খেলাফত মজলিসের তিন দশক; প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি – ফুজায়েল আহমাদ নাজমুল

একুশে জার্নাল

একুশে জার্নাল

ডিসেম্বর ০৮ ২০২০, ০৭:৪৩

 

আজ খেলাফত মজলিসের প্রতিষ্ঠা দিবস। সবাইকে সংগ্রামী শুভেচ্ছা। ১৯৮৯ সালের এই দিনে (৮ ডিসেম্বর) সকাল ৯টায় ঢাকাস্থ ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত উদ্বোধনী সম্মেলনে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় জাতীয় প্রত্যাশা পূরণে শায়খুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক এর নেতৃত্বাধীন খেলাফত আন্দোলন এবং ড. আহমদ আবদুল কাদের এর নেতৃত্বাধীন ইসলামী যুব শিবির একীভূত হয়ে আলেম-ওলামা, দ্বীনদার বুদ্ধিজীবি ও ইসলামী চিন্তাবিদদের সমন্বয়ে গঠিত হয় খেলাফত মজলিস।

এ দলের প্রতিষ্ঠাকালীন আমীর ছিলেন প্রখ্যাত মুফাসসিরে কুরআন মাওলানা আবদুল গফফার, মহাসচিব ছিলেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও ভাষা সৈনিক অধ্যক্ষ মুহাম্মদ মাসউদ খাঁন, অভিভাবক পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন শায়খুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক এবং বর্তমান আমীর হচ্ছেন অধ্যক্ষ মাওলানা মুহাম্মাদ ইসহাক এবং মহাসচিব হচ্ছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ প্রফেসর ড. আহমদ আবদুল কাদের।

 

১৯৮৯ সালের ৮ ডিসেম্বর খেলাফত মজলিসের উদ্বোধনী সম্মেলনে বক্তব্য রাখছেন প্রতিষ্ঠাকালীন আমীর মাওলানা আবদুল গফফার

 

নব্বইয়ের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন, ৯২ সালের বাবরী মসজিদ আন্দোলন, ফারাক্কা ও বরাক বাঁধ বিরোধী আন্দোলন, ৯৪ সালের নাস্তিক-মুরতাদ প্রতিরোধ আন্দোলন, ৯৬ সালের পার্বত্য চুক্তি বিরোধী আন্দোলন, ৯৭ সালের মুর্তি বিরোধী আন্দোলন এবং ফতোয়া বিরোধী রায় প্রতিরোধ আন্দোলন, নিরপেক্ষ ও নির্দলীয় তত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন, ২০১৩ সালের হেফাজতে ইসলামের ব্যানারে ইসলাম বিদ্বেষি ব্লগার নাস্তিক বিরোধী আন্দোলন এবং ভারতীয় আধিপত্যবাদ বিরোধী আন্দোলনসহ প্রতিটি ন্যায্য আন্দোলন সংগ্রামে খেলাফত মজলিস ছিলো সামনের কাতারে। এছাড়াও স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব সুরক্ষার জন্য দেশের সর্বস্তরের জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করা এবং মুসলিম উম্মাহর বিরোধ-বিভেদের অবসান ও ইসলামী দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করার প্রচেষ্টায় খেলাফত মজলিসের ভুমিকা প্রসংশনীয়।

 

১৯৮৯ সালের ৮ ডিসেম্বর খেলাফত মজলিসের উদ্বোধনী সম্মেলনে বক্তব্য রাখছেন প্রতিষ্ঠাকালীন যুগ্মমহাসচিব ড. আহমদ আবদুল কাদের

 

দীর্ঘ দুই যুগেরও বেশি এই পথচলায় অসংখ্য বাধা-বিপত্তির মোকাবেলা করতে হয়েছে খেলাফত মজলিসকে যা কেবল কাফেলার নেতাকর্মীরাই জানেন। প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক পর্যায়ে বন্ধু সংগঠনের মিথ্যাচার ও হিংসা-বিদ্বেষের নির্মম অত্যাচারে কোমর ভেঙ্গে যাবার কথা থাকলেও নেতাকর্মীদের দৃঢ় মনোবল, বিশ্বাস, সবর এবং বিরামহীন প্রচেষ্টা সব বাঁধা ও প্রতিবন্ধকতাকে পরাজিত করে দেশের আলেম-ওলামা, দ্বীনদার বুদ্ধিজীবি ও ইসলামী চিন্তাবিদদের একটি বিশ্বস্ত সংগঠন হিসেবে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছে।

