করোনায় মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে বাংলাদেশ

একুশে জার্নাল

একুশে জার্নাল

আগস্ট ১১ ২০২০, ১৪:০৪

ডা. রিফাত আল মাজিদ: বিশ্বমহামারী করোনা ভাইরাসের প্রকোপে বাংলাদেশ স্থির হয়ে ছিলো কয়েক মাস। প্রায় ২ হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে। কিন্তু আরেক নীরব ঘাতক আমাদের যুব সমাজকে গ্রাস করছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বিশ্বে প্রতি ৪০ সেকেন্ডে একজন মানুষ আত্মহত্যা করেন। বিশেষ করে, ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে এর প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। মানুষের কাছে সবচেয়ে প্রিয় বস্তু হচ্ছে তার জীবন । কিন্তু মানসিক সমস্যাগুলোর সঠিক চিকিৎসার অভাবে এবং নিজের মনোজগতে পাওয়া কঠিন আঘাতগুলো নিজের মধ্যে রাখতে রাখতেই সেই মূল্যবান জীবন ও কারো কাছে তুচ্ছ লাগতে পারে।

এখানে এ প্রসঙ্গে বলে রাখা ভালো, জাতিসংঘের ঘোষণায় বলা হয়েছে, “No health without mental health, No sustainable development goals (SDG) achievement without mental health.”

বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার কারণে আত্মহত্যা প্রবণতা আশংকাজনক হারে বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, প্রতি বছর ১১ হাজারেরও বেশি মানুষ আত্মহত্যা করেন এদেশে। বিশ্বের অধিকাংশ দেশে পুরুষদের আত্মহত্যার পরিমাণ বেশি হলেও বাংলাদেশে এর চিত্র উল্টো।

স্পষ্টতই বোঝা যায়, আমাদের মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে যতটুকু সচেতনতা প্রয়োজন, ততটুকু সচেতন আমরা নই। বাস্তবিকই, এখনো সমাজের প্রতিটি স্তরে মানসিক সমস্যাগুলো নিয়ে আমরা ঠাট্টা করি! হাসি-তামাশার মধ্যে আমরা মানুষকে বলি ‘সাইকো’, ‘ম্যানিক’, ‘পাগল’ ! এখনো আমাদের অনেকেই মনে করেন, একটু ঘুরে আসলেই বিষণ্নতা ভালো হয়ে যায়; ভাবেন, মানসিক রোগ বলতে আসলে কিছুই নেই। কেউ মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের কাছে পরামর্শ নিতে গেলে, তাকে বিদ্রুপ করতে আমরা ছাড়ি না!

দেশে মানসিক রোগীর সংখ্যা বাড়ছে

পল্লী এলাকার চাইতে নগরে মানসিক রোগীর সংখ্যা যেমন বেশি, তেমনি বেশি চিকিৎসা গ্রহণের হারও।এর পিছনে মূলত দায়ী করা যায় – নগরায়নের চাপ, আমাদের শহরের অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ ও মানসিকতার অসামাঞ্জস্যতা, এবং প্রত্যাশার চাপ বৃদ্ধি।

দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া না হলে ২০৩০ সালের মধ্যে বিষণ্নতা বিশ্বের প্রধান রোগ হয়ে উঠবে। আমাদের দেশে বিষণ্ণতাকে প্রাণঘাতী সমস্যা মনে করা না হলেও এটি মানুষের চিন্তা ও কর্মক্ষমতা নষ্ট করে দেয়। এছাড়া, দুশ্চিন্তা, সিজোফ্রেনিয়া, অ্যাসপারগারস সিন্ড্রোম, আলঝেইমারস, বাই পোলার ডিসঅরডারসহ ভয়ংকর রোগ আমাদের গ্রাস করছে।

গবেষণা বলে, নারীদের মাঝে মানসিক রোগ হওয়ার প্রবণতা পুরুষের থেকে বেশি, কিন্তু ভ্রান্ত ধারণা সংখ্যা পুরুষদের মাঝে বেশি। পুরুষ সমাজ বিষয়ে আমাদের কিছু স্টেরিওটাইপ কাজ করে, যেমন পুরুষের মনের ভাব প্রকাশ করা উচিত না, পুরুষদের কাঁদা উচিত না, তাদের সব সময় শক্ত থাকা উচিত! সমাজের এই বিশ্বাসের কারণে পুরুষদের মানসিক রোগের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। সমাজের নারীদের উপর প্রথাগত চাপ ছাড়াও, অনেকসময় নারী নিজেও দায়ী তার চিকিৎসা বঞ্চিত হওয়ার জন্য।

সামাজিক ও ধর্মীয় রীতিনীতি, অনুশাসন, ভালো বন্ধু, প্রতিবেশী ও সহকর্মীর সঙ্গে সামাজিক সুসম্পর্ক, অন্যকে অসম্মান কিংবা কষ্ট বা আঘাত না করে মনের কথা দৃঢ়ভাবে প্রকাশের যোগ্যতাও মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়নে সহায়তা করে। এ ছাড়া সুষম খাদ্য গ্রহণ, পর্যাপ্ত নিদ্রা, নিয়মিত শরীরচর্চা, ধূমপান ও মাদকাসক্তি থেকে দূরে থাকা তথা স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং শারীরিক-মানসিক যেকোনো অসুস্থতায় যথাযথ স্বাস্থ্যসেবা লাভের সুযোগ মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়ন ঘটায়।

পরিশেষে বলতে চাই আমরা আমাদের শারীরিক সমস্যার মত আমাদের মানসিক সমস্যাগুলোকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করি তাহলে এই সমস্যা থেকে অবশ্যই পরিত্রান সম্ভব। “What mental health needs is more sunlight, more candor, and more unashamed conversation.”

ডা.রিফাত আল মাজিদ
পরিচালক, সেন্টার ফর সাইকোট্রমাটোলজি এন্ড রিসার্চ