দূষণ ও শিল্পের চাপে কোণঠাসা সুন্দরবন

মার্চ ২১ ২০১৮, ০৯:২২

ভালো নেই সুন্দরবন। বিশ্বের সবচেয়ে বড় এই শ্বাসমূলীয় বনটি দূষণ ও শিল্পকারখানার চাপে হুমকির মুখে পড়েছে। বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের জন্য আটটি হুমকি চিহ্নিত করে জাতিসংঘের বিজ্ঞান, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেসকো বলেছে, সুন্দরবনের অমূল্য সম্পদ রক্ষা করতে হলে এসব হুমকি মোকাবিলায় জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে।

ইউনেসকো বলছে, বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীতে লবণাক্ততার সমস্যা আগে থেকেই ছিল। এবার এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পানিদূষণ। একই সঙ্গে জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি করে পশুর নদ খনন, বন্য প্রাণী শিকার, মিষ্টি পানির প্রবাহ কমে যাওয়া, ভূমিক্ষয় ও ভাঙন, অবকাঠামো নির্মাণ ও বনের পাশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন বনটিকে হুমকির মুখে ফেলেছে। সংস্থাটির ওয়েবসাইটে এই আটটি বিষয়ের হুমকির তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

সুন্দরবন যে ভালো নেই, তা ইউনেসকোর পরামর্শক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচারের (আইইউসিএন) প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে। আইইউসিএন গত নভেম্বরে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ আউটলুক-২০১৭ নামে একটি প্রতিবেদনে বিশ্বের ২৩৯টি বিশ্ব ঐতিহ্য কী অবস্থায় আছে তা তুলে ধরেছে। এতে বলা হয়েছে, ১৫৪টি ভালো অবস্থায় আছে। ৭০টির অবস্থা মোটামুটি এবং ১৪টির অবস্থা গভীর উদ্বেগজনক। ১টির অবস্থা খুবই সংকটাপন্ন। গভীর উদ্বেগজনক তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশের সুন্দরবনের নাম।

পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, সুন্দরবনের চারপাশে ১০ কিলোমিটার এলাকা প্রতিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন এলাকা। পরিবেশ আইন অনুযায়ী সেখানে শিল্পকারখানা করা নিষেধ। কিন্তু পরিবেশ সংরক্ষণবিষয়ক জাতীয় কমিটি ওই এলাকায় ৩২০টি শিল্পকারখানা করার অনুমোদন দিয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পরিবেশ ও বনসচিব আবদুল্লাহ মহসিন চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আইইউসিএনের তালিকা এখনো দেখিনি। না দেখে এ বিষয়ে কিছু বলতে পারব না।’

আইইউসিএনের প্রতিবেদনে আলাদা ৪৭ পৃষ্ঠা সুন্দরবন নিয়ে বিস্তারিত বলা হয়েছে। তাতে বাংলাদেশের উজানের নদীগুলো থেকে মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়ার কারণে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়াকে বড় হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সুন্দরবনের মিঠাপানির প্রবাহের সবচেয়ে বড় উৎস গঙ্গা নদী। সত্তরের দশকে ওই নদীর ওপরে ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের ফলে ভাটির এলাকা সুন্দরবনে মিঠাপানির প্রবাহ কমে আসে এবং এতে লোনাপানির প্রবাহ বেড়ে যায়। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ ৪০ শতাংশ কমে যাওয়ার ফলে নদীগুলোতে পলি বেড়ে গেছে। এতে সুন্দরবনের বাঘ, হরিণসহ বিভিন্ন বন্য প্রাণীর বসতি এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক ধরনের উদ্ভিদ উচ্চ লবণাক্ততা সহ্য করতে না পেরে মারা যাচ্ছে।

সুন্দরবনের কুমির ও ডলফিনের পরিমাণ কমে আসছে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারণে সুন্দরবনের বায়ু, পানি ও মাটিদূষণ বাড়বে। কয়লা পরিবহনের জন্য সুন্দরবনের ভেতরে নৌযান চলাচল বেড়ে যাবে। এ ছাড়া নৌপথ চালু রাখতে পশুর নদ খনন করায় সেখানকার ছয় প্রজাতির ডলফিন ও কুমির আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