 

ঐতিহাসিক বাবরী মসজিদ পূন:নির্মাণের দাবীতে ভারত অভিমূখে লংমার্চে শায়খুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক ও ড. আহমদ আবদুল কাদের সহ জাতীয় নেতৃবৃন্দ

 

শৈশব কৈশোর পাড়ি দিয়ে যৌবনকাল অতিক্রম করছে গণ-মানুষের এ দলটি। কিন্তু বিগত ৩০ বছরে দলটির অগ্রগতি কতটুকু এমন একটি প্রশ্ন থেকে যায় সচেতন মহলের। আমরা লক্ষ করেছি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে খেলাফত মজলিস সহ ইসলামী দলগুলোর মৌলিক তেমন অগ্রগতি নেই। কেউই তৃণমূল পর্যন্ত শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারেনি। কেউই সরকার গঠন ও পরিচালনার মতো শক্তি অর্জন করতে পারেনি। ধর্মীয় ইস্যুতে সবাই আটকে আছে। জনগণকে নিয়ে কেউই পর্যাপ্ত ভাবছে না। জনগণের সমস্যা সমাধানে কেউই পর্যাপ্ত এগিয়ে আসছে না। কারো হাতে পর্যাপ্ত জনকল্যাণমুখী কর্মসূচি নেই। আর এসব কারণে ভোটের রাজনীতিতে সবার অবস্থান খুবই দুর্বল যা বলার অপেক্ষা রাখে না।

 

খেলাফত মজলিস আয়োজিত উলামা মাশায়েখ সম্মেলনে আমীরে মজলিস অধ্যক্ষ মাওলানা মুহাম্মাদ ইসহাক সহ জাতীয় নেতৃবৃন্দ

 

আমাদের প্রত্যাশা খেলাফত মজলিস তার সমস্যা ও দূর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে জনকল্যাণমুখী কর্মসূচি নিয়ে ময়দানে দশ বছর মেয়াদি একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করবে। এবং সেই পরিকল্পনার আলোকে ২০৩০ সালের ভেতর দেশের প্রতিটি ইউনিয়ন, উপজেলা ও সংসদীয় আসনে দলীয় অবস্থান শক্তিশালী করে তুলবে। দলকে জনগণের হৃদয়ে পৌঁছে দিতে নেতাকর্মীরা ত্যাগের সর্বোচ্চ নাজরানা পেশ করবে।

লক্ষ অর্জনের হিসাব-নিকাশে প্রত্যাশা থেকে প্রাপ্তি একেবারে কম নয় খেলাফত মজলিসের। দলটি রাষ্ট্রক্ষমতায় যেতে না পারলেও দীর্ঘ তিন দশকে দেশ ও জাতিকে নেতৃত্ব দেবার মতো একঝাঁক সৎ, যোগ্য ও দক্ষ লোক তৈরী করতে সক্ষম হয়েছে। সরকারের নীচ থেকে উচ্চপর্যায় পর্যন্ত এ দলের বহু জনশক্তি রয়েছেন যারা সততা ও দক্ষতার সাথে রাষ্ট্রের কর্মচারী হিসাবে কাজ করছেন। এটা একটি দলের জন্য বিশাল প্রাপ্তি।

 

মহিলা মজলিস আয়োজিত নারী ও শিশু নির্যাতন এবং সামাজিক অবক্ষয় রোধে ইসলামী অনুশাসন শীর্ষক সেমিনার

 

নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে খেলাফত মজলিস খুবই উদার। একক কোন গোষ্ঠীর মধ্যে নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব সীমাবদ্ধ নয়। এ দলের মধ্যে কওমী-আলীয়াপন্থী আলেম, মাদরাসা শিক্ষক, স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আইনজীবী, বুদ্ধিজীবী, ব্যবসায়ী, কৃষক-শ্রমিক সহ সকল শ্রেণী ও পেশার মানুষের নেতৃত্ব রয়েছে। আর এ চিন্তা থেকেই শ্রমিকদের সংগঠন (শ্রমিক মজলিস), চিকিৎসকদের সংগঠন (ডক্টর সোসাইটি অব বাংলাদেশ), আইনজীবীদের সংগঠন (আইনজীবী মজলিস), মহিলাদের সংগঠন (মহিলা মজলিস) গড়ে তোলা হয়েছে। এবং বিশেষ পরিকল্পনার আলোকে উল্লেখিত সকল সহযোগী সংগঠন সাধ্যানুযায়ী মাঠে কাজ করে যাচ্ছে। সমাজের সব শ্রেণী ও পেশার মানুষকে এক প্লাটফর্মে একত্রিত করতে যখন অন্য সকল দল ব্যার্থ হয়েছে তখনই খেলাফত মজলিস সফল হয়েছে।

 

শ্রমিক মজলিস আয়োজিত শ্রমিক সমাবেশে খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব মুহাম্মদ মুনতাসীর আলী সহ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ

 

রাজনীতির বাহিরে এডুকেশন ও সাংস্কৃতি নিয়েও কাজ করছে খেলাফত মজলিস। কেন্দ্রীয় দায়িত্বশীলদের সরাসরি তত্বাবধানে এডুকেশন সংস্থা (দারুল আজহার ফাউন্ডেশন) গড়ে তোলা হয়েছে। ইতিমধ্যে এ ফাউন্ডেশনের আওতায় দেশের বেশ কয়েকটি জেলা ও উপজেলায় “দারুল আজহার মডেল মাদরাসা” প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। অপসংস্কৃতির বিপরীতে সুস্থ সংস্কৃতি গড়ে তোলার লক্ষে জাতীয় সাংস্কৃতিক ফোরামও (জাসাফ) কাজ করে যাচ্ছে।

 

ডক্টরস সোসাইটি অব বাংলাদেশ আয়োজিত বৈজ্ঞানিক সেমিনারে বক্তব্য রাখছেন সংগঠনের সভাপতি ডা: আব্দুল্লাহ খাঁন 

 

খেলাফত মজলিস শুধু দেশে নয়, মধ্যপ্রাচ্যসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও গড়ে উঠেছে তার শাখা প্রশাখা। দেশ-বিদেশে প্রচুর সমর্থক, কর্মী ও শুভাকাঙ্খী রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সকল পর্যায়ের জনশক্তির আদর্শিক সচেতনতা ও কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি এবং তাদের আধ্যাত্মিক, নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক মানোন্নয়নের মাধ্যমে উপযুক্ত কর্মীরূপে গড়ে তুলতে দলের রয়েছে নানামুখী কর্মসূচী। বলা যায়, ক্যাডারভিত্তিক পরিচ্ছন্ন এ দলের কাজ অত্যন্ত সুশৃঙ্খল, গতিশীল ও সু-সংগঠিত।

 

দারুল আজহার ফাউন্ডেশন আয়োজিত শিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মশালা

 

আমি মনে করি খেলাফত মজলিস যথেষ্ট সম্ভাবনাময় একটি দল। দেশের অন্যান্য দলের কর্ম, চিন্তা ও চেতনার সাথে কম্পেয়ার করলে খেলাফত মজলিসই ব্যতিক্রম হবে। যারা এখনো এ দল সম্পর্কে তেমন জানাশোনা নেই তাদেরকে জানার আহবান করছি।

খেলাফত মজলিস ইসলামী আদর্শের ভিত্তিতে সমাজ কাঠামোর পুনর্গঠন, জনগণের সকল প্রকার মৌলিক মানবিক অধিকার সংরক্ষণ ও নিশ্চিতকরণ এবং ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক জনকল্যাণমূলক প্রতিনিধিত্বশীল একটি সরকার প্রতিষ্ঠা করতে চায়। বাংলাদেশকে একটি দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। ৭ দফা মৌল-কর্মসূচি ও ২৫ দফা আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার নিয়ে খেলাফত মজলিস মূল লক্ষের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।

 

জাতীয় সাংস্কৃতিক ফোরাম আয়োজিত আলোচনা সভায় খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ড. মুস্তাফিজুর রহমান ফয়সল সহ জাসাফ নেতৃবৃন্দ 

