কওমি ধারার বিরুদ্ধে অভিযোগ ও বাস্তবতা

একুশে জার্নাল

একুশে জার্নাল

জানুয়ারি ২৮ ২০২১, ১৪:০৮

ওয়ালি উল্লাহ আরমান‌

নিজস্ব এজেন্ডায় বিবিসি, ডয়েচে ভেলে, একাত্তর, সময়, ডিবিসি প্রভৃতি দেশি-বিদেশি মিডিয়া নিয়মিত মুসলিম জাতিসত্তা ও ঈমান-আকিদার বিরুদ্ধে মনগড়া, ভিত্তিহীন ও কাল্পনিক নিউজ আকর্ষণীয় এবং চটকদার ভঙ্গিতে উপস্থাপন করে। যেমন, বর্তমানে তারা মাদরাসায় সমকামিতা এবং যৌন নিপীড়ন বিষয়ে সিন্ডিকেট নিউজে মুখে ফেনা তুলে ফেলছে।
কেমন অদ্ভুত একটা অবস্থা! একদিকে ওরা সমকামিতার মতো মনুষ্যত্ব বিবর্জিত বিকৃত যৌনাচারের সমর্থক। আবার ওরাই সমকামিতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারী আলেম-ওলামাদের কলুষিত করতে প্রতিনিয়ত মিথ্যা নিউজ করে। কিন্তু ক’দিন যাবত আমাদের বন্ধুরূপী মহল থেকেও এ জাতীয় অভিযোগ তোলা হচ্ছে।

এ বিষয়ে কথা বলার আগে অন্য একটি প্রসঙ্গে সামান্য আলোকপাত করতে চাই;
যারা ১৯৭১ সালে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিতে জালেমের বিরুদ্ধে মজলুমের, শোষকের বিরুদ্ধে শোষিতের স্বাধীনতার দাবীতে সংঘটিত মহান মুক্তিযুদ্ধের কেবল বিরুদ্ধে বলেইনি, বরং বিভিন্ন বাহিনীর নামে স্বাধীনতাকামীদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য ও গোপন তৎপরতাও চালিয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে ধর্ষণ-লুটপাটের অভিযোগ অপ্রমাণিত এবং প্রশ্নবিদ্ধ হলেও স্বাধীনতা বিরোধী অবস্থানের কথা সুবিদিত।
কিন্তু আজ অবধি আমাদের অঙ্গনের গুটিকয়েক ব্যক্তি ব্যতীত বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ জালেমের দোসর হয়ে অপকর্মের সহযোগী হবার ব্যাপারে সামান্য টু শব্দও করে না। কারণ ‘স্বাধীনতা বিরোধী’ শব্দটি অনেক সময় রাজনৈতিক ফায়েদা হাসিলে ব্যবহার করা হয়। হ্যাঁ, তাদের আকিদায় কিছু ভ্রান্তির কথা বলেন। যদিও এখন সেই বলার মাত্রাও একদম কমে গেছে। এই কমে যাবার কারণেই সম্ভবত তারা বন্ধু সেজে আমাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে শেকড় কাটার চেষ্টা চালাচ্ছে।

আমাদের বিস্ময়ের সীমা থাকে না, যখন দেখি ইসলামী ভাবধারায় বিশ্বাসী দাবিদার কোনো সংগঠনের কর্মী-সমর্থকরা বিবিসি, ডয়েচে ভেলে আর একাত্তরের সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে কওমি অঙ্গনকে দোষারোপ ও অভিযুক্ত করে। আর আফসোস হয় যখন তাদের সাথে ফেসবুক বন্ধুত্ব আর বর্তমান রাজনৈতিক দমনপীড়নের কারণে অভিন্ন সহানুভূতি থেকে সূক্ষ্ম কওমি মাদরাসা বিদ্বেষী লেখনিতে আগপিছ না ভেবে লাইকের সাথে সাথে কমেন্টে ‘সহমত’ ব্যক্ত করে।

ইদানিং উম্মাহর শত্রু-মিত্র নির্ধারণে বিরূপ পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। সময়টা প্রতিকূল, কঠিন, আবেগ নির্ভর। নানা বিষয়ে বিরোধ আর দূরত্ব মিটিয়ে তাওহীদ-বিশ্বাস কেন্দ্রিক অভিন্ন ভাবনা, ভ্রাতৃত্ব আর সহাবস্থানের কথা বলেন অনেকে।
আমাদের আঙিনায় সাজানোগোছানো, সুন্দর, মিষ্টি মিষ্টি কথায় মানুষভুলানো, মুগ্ধ করার মতো লোক খুবই কম। কিন্তু এই ভূখণ্ডে ‘ইসলাম পরিচয়’ ধারণকারী একটি মহল এ কাজে দারুণভাবে পারদর্শী। তাদের নেটওয়ার্ক ছড়িয়ে আছে সর্বত্র। আমরা যতোই তাদেরকে ভ্রাতৃপ্রতিম ভেবে সৌজন্য আর সৌহার্দ্যের সবটুকু নিংড়ে দিই না কেন। তারা কিন্তু সুযোগ পেলেই আস্তিনে লুকানো বিষাক্ত খঞ্জরে আমাদের ঝাঁঝরা করতে একটুও কসুর করেন না। এটি হেফাজত আন্দোলন পরবর্তী এবং কওমি সনদের স্বীকৃতির সময়েও দেখা গেছে।

