কঠিন সময়ে নিজের জীবনের থেকে বড় অনুপ্রেরণা আর হয় না

একুশে জার্নাল

একুশে জার্নাল

মার্চ ১৪ ২০১৯, ০৭:৩২

কঠিন সময়ে নিজের জীবনের থেকে বড় অনুপ্রেরণা আর হয় না। রেজাল্টের পর থেকে পুরোটা পিছন মনে পড়েছে কেন জানি।হয়ত আম্মু কেঁদেছে তাই। জানিনা। আজ কিছুটা শেয়ার করাই যায়।
এন ফর নার্স, নার্স মানে সেবিকা মানে যারা মানুষের সেবা করে। স্কুলেও ভর্তি হইনি তখন। আম্মু পড়াচ্ছিলেন। বললাম বড় হয়ে নার্স হব, মানুষের সেবা করব। বাসায় বোঝালো, ডি ফর ডক্টর। তারা আরো বেশি সেবা করতে পারেন।
ঠিকাছে তাহলে মানুষের সেবা করার জন্য ডাক্তারই হব। বয়স তখন চার।
সবই ঠিকঠাক চলছিল। পড়াশোনা এবং সব।
ক্লাস ফোরে আম্মু চাকরির জন্য ফরিদপুর চলে গেলেন। আমি আব্বুর সাথে যশোর রইলাম। সকাল ও রাতে দুবেলা রান্না করতাম। মা ছাড়া বাচ্চার বাকি সময় কাটত স্কুল, খেলার মাঠ, কার্টুন এবং অল্প পড়াশোনায়। ২য় সাময়িকী পরীক্ষায় ফার্স্ট গার্ল পঞ্চম হল। আম্মু তখনি ঠিক করেছিলেন ক্লাস ফাইভে ফরিদপুরে নিজের কাছে নিয়ে আসবেন।
ক্লাস ফাইভের শেষের দিকে শ্রদ্ধেয় শিক্ষিকা শিউলি দিদি বললেন, ইলমা, শুনলাম তোমার আম্মু নাকি গ্রামের স্কুলে ভর্তি করাবে তোমাকে? তুমি ভাল স্টুডেন্ট।গার্লস স্কুলে ভর্তি হও। গ্রামে এমন স্কুলে কেন ভর্তি হবে!
ছোট মানুষের কাছে শিক্ষকের কথাই শতভাগ মান্য। আম্মুকে বললাম গার্লস স্কুলে পড়ব। রাজি হলেন না। কারন স্কুল অনেক দূরে। ওখানে শিক্ষকদের কাছে না পড়লে পাশ নেই। খরচ চালাতে পারবেন না।
বললাম, হেঁটে যাব স্কুলে (দূরত্ব জানা ছিল না)। শিক্ষকের কাছেও পড়ব না। একাই পড়ব। তবু ভর্তি ফরম কিনে দাও।
দিলেন না।
মেঝ খালার বাসা গার্লস স্কুলের পাশে। ঘুরতে যাব বলে ওখানে গিয়ে খালামনিকে বলেছিলাম, ফর্ম কিনে দাও।
মেঝ খালার শাশুড়ি এবং জা আমার কথায় অট্টহাসি দিলেন। বললেন, ওখানে চান্স পেতে মেয়েরা এক দুই বছর কোচিং করে, ইয়ার লস দেয়, ডিসির বাসায় লাখ টাকা ঘুষ নিয়ে বসে থাকে যদি মেয়েকে ভর্তি করতে পারে। তুমি এক সপ্তাহ আগে ফর্ম তুলে কি করবা।
অনেক কিছু বুঝিনি। তবু ঐ অট্টহাসি যে অপমানকর ছিল তা হয়ত কিছুটা হলেও বুঝেছিলাম। তবু আমার আর কি বলার ছিল!!
ফর্ম তুললাম। আম্মু পরীক্ষা দেয়াতে আনলেন। প্রিপারেশন ছাড়া আমি পরীক্ষার হলে।পরীক্ষা শেষে জিগ্যেস করায় আম্মু বলল রেজাল্ট নিতে এত দূর থেকে আসবেন না। তাছাড়া চান্স পাব না। শুধু শুধু লোকে হাসবে।
ছোট মামাকে বলেছিলাম, কলেজ থেকে ফেরার পথে পারলে রেজাল্ট দেখে আসতে।
আমি ৫ম হয়েছিলাম। আম্মু সবাইকে মিষ্টি খাইয়েছিলেন।
কিন্তু ভর্তি করানোর শর্ত ছিল, হেঁটে যেতে হবে। প্রাইভেট পড়তে চাওয়া যাবে না।
তাই সই।
বাসার সবার ধারনা ছিল আমি এতখানি হেঁটে ওখানে কন্টিনিউ করতে পারব না। তাই আমাকে গ্রামের স্কুলেও ভর্তি করে রাখা হল।
বিলমামুদপুর বাসা থেকে সাড়ে তিন কিলোমিটার দূরে গার্লস স্কুল। আসতে যেতে ৭ কিলো। ক্লাস ৬ টু ৮ তিন বছর প্রতিদিন ৭ কিলো হেঁটে স্কুলে যাওয়া আসা করেছি। শিক্ষক ছিলেন না। নিজে পড়তাম।
গ্রীষ্মের কড়া রোদ, বর্ষার বজ্রপাত, শীতের কুয়াশা… আমি হেঁটেছি। হাঁটতে হাঁটতে একজোড়া কেডস জুতা ক্ষয় হয়ে যেত। রাস্তার পাথরগুড়ি ছেঁড়া অংশ দিয়ে জুতোয় ঢুকতো। ঢুকতো বৃষ্টির পানি। তবু সেই ছেঁড়া জুতো চালিয়েছি বছরের বেশি। রং নষ্ট হওয়া সত্ত্বেও একই ড্রেস পড়েছি কত বছর।
এই তিন বছর রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে কত বাস্তবতা যে শিখেছি। কষ্ট করেছি, কড়া রোদে পুড়েছি, শীতে ফিরতে সন্ধ্যা হলে ভয় পেয়েছি।
রাস্তায় চলতে কত মানুষের কত রকম কথা শুনেছি।তবু কখনো বলিনি মাত্র ১০+১০= ২০ টাকার রিকশাভাড়া দেয়ার সামর্থ্য কেন আমার পরিবারের নাই!!