 

খেলাফত মজলিসের ২৫ দফা আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার হচ্ছে নিম্নরূপ:

১. মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব সংরক্ষণঃ ‘বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার নিশ্চিত করাণার্থে’ ঐতিহাসিক মুক্তিসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীন বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশ ঘটে। মুক্তিযুদ্ধের এই আদর্শ নিশ্চিতকরণ ও তৎসঙ্গে জনগণের ইস্পাত কঠিন ঐক্য গড়ে তোলার মাধ্যমে লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব সংরক্ষণ এবং যাবতীয় আধিপত্যবাদ ও আগ্রাসী তৎপরতার মোকাবেলায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

২. জনপ্রতিনিধিত্বশীল ও জবাবদীহিমূলক সরকারঃ অবাধ ও নিরপেক্ষ ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরাই সরকার পরিচালনা করবে এবং সরকার তার সব কর্মকান্ড পরিচালনার ব্যাপারে জনগণের কাছে দায়ী থাকবে। রাষ্ট্র পরিচালনায় সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে।

৩. মানবাধিকার সংরক্ষণঃ সকল মানুষই জন্মগতভাবে স্বাধীন ও সমান। আইনের কাছে সবাই সমান। কাউকে নির্যাতন, অমানুষিক অথবা অবমাননাকর আচরণ অথবা শাস্তি ভোগে বাধ্য করা যাবে না। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, নারী-পুরুষ, ভাষা, জাতীয়তা, জন্ম এবং রাজনৈতিক মতাদর্শ নির্বিশেষে প্রত্যেক মানুষের সকল মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ করা হবে।

৪. সুবিচার ও স্বাধীন বিচার ব্যবস্থাঃ সামাজিক ন্যায়বিচার ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় বিচারব্যবস্থার গুরুত্ব অপরিসীম। স্বল্প ব্যয়ে দ্রুত সুবিচার পাওয়ার নিশ্চয়তা একটি উন্নত বিচারব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য। একটি কার্যকর, স্বাধীন ও সুদক্ষ বিচার ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

৫. মাতৃভাষা ও সংস্কৃতিঃ বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। মাতৃভাষাই জ্ঞান অর্জন ও ভাব বিনিময়ের সর্বোত্তম বাহন। তাই বাংলা ভাষা এবং বাংলা সাহিত্যের উন্নয়নের জন্য বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। সরকারি কাজে বাংলা ভাষা ব্যবহারের বিষয়ে অধিকতর গুরুত্ব দেয়া হবে। সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশ, সুন্দর রুচিশীল বিনোদন ও খেলাধূলার প্রসার এবং উন্নয়নের ব্যবস্থা করা হবে। নৈতিকতাবর্জিত অসুস্থ- অপসংস্কৃতি নির্মুলে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহন করা হবে।

৬. সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও ধর্মীয় অধিকারঃ বাংলাদেশে বসবাসরত সকল ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মৌলিক, মানবিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক অধিকারসমূহ সংরক্ষণ এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি সুনিশ্চিত করা হবে।

৭. শিক্ষা সংস্কারঃ ইসলামী মূল্যবোধের ভিত্তিতে শিক্ষা ব্যবস্থাকে সংস্কার করা হবে। জ্ঞান-বিজ্ঞান ও আধুনিক তথ্য- প্রযুক্তি শিক্ষাকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হবে। শিক্ষার লক্ষ্য হবে একটি উন্নত নৈতিক মানসম্পন্ন, বিজ্ঞান মনস্ক ও দক্ষ জাতি গড়ে তোলা। বিনামূল্যে উচ্চ মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত শিক্ষার ব্যবস্থা করা হবে। উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে উন্নত মান সংরক্ষণ ও পর্যাপ্ত গবেষণার ব্যবস্থা করা হবে। আলিয়া ও কওমী মাদ্রাসা শিক্ষাকে যথাযথ মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি প্রদানসহ এর মানকে আরো উন্নত করা হবে। শিক্ষাক্ষেত্রে বেসরকারি খাতকে আরো কার্যকর ও গতিশীল করা হবে। বৃত্তিমূলক শিক্ষার উপর যথাযথ গুরুত্ব প্রদান করা হবে। উপযুক্ত শিক্ষক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে। শিক্ষা উপকরণ সহজলভ্য করা হবে। শিক্ষার অবকাঠামো উন্নয়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

