দাওরা হাদিসে মেধাতালিকায় স্থান অর্জনকারীদের জন্য বিশেষ পরামর্শ

একুশে জার্নাল

একুশে জার্নাল

ডিসেম্বর ২২ ২০২০, ১০:০৩

একটা উদাহরণ দিয়ে শুরু করি। আমার বন্ধু ও ছোটো ভাই মীযান হারুনকে অনেকে চিনেন। মিডিয়া আরবি কীভাবে শিখব? এবং আরবি ভাষায় উপমহাদেশের আলেমদের জীবনী লিখে বোদ্ধামহলের নজর কেড়েছেন। ২০১৩ সনে মীযান আমার একটা বাংলা বইয়ের ইংরেজি করে দিয়েছিল। সে মেশকাতে পড়ার সময় আর-রাহীকমুল মাখতুমের বঙ্গানুবাদ করে ফেলেছিল। এখন রিযাদের একটি ভার্সিটিতে পড়ছে। সেও বেফাকের মেধাতালিকায় স্থান পেত একটু পেছনের সারিতে। সব পরীক্ষায় স্থানও পায়নি। আমার স্মৃতি ভুল না করলে তার ক্লাসে তারচেয়ে ভালো ছাত্র ছিল; অন্তত বেফাতের মেধাতালিকার হিসাবে হলেও। কিন্তু সে আজকে কোথায় আর মীযান কোথায়!

তাই বলতে চাচ্ছি, শুধু মেধাতালিকা দিয়ে ধুয়ে পানি খাওয়া যায় না। ‍তৃপ্তির ঢেকুর তোলা যাবে না। নিজেকে আরও যোগ্যবান করে তুলতে হবে। তুমি মেধাতালিকায় স্থান পেয়েছ মানে মাদরাসাওয়ালারা তোমাকে নিয়োগ দেওয়ার জন্য তোমার পেছনে লাইন দেবে, এমনটা নয়। আজকের পৃথিবীটা তোমার কাছে যতটা বর্ণিল ও রঙিন মনে হচ্ছে, জীবনের রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি হলে মনে হবে জীবনটা সাদাকালো ও বর্ণহীন। এ পৃথিবী প্রতিযোগিতার জায়গা। কেউ কাউকে চূড়ান্ত সহযোগিতা করে না। নিজের পথ নিজেকেই আবিষ্কার করতে হয়। একজন অগ্রজ হিসেবে কিছু পরামর্শ রইল :

০১. যে-কোনো একটি বা দুটি বিষয়ে মুতাখাসসিস হতে হবে। তালিমি মুরুব্বির পরামর্শ এবং নিজের রুচি অনুযায়ী বিষয় নির্ধারণ করে পড়াশোনা করতে হবে। শুধু প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা বলছি না, অপ্রাতিষ্ঠানিকও হতে পারে।

০২. দাওরার পর কী পড়া যায়?
যাদের ফ্যামিলি আলেম তাদের পরামর্শ দেওয়ার লোক আছে, তাই যাদের পরিবার আলেম না, তারা নিজেদের আসাতিজা ও তালিমি মুরুব্বির পরামর্শ গ্রহণ করা আবশ্যক। নির্দিষ্ট তালিমি মুুরব্বি ছাড়াও বর্তমানে দেশে-বিদেশে যেসব আলেম/শিক্ষাবিদ রয়েছেন তাদের সাথে পরামর্শ করা। যেমন মাওলানা আবদুল মালেক, ড. আফম খালিদ হোসেন, মাও. উবায়দুল্লাহ হামযা প্রমুখ।