যখনই বিশুদ্ধ আকিদার আলোচনা করা হয় অথবা প্রশ্ন তোলা হয়, সাথে সাথে এই প্রজন্মের হুজুগে অংশ আবেগের সাগরে ডুব সাঁতার কেটে আপনার কন্ঠ স্তব্ধ করতে আপনার দিকে তেড়ে আসতে পারে। আকিদার পরিশুদ্ধতার গুরুত্ব তারাও জানে। তারাও শরহে আকায়েদ গুরুত্বের সাথে পড়ে এবং পড়ায়। যেখানে বিভিন্ন বাতিল গোষ্ঠীর পরিচয়, তাদের ভ্রান্তি তুলে ধরা এবং অপনোদনও করা হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে সেই বিশুদ্ধ আকিদার কথা বললে উঠতি, স্বীকৃত এবং প্রতিষ্ঠিত ফেবু সেলেবরা আপনাকে উম্মাহর দুশমন বানিয়ে ছাড়বে।

একটি স্মার্ট ছাত্র সংগঠনের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক সভাপতি জনাব নুর মোহাম্মদ দুদিন আগে সমকামিতা প্রসঙ্গে একটি পোস্ট দিয়েছেন। ঐ পোস্টের অসদুদ্দেশ্য প্রণোদিত লক্ষ্য উদ্দেশ্য যে কওমি অঙ্গন। এটা বুঝতে একটুও কষ্ট হবে না যে, তিনি ইনিয়ে বিনিয়ে কওমির দিকেই অভিযোগের তীর ঘুরিয়েছেন।

প্রশ্ন হলো, ভাস্কর্য ইস্যুতে ওলামায়ে কেরাম সরব ও সোচ্চার হবার পর থেকে ক্রমাগত শাহবাগী, নাস্তিক-মুরতাদ ও সেক্যুলাঙাররা কওমি আলেমদের ‘পায়ুযোদ্ধা’ অভিহিত করে নিকৃষ্ট, অসভ্য ও জঘন্য আক্রমণ করছে, তখন তিনি এবং তার ইসলামী আদর্শিক সহকর্মীরা কেন ইস্যুটিকে সামনে আনলেন?

ঐ স্মার্ট ভদ্রলোক অপরিণামদর্শী কওমি ফেসবুকারদের কাছে বেশ সমাদৃত। তিনি এমন এক ইস্যু নিয়ে পোস্ট দিয়েছেন, যে ইস্যুতে সম্প্রতি চিহ্নিত ইসলামবিরোধী গোষ্ঠী দিনের পর দিন কুৎসিত আক্রমণ করে যাচ্ছে এবং অনেকদিন ধরে মিডিয়াও সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট প্রচারণা করেই চলেছে, সেই ইস্যুকে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে কওমি অঙ্গনকে অভিযুক্ত করলেন আর এখানকার কেউ কেউ আগপিছ না ভেবে সমর্থনের ঢেউ তুলছে!
কদিন আগে জনাব মোখলেসুর রহমান ‘কেবলমাত্র কওমি মাদরাসায় দ্বীন চর্চা হয় কীভাবে?’ শীর্ষক একটি পোস্ট দেন। সেখানেও মডারেট ইসলামী সংগঠনের কোনো কোনো কর্মী-সমর্থক শাহবাগীদের ভাষায় কওমি শিক্ষাধারাকে আক্রমণ করেন।

সমকামিতার মতো অভিশপ্ত, ঘৃণ্য এবং বর্জনীয় অপকর্মকে হালকা করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। এটাও সত্যি যে, খারাপ লোক সমাজের সর্বত্র কমবেশি ছিলো, আছে, থাকবে। প্রশ্ন হলো, এটা টলারেট করা হয় কিনা? অথবা অবক্ষয়ের এই ধারা কোথায় কতোটুকু?

একজন কওমি সংশ্লিষ্ট হিসেবে আমি দায়িত্ব নিয়ে দৃঢ়তার সাথে বলছি, বাংলাদেশের কোনো কওমি মাদরাসায় এমন দুর্ঘটনা ঘটার সাথে সাথে কর্তৃপক্ষ তড়িৎ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। যদিও এমন ঘটনার হার খুবই কম। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায় ভেতর অথবা বাহির থেকে প্রাতিষ্ঠানিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা, কারো ওপর প্রতিহিংসা চরিতার্থ অথবা শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রকে শাস্তি প্রদানের পর শিক্ষককে জব্দ করতে এমন অভিযোগ তোলা হয়। তারপরেও এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবার সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে, এর সাথে দ্বিমত পোষণের কোনো কারণ নেই।

কওমি মাদরাসার ওপর অযাচিত এবং ঘৃণ্য আক্রমণের জবাবে আমরা আলিয়া মাদরাসা অথবা স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়কে আমাদের লক্ষ্যবস্তু বানাবো না। কিন্তু সমাজের একটি অংশের উপরে সামগ্রিকভাবে দোষারোপের আগে প্রত্যেকের নিজ নিজ অবস্থান এবং তৎপরতা ও কার্যক্রম চিন্তা করা উচিত।