৮. সৎ ও দক্ষ প্রশাসনঃ একটি সৎ, দক্ষ ও গণমুখী প্রশাসন উন্নত জাতি গঠনের জন্যে অপরিহার্য। তাই দুর্নীতিমুক্ত, দক্ষ, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতামূলক এবং গণমুখী প্রশাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলার যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

৯. জনকল্যাণমুখী অর্থ ব্যবস্থাঃ বাংলাদেশে এমন একটি অর্থব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে যা জনগণের উৎপাদন ক্ষমতার সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহারের সাথে সাথে সম্পদের সুষম বন্টনও নিশ্চিত করবে। সুদ ব্যবস্থার অবসান এবং যাকাত ব্যবস্থার বাস্তবায়ন করা হবে, যাতে সমাজের কেউ অভুক্ত না থাকে এবং কোথাও কোনো অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়ে না উঠে। সব ধরণের দুর্নীতি কঠোর হস্তে দমন করা হবে। দেশকে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে একটি উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

১০. প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাঃ বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা বাহিনীসমূহকে সকল দিক থেকে আরও শক্তিশালী করার সাথে সাথে গোটা জাতিকে প্রতিরক্ষা কাজে প্রস্তুত রাখার উদ্দেশ্যে স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসা ছাত্রসহ সব সম নাগরিকদের দুই বছর মেয়াদী সামরিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে।

১১. পররাষ্ট্রনীতিঃ পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তি হবে রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে সমতা ও সমঅধিকারের ভিত্তিতে পারস্পরিক সম্পর্কের উন্নয়ন। “সকলের প্রতি বন্ধুত্ব, কারো প্রতি বিদ্বেষ নয়” এ নীতি নিষ্ঠার সাথে পালন করা হবে। ভ্রাতৃপ্রতিম মুসলিম দেশসমূহের সাথে বিশেষ সৌহার্দমূলক সম্পর্ক গড়ে তোলা হবে। প্রতিবেশী রাষ্ট্রসমূহের সাথে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা হবে। আধিপত্যবাদ ও সম্প্রসারণবাদের বিরোধিতা, জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সকল মজলুম জাতিসমূহের পাক্ষাবলম্বন এবং তাদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের সংগ্রামের প্রতি পূর্ণ সমর্থন থাকবে।

১২. গণ-মাধ্যমের স্বাধীনতাঃ রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হবে। সাংবাদিকদের অধিকার নিশ্চিত করা, সাংবাদিকতার মানোন্নায়নে এবং সংবাদ মাধ্যমের অপব্যবহার রোধে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহন করা হবে। সামাজিক যোগযোগ মাধ্যমের ইতিবাচক চর্চা অবাধ করা ও নেতিবাচক চর্চার কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও সাইবার অপরাধ দমনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহন করা হবে।

১৩. কৃষি উন্নয়ন ও ভূমি ব্যবস্থাপনাঃ বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ। কৃষি উন্নয়নের লক্ষ্যে কৃষি ক্ষেত্রে ব্যাপক গবেষণার উদ্যোগ নেয়া হবে। কৃষি জমি সংরক্ষণ ও ভূমির ঊর্বরতা অনুয়ায়ী কৃষি জমির শ্রেনিবিন্যাস করা হবে। কৃষি উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্যে কৃষকদের বিনা সুদে ঋণ দান, কৃষি উপকরণে পর্যাপ্ত ভর্তুকি প্রদানের ব্যবস্থা করা হবে। নতুন জেগে উঠা চর ও সরকারি খাস জমি ভূমিহীন ও ছিন্নমূল চাষীদের মধ্যে বণ্টন নিশ্চিত করা হবে। দিনমজুরদের স্বার্থ সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করা হবে। ভূমি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বিরাজমান দুর্নীতি ও জটিলতা দূর করা হবে এবং ভূমির মালিকানা সংশ্লিষ্ট আইনী প্রক্রিয়া সরলীকরণ এবং ওয়ানস্টপ সার্ভিস চালু করা হবে।

