখুঁত,ন্যায়ানুগ ও জীবনঘনিষ্ঠ বিধান।আল্লাহ তায়ালা সকলকে সুমতি দান করুন।(আমীন)

লেখক: আলেম, গবেষক ও সাহিত্যিক