ক্লাস নাইন, মেয়ে বড় হচ্ছে।এখন হাঁটতে দেয়া যায়না। টুকটাক ভাড়া দেয়া শুরু করল। ট্যাম্পুতে পাঁচ টাকা দিয়ে যাই তখন।
তবে শুরু হল নতুন সমস্যা। গার্লস স্কুলের সেকেন্ড গার্ল তো কি হয়েছে,নাইনে সাইন্স নিতে পারবে না। এতদিন একা পড়েছ, সাইন্স নিলে শিক্ষক লাগবে। সে সামর্থ নেই। কমার্সও না। আর্স নিয়ে পড়। শিক্ষক লাগবে না।
জিদ ছিল। তাছাড়া আমি এক কথার মানুষ। সাথে স্বপ্নচারী। ডাক্তার হতে হলে সাইন্স নিতে হবে। নিলাম।
তখন নতুন সৃজনশীল পদ্ধতি। শিক্ষকদের করা কঠিন প্রশ্ন। ১ম সাময়িকী পরীক্ষা শেষে রসায়নের স্যার বলেছিলেন, আমার কাছে পড়েও মেয়েরা খারাপ করেছে। তুমি নিজে পড়ে এত ভাল করেছ আমি খুব অবাক হয়েছি। কোন সমস্যা হলে আসিও , আমি সাহায্য করব তোমাকে।
কিন্তু নিজে একা আর পড়া যাচ্ছিল না। ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, হাইয়ার ম্যাথ সিলেবাস কঠিন থেকে কঠিনতর হচ্ছে। অবশেষে বড় মামা বলেছিলেন, স্যারদের কাছে পড়া শুরু কর। আমরা সবাই দেখব।
আমার মনে আছে, আমি সব শিক্ষকদের প্রতি মাসে বেতন সময়মত দিতে পারিনি। দু তিনমাস পরপর একসাথে দিতাম। এবং এরপরেও আমার সেইসব শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের ভালবাসার বিন্দুমাত্র কমতি ছিল না। ❤️
এভাবে ক্লাস টেন তো পার হলো। শুরু হলো আবার সমস্যা। এবার প্রকট।
“এতদিন অনেক কষ্ট করেছ।এখন আর না। ইন্টারে সাইন্স নেয়া যাবে না।বাসার কাছে পলিটেকনিক কলেজে ভর্তি হও।”
মানতে চাইনি বলে গুরুজন দিয়ে বোঝানো হলো। শেষে ধমক।
আমি শুধু বলেছিলাম, এতদিন কষ্ট করেছি। কাউকে নালিশ করার সুযোগ দেইনি। তাহলে আরো দুবছর না হয় কষ্ট করলাম।
আমি যখন সারদায় ভর্তি হই, আমার বই কেনার টাকা ছিল না। একদিন কলেজের বারান্দায় দাঁড়িয়ে কেঁদেছিলাম। আমার এক বান্ধবী এক সংস্থা করত। ও আমাকে এক সেট বই কিনে দিয়েছিল তারপরে।
হ্যাঁ, দানের বই পড়েছি আমি। 🙂 দানের বই পড়ে ইন্টারে ঢাকা বোর্ড ট্যালেন্টে বৃত্তি পেয়ে পাশ করেছিলাম।
তবে সে পাশ ওত সহজে আসেনি। পুকুর থেকে সাগরে পড়ার মত স্কুল থেকে কলেজে পড়লাম। পড়া নিজে বুঝিনা। শিক্ষক ছাড়া সম্ভব না।
আম্মু স্কুল শিক্ষক ছিলেন। তাই পড়ানোর শখ ছিল, ছাত্রদের সম্মানের সালামের লোভ ছিল। আর ছিল প্রয়োজন।
২০১০সাল, এপ্রিল মাস। টিউশনি শুরু করলাম। প্রথম বেতন ছিল ৫০০টাকা মাত্র। স্যারকে বেতন দিয়ে ১০০ টাকা ফেরত পেলাম।
আমার এক মাসের কষ্টের অর্জন মাত্র কয়েক সেকেন্ডে ৫০০টাকা থেকে ১০০টাকায় রূপান্তরিত হতে দেখে আমার সমস্ত খুশি মাটি হয়ে গিয়েছিল।
তবে সেদিন আমি টাকার মূল্য বেশি ভালো বুঝেছিলাম।
পুরোটা ইন্টার আমি ভোর থেকে রাত পর্যন্ত টিউশনি করেছি। ফাঁকে নিজে পড়েছি।
