খিদমাহ ব্লাড ব্যাংক : একটি অনুপ্রেরণার নাম

একুশে জার্নাল

একুশে জার্নাল

জুলাই ২০ ২০১৯, ২৩:২৪

মুস্তাকিম আল মুনতাজ

‘সৃষ্টির সেবায় স্রষ্টার সন্তুষ্টি’ এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে একঝাঁক মানবতাপ্রেমী মানুষের নিরলস প্রচেষ্টায় গড়ে উঠেছে রক্তদানকারী স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন খিদমাহ ব্লাড ব্যাংক। যাদের সুনাম অল্প দিনে ছড়িয়ে পড়েছে দিকদিগন্তে। রক্তের অভাবে অকালে যেন কারও প্রাণ ঝরে না যায়, সে প্রচেষ্টাই করে যাচ্ছে খিদমাহ ব্লাড ব্যাংক এবং তার স্বেচ্ছাসেবীরা। এছাড়াও জনসচেতনতার লক্ষ্যে রক্তদানে উদ্বুদ্ধকরণসহ বিভিন্ন স্থানে বিনামূল্যে ফ্রি রক্তের গ্রুপ নির্ণয় ক্যাম্পিং করে যাচ্ছে সংগঠনটি। রক্তদান একটি মহৎ কাজ। আর এই মহৎ কাজ তথা আমাদের এক ব্যাগ রক্তদান হাসি ফোটাতে পারে একজন মায়ের, একজন বাবার, একজন স্ত্রীর, একজন সন্তানের মুখে। হয়তো আমাদের রক্তে বেঁচে যেতে পারে একটি জীবন কিংবা একটি পরিবারের একমাত্র উপার্জনের বাহক। তাই রক্তদানকে তুচ্ছ মনে করা নেহায়েত বোকামি ছাড়া কিছুই নয়। অনেক সময় রক্তের অভাবে মানুষের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে, যা খুবই হৃদয়বিদারক। আর এ হৃদয়বিদারক ঘটনা যেন না ঘটে সে জন্যই যাত্রা শুরু হয়েছে খিদমাহ ব্লাড ব্যাংকের। যার প্রধান কার্যালয় সিলেট।

বর্তমানে সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সর্বমহলে পরিচিত একটি নাম ‘খিদমাহ ব্লাড ব্যাংক’। আর এই খিদমাহর প্রতিষ্ঠা কবে কীভাবে শুরু হয়েছে জানতে চাওয়া হলে খিদমাহ ব্লাড ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, মারকাযুল হিদায়া সিলেটের স্বনামধন্য শিক্ষা সচিব, মানবসেবী প্রবীণ আলেম, সাহিত্যিক, মাওলানা আবদুর রহমান কফিল বলেন, ২০১৬ সালের জুন মাসে ফেসবুক মারফত জানতে পারলাম, চট্টগ্রামের বিশিষ্ট আলেম ও লেখক মাওলানা লিসানুল হক শাহরুমীর স্ত্রী রক্তের অভাবে ইন্তেকাল করেছেন। মাত্র ৫ ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন ছিল তার। কিন্তু এক ব্যাগ রক্তও ম্যানেজ করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। সময়মতো রক্ত সরবরাহ করতে না পারায় শেষ পর্যন্ত তিনি চলে গেছেন না ফেরার দেশে। ঘটনা শুনে আমি শিউরে উঠি। প্রচ- ধাক্কা লাগে হৃদয়ে। তখন থেকেই মূলত রক্ত ডোনেশন চিন্তা মাথায় আসে। অবশেষে ১৩ আগস্ট ২০১৬ আনুষ্ঠানিকভাবে খিদমাহ ব্লাড ব্যাংকের যাত্রা শুরু হয়।