১৪. শিল্পোন্নয়নঃ জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্যে প্রয়োজনবোধে সরকারি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করার ব্যবস্থা রেখে বেসরকারি সেক্টরকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হবে। দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকে উৎসাহিত করার জন্য পদক্ষেপ নেয়া হবে। দেশের শিল্পায়ন ও শিল্প-কারখানা পরিচালনার ক্ষেত্রে বাস্তবসম্মত এবং দেশ ও জনগণের স্বার্থানুকূল নীতি-পলিসি অনুসরণ করা হবে। এক কথায় দ্রুত দেশকে একটি আধুনিক শিল্পোন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

১৫. গ্রামীণ উন্নয়নঃ গ্রামই বাংলাদেশের প্রাণকেন্দ্র। দেশের ৯০ শতাংশ মানুষের বাস গ্রামে। অবহেলিত গ্রামে কর্মসংস্থানের সুযোগ না পেয়ে শহরমুখী জনস্রোত ক্রমেই বেড়ে চলেছে। গ্রামের উন্নয়ন হলে বাংলাদেশের ৯০ ভাগ উন্নয়ন হয়েছে বলে ধরে নেয়া যায়। গ্রামীণ উন্নয়নের লক্ষ্যে গ্রামে গ্রামে উন্নত মানের কৃষি, মৎস্য ও গবাদিপশু খামার, কৃষি নির্ভর শিল্প, কুটির শিল্প প্রভৃতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে গ্রামীণ কর্মসংস্থান বৃদ্ধিমূলক কর্মসূচি অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে গ্রহণ করা হবে।

১৬. কল্যাণমুখী শ্রমনীতিঃ শ্রমিকদের সম্মানজনক জীবনধারণের উপযোগী বেতন-ভাতার ব্যবস্থা করা হবে। তৎসঙ্গে তাদের বাসস্থান ও চিকিৎসা সুবিধা, ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ার সুযোগ ইত্যাদিরও ব্যবস্থা করা হবে। শিল্প-কারখানার মালিকানায় শ্রমিকদের অংশীদারিত্বের ব্যবস্থা থাকলে শিল্পক্ষেত্রে শুভ ফল বয়ে আনবে। শ্রমিক-মালিক বিরোধে যাতে উৎপাদন ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত না হয় আবার শ্রমিকদের ন্যায়সংগত অধিকারও যাতে আদায় হয় তার জন্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। যাবতীয় শ্রম শোষণ বন্ধ করা হবে এবং সুস্থ গঠনমূলক ট্রেড ইউনিয়নকে উৎসাহিত করা হবে।

১৭. মানব সম্পদ উন্নয়নঃ একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ জাতি গঠনের জন্যে দেশে নৈতিকগুনসম্পন্ন দক্ষ মানব সম্পদ গড়ে তুলতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহন করা হবে। যুবকদের কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে কারিগরি শিক্ষা বিস্তার এবং বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টির অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে। সাথে সাথে দেশ জুড়ে কুটির শিল্প ও ক্ষুদ্র শিল্প বিস্তারে উদ্যোগ গ্রহণ এবং ঋণ সহায়তা কর্মসূচি চালু করা হবে।

১৮. প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদের সুরক্ষাঃ দেশের সর্বপ্রকার খনিজ সম্পদের মালিক জনগণ। এই সম্পদকে বিদেশীদের লুটপাট থেকে রক্ষা ও দেশের উন্নয়ন ও কল্যাণে যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে। দেশের প্রতিটি খনিজ সম্পদের সঠিক ব্যবহারের জন্যে জাতীয় খনিজ নীতি প্রণয়ন করা হবে। দেশে নতুন নতুন খনিজের অনুসন্ধান ও জরিপের উপযুক্ত পদপে গ্রহণ করা হবে।

১৯. নারী ও শিশু অধিকার সংরক্ষণঃ দেশে মোট জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। নারী সমাজের সামগ্রিক উন্নয়নের লক্ষ্যে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো হবে। যৌতুক প্রথাসহ নারী নির্যাতনমূলক সকল প্রকার কার্যকলাপকে কঠোরভাবে দমন করা হবে। শিশু নির্যাতন, শিশু শ্রম বন্ধ করে শিশুদের সহজাত বিকাশের মাধ্যমে আগামী দিনের উপযুক্ত নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা হবে।