সুন্দরবন থেকে অনিয়ন্ত্রিত বনজ সম্পদ আহরণ, বাঘ ও বন্য প্রাণী হত্যা এবং নানা ধরনের অবৈধ তৎপরতা চলছে উল্লেখ করে আইইউসিএন বলছে, অনেক বছর ধরেই সুন্দরবনের মধ্যে এ ধরনের তৎপরতা চলছে। এ ছাড়া ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের প্রভাব, সুন্দরী ও গেওয়াগাছের আগামরা রোগও সুন্দরবনের জন্য হুমকি।

এ ব্যাপারে আইইউসিএনের সাবেক আবাসিক প্রতিনিধি ইশতিয়াক উদ্দিন আহম্মেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘সরকার সুন্দরবন রক্ষায় দেশের সংবিধান ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সনদে অঙ্গীকারবদ্ধ। ফলে এই বনের ক্ষতি হয় এমন কোনো কাজ করতে দেওয়া হবে না বলে আমরা আশা করি। আর যেসব কর্মকাণ্ড বনটিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, তা অচিরেই বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও আশা করছি।’

রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারণে সুন্দরবনের সম্ভাব্য ক্ষতির বিষয়টি উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রামপাল প্রকল্পের আশপাশে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান তাদের কারখানা স্থাপন করছে। এর ফলে ইতিমধ্যে সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে জাহাজ চলাচল বেড়ে গেছে। সামনের দিনগুলোয় তা আরও বাড়বে। ইতিমধ্যে কিছু জাহাজ দুর্ঘটনার শিকার হয়ে সুন্দরবনে জ্বালানি তেল ছড়িয়ে পড়েছে। অন্যান্য রাসায়নিক পণ্যবাহী জাহাজডুবিও হচ্ছে। এসব দূষণ সুন্দরবনের প্রাণীদের বসতি এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ডলফিন, কুমিরসহ অন্যান্য জলজ প্রাণীর বিচরণও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সাবেক প্রধান বন সংরক্ষক ইউনুস আলী প্রথম আলোকে বলেন, সুন্দরবনের মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় ইতিমধ্যে সুন্দরবনে বড় গাছ কমে যাচ্ছে। আর মাঝারি গাছ বাড়ছে। এতে বনটির স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এর সঙ্গে বনের চারপাশে শিল্পকারখানার চাপ যোগ হওয়ায় সুন্দরবন আরও ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। সুন্দরবনকে রক্ষা করতে হলে ভারতের সঙ্গে আলোচনা করে শুষ্ক মৌসুমে মিঠাপানির প্রবাহ বাড়াতে হবে। শিল্পকারখানাগুলো নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে।

উল্লেখ্য, গত তিন বছরে মোট চারবার ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটির পক্ষ থেকে সুন্দরবনের পাশ থেকে রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প নিরাপদ দূরত্বে সরানো ও চারপাশে শিল্পকারখানা স্থাপন বন্ধ করার জন্য সরকারের কাছে অনুরোধ জানানো হয়। গত বছরের জুলাই মাসে পোল্যান্ডের ক্রেকাও শহরে অনুষ্ঠিত ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটির বার্ষিক সভায় রামপাল প্রকল্প বাতিলসহ সরকারকে সাতটি অনুরোধ করা হয়।

সরকারকে শুধু সাংবিধানিক দায়িত্ব থেকে নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের অংশ হিসেবে সুন্দরবনবিনাশী সব প্রকল্প বাতিল করতে হবে বলে মনে করেন তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্যসচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। তিনি বলেন, দেশে এখন এমন পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে যারা সুন্দরবন রক্ষায় কথা বলে, তাদেরই সরকারি লোকজন ও সরকারের বিভিন্ন পক্ষ থেকে শত্রু হিসেবে দেখা হচ্ছে। কিন্তু এই সুন্দরবন রক্ষার দায়িত্ব সরকার-জনগণ সবার।