খিদমাহ ব্লাড ব্যাংকের কর্মপদ্ধতি জানতে চাইলে মাওলানা আবদুর রহমান কফিল জানান, আমিসহ আমাদের প্রায় প্রত্যেক সদস্যই কর্মজীবী। এর মধ্যে অধিকাংশ সদস্য মাদ্রাসা বা স্কুল-কলেজের ছাত্র। এ ক্ষেত্রে আমাদের কর্মপদ্ধতি হলো, রক্তের গ্রুপ হিসেবে সদস্যদের তালিকা আমাদের হাতে থাকে। কে কবে রক্ত দিয়েছেন তাও লিস্ট আছে। আমাদের সব শাখায় দায়িত্বশীল ব্যক্তি নির্দিষ্ট করা আছে। দায়িত্বশীলদের কাছে রক্তের জন্য ফোন এলে তালিকা দেখে যাদের রক্তদানের সময় হয়েছে তাদের ফোন করা হয়। সময়-সুযোগ মতো তাদের দায়িত্বশীলরা হাসপাতালে নিয়ে যান এবং খিদমাহটুকু করে আসেন।

কাজের বিবরণ ও পরিধি কতটুকু জানতে চাইলে খিদমাহ ব্লাড ব্যাংকের একজন দায়িত্বশীল জানান, আমাদের পরিধি খুব বেশি বড় না হলেও একদম ছোট নয়। সিলেটের প্রধান শাখা ছাড়াও জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে আরও ১১টি শাখা রয়েছে। আরও বেশ কয়েকটি শাখা প্রক্রিয়াধীন আছে। এখনও আমরা চাহিদা মতো সেবা দিতে পারছি না। আমাদের সদস্যদের তুলনায় চাহিদা সবসময় অনেক বেশি থাকে। সব শাখা মিলে প্রতি মাসে গড়ে ৫৫-৬০ জনকে সেবা দেওয়া হয়। মূলত আমরা এখন রক্তদানের পাশাপাশি সচেতনতা তৈরির বিষয়টিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। সবাই যদি আমরা সচেতন হই, তাহলে দেখা যাবে নিজেদের প্রয়োজন পরিমাণ রক্ত আমরা নিজেদের থেকেই সংগ্রহ করতে পারছি। এ জন্য আমরা বিভিন্ন স্থানে বিনামূল্যে ক্যাম্পিংয়ের আয়োজন করে থাকি। সেখানে রক্তের গ্রুপ নির্ণয়ের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে সচেতন করি। এর দ্বারা আমাদের সদস্য সংগ্রহের কাজটিও সহজ হয়ে যায়। এর ভালো ফলও আমরা লক্ষ করছি। জানা যায়, খিদমাহ ব্লাড ব্যাংকের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হলো দেশের প্রত্যেক জেলায় জেলায় মানুষের কাছে সেবা পৌঁছানো। দেশের কোনো মানুষই যেন রক্তের অভাবে মারা না যায় তা নিশ্চিত করা।

“বাংলাদেশে প্রতি বছর আনুমানিক ১০ লাখ ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন হয়। দেশে মানুষ আছেন ১৮ কোটি। ছোট্ট, বয়স্ক এবং অসুস্থ যদি ১০ কোটি মানুষও হয়, তাহলে সুস্থ মানুষ আছেন ৮ কোটি। একজন মানুষ প্রতি বছর ৩ বার রক্ত দিতে পারেন। সে হিসাবে মাত্র ৪ থেকে ৫ লাখ মানুষও যদি স্বেচ্ছায় রক্তদানের জন্য তৈরি হন তাহলে রক্তের অভাব থাকার কথা নয়।”

তাই আসুন! নিজে রক্তদান করি এবং অন্যকে রক্তদানে উৎসাহিত করি। রক্তের অভাবে যেন আর কোনো জীবন ঝরে না যায় সে জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই। সর্বোপরি, খিদমাহ ব্লাড ব্যাংকের এমন কাজকে সাধুবাদ জানাই।

 

লেখক: জয়েন্ট সেক্রেটারি,খিদমাহ ব্লাড ব্যাংক