জীবন গড়ি সীরাতের আলোয়- ০২

একুশে জার্নাল

একুশে জার্নাল

মে ১৫ ২০১৯, ১৫:৫২

 

আরজু আহমাদ

আবু হুরায়রা রা. হাদীস বর্ণনা করেন, ‘রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে আমরা একদিন ইশার সালাত আদায় করছি। যখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেজদায় যাচ্ছিলেন হাসান ও হুসাইন তাঁর পিঠের উপর উঠে যাচ্ছিলেন।

তিনি সেজদা থেকে মাথা তোলার সময় তাদেরকে সন্তর্পণে পিঠ থেকে সরিয়ে দিচ্ছিলেন। রাসুল সা. যখন আবার সেজদায় যাচ্ছিলেন তখনও তারা আবারও একই কাজ করছিল। নামাজ শেষে রাসুল তাঁদেরকে টেনে নিয়ে নিজের কোলের উপর বসালেন।’ (সিলসিলাহ আস-সহীহাহ)

আমরা কি এইরকম সহনশীলতার ঘটনা ভাবতে পারি- নিজের ক্ষেত্রে? এতটা কোমল আচরণ কি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কেবল নিজের নাতি বলেই করেছেন? তা কিন্তু মোটেই না, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন, ‘যে শিশুদের সাথে কোমল আচরণ করে না সে আমাদের দলভূক্ত নয়।’

শিশুদের সাথে কোমল আচরণ কেবলই সুন্নাত নয় বরং ওয়াজিব। অর্থাৎ, অবশ্য কর্তব্য। ইসলামের দৃষ্টিতে একটা মেন্ডাটরি বিষয়। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাচ্চাদের প্রসঙ্গে কতখানি কোমল ছিলেন, এর উদাহরণ হচ্ছে ইমাম বুখারীর বর্ণিত এই হাদীস।

উম্মে খালেদ রা. নিজেই তাঁর শৈশবের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলছেন, ‘আমার বাবা আমাকে নিয়ে রাসুল সা. এর সঙ্গে দেখা করতে গেলেন। সেদিন আমি একটা হলুদ রঙের জামা পরেছিলাম। আমাকে দেখে তিনি হাসিমাখা মুখে বললেন, সানাহ সানাহ।’

ইথোপিয়ান ভাষায় সানাহ মানে সুন্দর। সেই মেয়েকে রাসুল সা. এতখানি কাছে টেনে নিলেন যে সে পেছন দিকে থেকে রাসুলের কাঁধে ঝাপ দিয়ে গলা জড়িয়ে ধরছিল।

তাঁর বাবা এটা দেখে তাঁকে বাঁধা দিতে গেলে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর পিতাকে হাতের ইশারায় থামিয়ে দেন। ভেবে দেখুন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যিনি তখন মদিনা রাষ্ট্রের সর্বাধিক নায়ক এবং সর্বশ্রেষ্ঠ নবী।

এইরকম কোনও আগুন্তক কি আমাদের সঙ্গে অফিশিয়ালি সাক্ষাত করতে আসলে তাঁর বাচ্চাকে সঙ্গে আনা পছন্দ করতাম আমরা? কিম্বা বাচ্চার এইরকম দুষ্টুমি? রাষ্ট্রপ্রধান, শীর্ষ নেতা সে তো দূর কি বাত!

এমনকি রাসুল তাঁর পথ চলবার সময়, পথে থেমে বাচ্চাদের সঙ্গে খেলা করেছেন। ইয়ালা ইবনে মু’রা রা. বলেন, ‘একদিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে একটা দাওয়াতে যাবার জন্য আমি বেরুলাম।

পথে উসামা বিন জায়েদ ও হুসাইন রা. খেলা করছিল। তিনি তাদের ধরবার চেষ্টা করলেন। হুসাইন একবার বামে আরেকবার ডানে দৌড়াচ্ছিল। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরিশেষে ধরলেন। দুজনকে নিজের দুই উরুতে বসিয়ে বুকে চাপ দিলেন এবং দোয়া করলেন।’ (বুখারী)

বাচ্চাদের সঙ্গে দয়াময় রাসুলের খেলা করবার আরও একটা বর্ণনা বুখারীতে এসেছে, ‘মাহমুদ ইবনে আল রাবি রা. তার শৈশবের স্মৃতিচারণ করে বলছেন- ‘আমার স্মরণ আছে, একদিন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর মুখ থেকে পানি আমার মুখে ছুঁড়ে দিচ্ছিলেন। তখন আমার বয়স পাঁচ।’,

দেখবেন, ঠোঁট সরু করে মুখ থেকে পানির সংকীর্ণ ধারা ছুঁড়ে দিলে সুড়সুড়ি অনুভব হয়, আর বাচ্চারা খিলখিলিয়ে হেসে উঠে। আমিও বাচ্চাদের সঙ্গে গোসল করতে নেমে পুকুরে একাজ করেছি।

আনাস রা. বলেন, আমার ভাই উমাইর একটা পাখি পুষত। যখনই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উমাইরকে দেখতেন, জিজ্ঞেস করতেন, ‘উমাইর তোমার নুগাইর কোথায়?’ (বুখারী, মুসলিম)

মদিনার পথে প্রান্তরে খেলে বেড়ানো বাচ্চাটির পোষা পাখির খোঁজ যে নবী রাখতেন- যে নবী কখনোই কোনও বাচ্চাকে ধমক দেন নি- যে নবী তাঁর সামনে মওসুমের প্রথমে আসা ফল নিজের চোখে ঠেকিয়ে বাচ্চাদের দিকে বাড়িয়ে দিতেন- সে নবীর উম্মত শিশুদের সাথে কী করে রূঢ় আচরণ করতে পারে?

বরং বাচ্চাদের সাথে কেমন আচরণ হবে, আবু কাতাদা আমাদেরকে জানাচ্ছেন রাসুলের সেই শিক্ষার কথা। তিনি বলেন, ‘রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আসলেন তাঁর কাঁধে উমামা বিনতে আবি আল আস। তিনি যখন উপুড় হচ্ছিলেন তখন তাঁকে নামিয়ে রাখছিলেন। আবার সোজা হওয়ার সময় কাঁধে তুলে নিচ্ছিলেন।’

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণ করতে চাইলে, তাঁর আদর্শকে মানতে চাইলে আমাদের বাচ্চাদের প্রতি এরকম আদরের অভ্যেস গড়তে হবে। এটা সুন্নাত ও সওয়াবের কাজ। আর বাচ্চাদের সাথে কঠোর আচরণ এর বিপরীত কাজ।