ইন্টার তো পার হলো। এবার সেই স্বপ্ন পূরণের পালা। মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার সময়।
আমার স্কুলের স্যার বলেছিলেন, কেউ চান্স না পেলেও ইলমা পাবেই।
আল্লাহর কি ইচ্ছে ছিল আজো জানিনা।
প্রথমবার এএফএমসিতে হলো। সরকারি তো ১মার্কের জন্য হলো না।
আবার বাসা থেকে চাপ। এবং এবার অসহনীয়।
“ক্লাস টেনে থাকতে যে ছেলের কথা বলেছিলাম, রাজি হওনি।এবার তার সাথেই বিয়ে দিব। বেসরকারিতে পড়িয়ে নিবে।”
এ ব্যাখ্যায় যাবো না। শুধু এটুকু বলতে পারি, না করার কোন কারন না থাকা সত্ত্বেও আমি কষ্ট করাটাই বেছে নিলাম।এত কঠিন সময় সত্বেও পা থেকে মাথা পর্যন্ত সোনা গয়না আর টাকার লোভ থেকে আমাকে বিরত রাখার জন্য আল্লাহর শুকরিয়া।
তবে সমস্যা গুলো হিন্দি সিরিয়ালের মত।একটা সমাধান হতেই আরেকটা আসে।
“সেকেন্ড টাইম মেডিকেলে দেয়া যাবে না। রাজেন্দ্র কলেজে পড়। অথবা সৈনিক পদে আর্মিতে যাও, যেখানে গ্রেড ২ হলেও চলবে।” 🙂
আহা!! এত বছর কষ্ট করেছিলাম কি এ দিন দেখার জন্য!!
ঠিক এর মধ্যে ঘটে গেছে শত ঘটনা। এবং আমি আমার স্বপ্নপূরণে অটল।
শেষে শুনতে হয়েছিল, “ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে লাখ টাকার স্বপ্ন দেখ!! হা হা”
২০১৩সাল, ৬অক্টোবর সন্ধ্যা।
সুমাইয়া রহমান ইলমা
স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ
মেরিট ২৫৬
পাঁচ বছর পর,
সুমাইয়া রহমান ইলমা
পাসড এমবিবিএস ফাইনাল প্রফেশনাল এক্সাম
আল্হাম্দুলিল্লাহ, সকল শুকরিয়া এক আল্লাহর। ❤️
অনেক কিছু বলে ফেলেছি। আবার কিছুই বলিনি।
জীবনের কথা বলে শেষ করা যায় না।
আজ শুধু পড়াশোনা জীবনের শিরোনাম বলেছি। দিনগুলো কিভাবে পার করেছি, কতটা কষ্ট, ধৈর্য্য, ত্যাগ আর চোখের পানিতে দিন পার করেছি তা আমি জানি।জানে পরিবার।
খারাপ দিন বদলেছে অনেক বছর হল। ছোট ভাই না চায়তেই পায়। আমিও চাই ও আমার মত কষ্ট না করুক।
তবে, জীবন কখনোই সহজ ছিল না।
আমার পরিবারের খারাপ সময় ছিল সেটা কখনোই লজ্জার না। সেই খারাপ সময়ে থেমে গেলে সেটা লজ্জার হত।
আমি কষ্ট করেছি। কর্ম বিফলে যায়নি। বরং হয়েছে গর্বের।
আজ আমি সেই অট্টহাসি দেয়া মানুষদের কাছে আদরের ইলমা, গর্বের ডাক্তার।আজ সেই সব কঠিন সময়গুলো বলেছে, হার মেনেছি।
আজ আমি তাদের কাছেও ডাক্তার, যারা বলেছিল ‘তুই পারবি’
এখন কেউ যদি বলে, জিদ করে নিজের জন্য করেছ। অন্যের জন্য কি করলে!!
— নিজেকে উপযুক্ত করে গড়ে তুলতে না পারলে পরিবারের জন্য কিভাবে কিছু করা যায়? তারপর সমাজ ও দেশের প্রতিও তো কিছু দায়িত্ব আছে।
সুতরাং ঐ লক্ষ্যে আমি নিজেকে গড়তে দৃঢ় প্রত্যয়।
সততা ও পরিশ্রম দিয়ে শুরু করেছি। বেঁচে থাকলে কর্ম ধোঁকা দিবে না ইনশাআল্লাহ।
অনেক বড় হয়ত কিছু করিনি এখনো। তবে শুরু হলো আল্হাম্দুলিল্লাহ।