০৩. উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে গমন করার সুযোগ থাকলে সর্বাত্মক চেষ্টা করা। অন্তত এক বছরের জন্য হলেও দেওবন্দ যাওয়া উচিত। নিয়মতান্ত্রিক এডমিশন সম্ভব না হলেও সামাআত হলেও যাওয়া দরকার। দেওবন্দে যাওয়ার পদ্ধতি সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কারও সাথে সরাসরি কথা বললে ভালো হবে।
আরববিশ্ব, মিসর, তুরস্ক বা মালয়েশিয়ায় স্কলারশিপ পাওয়ার চেষ্টা করা উচিত। সম্ভব না হলে মোটামুটি টাকাওয়ালা হলেও নিজের টাকায় মিসরে পড়ালেখার খরচ খুব বেশি না। মেধাবীদের উচ্চশিক্ষার দিকে মনোনিবেশ করা উচিত। আজকের দুনিয়ায় কেবল যোগ্যতা দিয়ে সবকিছু হয় না, একটা মোটসোটা সার্টিফিকেট দরকার। তাই যাদের সম্ভব হয় নামের শুরুতে একটা দাল ডট লাগানো চেষ্টা করো। তোমার যোগ্যতার সাথে ডক্টরেট ডিগ্রি থাকলে সমাজ তোমাকে স্পেস দিবে সহজে।

০৪. আরবি ভাষায় দুর্বলতা থাকলে আগে আদব পড়া উচিত। দুর্বলতা প্রায় সবারই থাকে। তাইেআগে টার্গেট করতে হবে দাওরার পর কয়বছর প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা করবেন? সময় থাকলে আগে আদব পড়ে তারপর অন্তত দুইবছরের ইফতা পড়া উচিত। অনেককে দেখলাম ইফতা পড়ে আদব পড়ছে, এটা অনুচিত। যে যত ভালো আরবি পারবে, সে ইফতায় তত বেশি ইস্তেফাদা করতে পারবে। এক বছরের ইফতা না পড়া উচিত।

০৫. যাদের আলিম বা সমমানের সার্টিফিকেট আছে, তারা বিদেশে যেতে না পারলে দেশের কোনো ভালো মানের ভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে যাও। দাওরার বিকলাঙ্গ সার্টিফিকেট দিয়ে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি বা দারুল ইহসান মার্কা ভার্সিটিতে অনার্স-মাস্টার্স করার কোনো মানে হয় না। টাকা নষ্ট করা ছাড়া কিচ্ছু হবে না। মাস্টার্সের সার্টিফিকেট পাওয়ার পর আবার অনার্স করা হাইস্যকর ছাড়া কিচ্ছু না।

০৬. আগ্রহ থাকলে আর্থিক সচ্ছলতার পথ সুগম করে এমন কোনো পথের দিকে আগানো উচিত। যেমন ফ্রিলান্সিং, গ্রাফিক্স ইত্যাদি।

০৭. বর্তমানে লেখালেখি ও অনুবাদের পেশায়ও ভালো লোকের অভাব। আগ্রহ থাকলে এ পেশায়ও আসতে পারো। তাখাসসুসাত পড়ার শেষদিকে এ বিষয়ে মনোযোগ দিলে ভালো হবে।

০৮. মুরিদ না হয়ে থাকলে ভালো কোনো পীর সাহেবের হাতে বায়আত হয়ে যাওয়া উচিত। নয়তো তাবলিগওয়ালাদের সাথে সময় লাগানো উচিত। যে কোনো একদিকে ঝুঁকতে হবে। এ পৃথিবীতে নিরপেক্ষদের কোনো স্থান নেই, এটা মনে রাখতে হবে। মুরিদ হওয়া এবং তালিগি হওয়ার মাঝে দুনিয়া ও আখেরাতের বহুবিধ ফায়দা রয়েছে।

০৯. ইদানীং মেধাবীরা শিক্ষকতা পেশার দিকে ঝুঁকছে না বেশি। এর পেছনে বহু কারণ রয়েছে। যতটুকু সম্ভব পড়ানোর পেছনে সময় দেওয়া উচিত।

১০. বিয়ে করার সময় বড় কোনো মাদরাসার মুহতামিমের মেয়ে দেখে বিয়ে করা উচিত! সাহেবজাদা বা জামাইদের কদর অনেক বেশি!

ফের না কাহনা কেহ হামে খবর না মিলী!

দাওরা হাদিসের সনদকে কার্যকর করার জন্য শিক্ষার্থীদের পক্ষ হতে আন্দোলনের ডাক দেওয়া উচিত।

যারা ভালো রেজাল্ট করেছে সবাইকে অভিনন্দন। আগামীর পৃথিবী তোমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।