২০. স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণঃ স্বাস্থ্যসেবাকে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছানো হবে এবং স্বাস্থ্য রাক্ষায় যথাযথ গুরুত্ব আরোপ করা হবে। দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্যে সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা হবে। দেশে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে চিকিৎসা ব্যবস্থাকে উন্নত করার পদক্ষেপ নেয়া হবে। সামাজিক ও পারিবারিক বন্ধন সুদৃঢ় করে সামাজিক ও পারিবারিক অবক্ষয় রোধ এবং ছোটদের স্নেহ, বড়দের সম্মান ও পিতা-মাতার অধিকার নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।

২১. মাদকদ্রব্য ও মাদকাশক্তি নির্মুলঃ সামাজিক অবক্ষায় রোধে যুবক-যুবতী, তরুণ-তরুণীদের মাদকাশক্তি থেকে ফিরিয়ে সুস্থ্য ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার উপরে বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হবে। ভয়াবহ ও মারাত্মকব্যাধি মাদকাশক্তি নির্মুলে সব ধরনের মাদকদ্রব উৎপাদন, আমদানি ও সরবরাহ রোধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

২২. সামাজিক নিরাপত্তাঃ সমাজের সকল মানুষের মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। যার অভিভাবক নেই রাষ্ট্রই তার অভিভাবক- এ নীতির ভিত্তিতে ইয়াতিম, বৃদ্ধ- বৃদ্ধা, বিধবা, শারিরীক প্রতিবন্ধী, মানসিক প্রতিবন্ধী (অটিস্টিক), পথশিশু ও নি:স্ব মানুষের অধিকার সুনিশ্চিত করা হবে।

২৩. তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার ও নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থাঃ বর্তমান বিশ্বে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি উন্নয়নের অন্যতম প্রধান উপাদান হিসেবে স্বীকৃত। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি দ্রুত পরিবর্তনশীল। দেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, কৃষি, বাণিজ্য, প্রশাসন, প্রতিরক্ষাসহ সকল ক্ষেত্রে গতিশীলতা বৃদ্ধি, উন্নয়ন ও স্বচ্ছতার জন্যে আধুনিক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে। সারাদেশের সড়ক, নৌ, বিমান ও রেল যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আধুনিক, বিস্তৃত ও নিরাপদ করার যথাযথ উদ্যোগ গ্রহন করা হবে।

২৪. স্থানীয় সরকার ও সুষম উন্নয়নঃ দেশের সব অঞ্চলের সুষম উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ ও স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী ও গতিশীল করার পদক্ষেপ গ্রহন করা হবে। নির্বাচিত ও কার্যকর ক্ষমতার অধিকারী সকল পর্যায়ে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।

২৫. পরিবেশ ও জলবায়ু সুরক্ষাঃ বৈশ্বিক আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। পৃথিবীর সামগ্রিক উষ্ণতা বেড়েই চলছে। ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতাও বৃদ্ধি পাচ্ছে যা ভবিষ্যৎ পৃথিবী ও মানব জাতির জন্যে এক মারাত্মক হুমকী। এ অবস্থা মোকাবেলায় কার্বণ নির্গমনের হার কমানো, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণসহ প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ এবং এ উদ্দেশ্যে আন্তর্জাতিক ফোরামে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখা হবে।

শেষ কথাঃ 

আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, খেলাফত মজলিস রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে এসব অঙ্গীকার বাস্তবায়নের চেষ্টা করবে। সামাজিক বৈষম্য, অর্থনৈতিক শোষণ, রাজনৈতিক নিপীড়ন, হানাহানি, সাংস্কৃতিক নৈরাজ্য ও দেউলিয়াপনা এবং বৈদেশিক আধিপত্যের অবসানে গোটা সমাজ ব্যবস্থাকে ইসলামের আলোকে পুনর্গঠন করবে। আর এমন একটি সোনালী দিনের অপেক্ষায় আছে গোটা জাতি।

লেখক: সহ-সাধারণ সম্পাদক, খেলাফত মজলিস, লন্ডন মহানগরী।