ওয়েলকাম টু দ্যা ডেজার্ট অফ রিয়ালিটি

একুশে জার্নাল

একুশে জার্নাল

ফেব্রুয়ারি ০৫ ২০১৯, ০৮:২১

মনোয়ার শামসী সাখাওয়াত: স্টার জলসা, জি বাংলা আর স্টার প্লাসের সোপ অপেরা হাল জামানার মাস মিডিয়ার কনজিউমারিস্ট প্রোডাক্ট। পরিবেশনার চমৎকারিত্বে, চোখধাঁধানো আতিশয্যে, নাটকীয় সাসপেন্সে, ক্যামেরা, এডিটিং ও ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের কলাকৌশলে এগুলি আজকাল দারুণ জনপ্রিয় শো বিজ আইটেম। ফ্যাশনেবল গ্ল্যামারাস সেক্সি আবেদনে এর তারকারা হয়ে ওঠে এর দর্শকদের কাছে পরম আকাঙ্ক্ষিত বা আকাঙ্ক্ষিতা। বিশেষ করে আমাদের বেডরুমের বা ড্রয়িং রুমের সহজেই ইম্প্রেসেবেল নারীকুল এই শো বিজের চৌম্বকীয় আকর্ষণের শিকার হয়ে যায়।

এর মনস্তাত্ত্বিক দিকটি হল আপনি শুধু এইসব সোপ অপেরার ফর্ম, স্টাইল, গ্ল্যামার, ফ্যাশন ইত্যাদির নিরীহ এপ্রিশিয়েশনেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখতে পারবেন না। আপনি এর কনটেন্ট দিয়েও এক পর্যায়ে প্রভাবিত হয়ে পড়বেন। কিভাবে? এই যে দাম্পত্য ও পারিবারিক জীবনকে ঈর্ষা, হিংসা, পরশ্রীকাতরতা, ছলনা, শঠতা, প্রতারণা, প্রবঞ্চনা, বিশ্বাসঘাতকতা ইত্যাদির মধ্য দিয়ে এইসব সোপ অপেরায় লাগাতার উপস্থাপনা করা হয় সেসব অনেক অপ্রস্তুত মনে অবচেতনে প্রভাব ফেলে। ওরা ভাবতে শুরু করে যে জীবনটা বোধহয় এমনই — মানব চরিত্র আসলে রিপু আর নাফস দিয়ে বশীভূত; সুতরাং নগদ যা পাও হাত পেতে নাও, বাকীর খাতা শূন্য থাক — এধরণের যেকোনভাবে টাকা কামানো ও সম্ভোগবাদী জীবনযাত্রা ও জীবনশৈলী ওদের কাছে স্বাভাবিক ও নরম্যাটিভ বলে প্রতিপন্ন হতে থাকে। মিডিয়ার এই নিরবচ্ছিন্ন ইমেজরাশি ও জীবনশৈলী এদের নায়িভ চেতনাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে, অধিকার করে ফেলে; ফলে মনস্তাত্ত্বিকভাবে এই ভালনারেবল গোষ্ঠী কোন এক সময় ঐ ভার্চ্যুয়াল রিয়ালিটি দিয়ে এতই প্রভাবিত হয়ে পড়ে যে তা তার রিয়ালিটিকে চালিত করতে থাকে।

উপরে এতক্ষণ আমি যে বর্ণনা ও বিশ্লেষণ করলাম তা অনেকেই ইতিপূর্বে করেছেন। সতর্ক করেছেন। কিন্তু কোন কাজ হয়নি। ওসব বহাল তবিয়তে অব্যাহত আছে। আসলে আমরা খুব একটা অবাকও হই না। কারণ এভাবেই চলছে। যাদের বলার তারা বলেই যাচ্ছে, আর যাদের ওসব না শুনে শুধু করেই যাওয়া তারা করেও যাচ্ছে। তো এত কথা কেন বলা? বলা একারণেই যে, এই যে মিডিয়া সৃষ্ট ভার্চ্যুয়াল রিয়ালিটি সোপ অপেরার কথা বললাম — কয়েকদিন আগে যেন তাকেও ছাপিয়ে গেছে আকাশ আর মিতুর রিয়ালিটি সোপ অপেরা। হ্যাঁ, এ যেন রিভেঞ্জ অফ দ্য রিয়ালিটি ওভার ভার্চ্যুয়াল রিয়ালিটি।

১৯৯১ সালে জর্জ বুশ সিনিয়র কুয়েত দখলমুক্ত করার অজুহাতে সাদ্দাম হোসেনের ইরাকের বিরুদ্ধে যে প্রথম গালফ ওয়ার শুরু করেছিলেন সেটি ছিল প্রথম ভার্চ্যুয়াল রিয়ালিটি ওয়ার। জঁ বদরিলার এই যুদ্ধের বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বলেছিলেন এই যুদ্ধ প্রতিপাদন করেছিল যে ভার্চ্যুয়াল রিয়ালিটি ইজ মোর দ্যান রিয়ালিটি ইটসেলফ। অর্থাৎ তিনি বলতে চেয়েছিলেন যে বাস্তবের যুদ্ধের চাইতেও টেলিভিশনের স্ক্রিনে বিশ্ববাসী যে যুদ্ধ দেখেছিল সেটাই ছিল বেশি প্রভাবক। অনেকটা একইরকমভাবে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরে নিউ ইয়র্কের টুইন টাওয়ারে যে বিমান আক্রমণ হয়েছিল সেটার একটি ইন্টারেস্টিং মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন স্লাভজ জিজেক। তিনি লিখেছেন হলিঊডের বিভিন্ন একশন থ্রিলার সিনেমা যেভাবে আমেরিকা বা পৃথিবীতে মহাদুর্যোগ বা মহাবিপর্যয় নেমে আসতে পারে বলে দেখিয়েছে সেসব সিনেমায় যে ভার্চ্যুয়াল রিয়ালিটি তৈরি হয়েছে সেসব দেখে আমেরিকা যেন ৯/১১ এর ঘটনাবলীকে আগেই এন্টিসিপেট করে নিয়েছিল। কাজেই ৯/১১ এর রিয়ালিটি যেন হলিউড নির্মিত ভার্চ্যুয়াল রিয়ালিটির ভবিষ্যদ্বাণীর অনিবার্য বাস্তবায়ন বা পরিপূরণ বৈ অন্য কিছু নয়।

আকাশ-মিতুর রিয়ালিটি সোপ অপেরা কি সেই রকম কিছু? অর্থাৎ এটাও কি আমরা ভার্চ্যুয়াল রিয়ালিটিতে কল্পনা করে করে এমনভাবে এন্টিসিপেট করেছি যে এর রিয়ালিটিতে চলে আসা যেন একটা ভবিষ্যদ্বাণীর অনিবার্য বাস্তবায়ন বা পরিপূরণ? ওয়েলকাম টু দ্য ডেজার্ট অফ রিয়ালিটি!

লেখক পরিচিতি: মনোয়ার শামসী সাখাওয়াত। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা বিশেষজ্ঞ হিসেবে কর্মরত। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের নাম ‘রিথিংকিং ইসলাম ইন পোস্টমডার্ন টাইমস’। তিনি সমকালীন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও শিল্প-সংস্কৃতির একজন নিবিড় পর্যবেক্ষক ও বিশ্লেষক।