এশিয়ায় চীনের প্রভাব ঠেকাতে মিশনে নেমেছেন পম্পেও

একুশে জার্নাল

একুশে জার্নাল

জুলাই ০১ ২০২০, ০৯:৫৮

দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের প্রভাব ঠেকাতে এবার মিশনে নেমেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও। এ লক্ষ্যে তিনি বাংলাদেশসহ এ অঞ্চলের দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন। এ অঞ্চলের দেশগুলোর চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে তৎপর হয়ে উঠেছে ট্রাম্প প্রশাসন।

পম্পেও বাংলাদেশ, নেপাল, শ্রীলংকার পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে পৃথকভাবে টেলিফোনে কথা বলেছেন। দৃশ্যত কোভিড-১৯ মহামারী এবং তার পরবর্তী পুনরুদ্ধারের বিষয় নিয়ে আলোচনার কথা মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর উল্লেখ করেছে। তবে ঢাকায় ওয়াকিবহাল কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, চীনের তৎপরতার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দুশ্চিন্তা দেখা দিয়েছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ঢাকার একজন পদস্থ কূটনীতিক মঙ্গলবার যুগান্তরকে বলেন, ‘পম্পেও দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে টেলিফোনে আলাপের অংশ হিসেবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন। আমরা যাতে একদিকে হেলে না যাই, সে উদ্দেশ্যেই তিনি আমাদের সঙ্গে আলাপ করছেন।’ যদিও ওই কর্মকর্তা চীনের নাম উল্লেখ করেননি।

পম্পেওর টেলিফোনের মূল উদ্দেশ্য কী-জানতে চাইলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন যুগান্তরকে বলেন, ‘এটা বোঝা মুশকিল। তবে আমাদের মধ্যে প্রায় ৪০ মিনিট আলোচনা হয়েছে। আমরা অনেক বিষয়ে কথা বলেছি। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র আমাদের দেশের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক গড়তে চায়। আমি বিশেষভাবে জোর দিয়েছি কোভিড-১৯-পরবর্তী অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবেলার প্রতি। আমি পম্পেওকে বললাম, যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতারা ৯২ মিলিয়ন ডলারের গার্মেন্টস অর্ডার বাতিল করে দিয়েছে। এতে এ শিল্পের নারীকর্মীরা বিপাকে পড়েছেন। তাই দুই বছরের জন্য শুল্কমুক্ত সুবিধা দিন। আমি এটাও বলেছি যে, রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে মিয়ানমারের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দিন। যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ীরা এখনও মিয়ানমারের সঙ্গে ব্যবসা করছেন।’

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল মোমেন যুক্তরাষ্ট্রে পলাতক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের খুনি রাশেদ চৌধুরীকে ফিরিয়ে দেয়ার জন্য পম্পেওর প্রতি বিশেষ অনুরোধ জানান।

স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগে ঢাকার আহ্বান : যুক্তরাষ্ট্রকে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ। দেশটির আইএফডিসি ফান্ডের আওতায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেওর সঙ্গে ফোনে আলাপকালে এ আহ্বান জানান। সোমবার দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ফোনালাপে এ বিষয়টির পাশাপাশি অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসে। বাংলাদেশ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বৈচিত্র্য আনতে চায় উল্লেখ করে ড. মোমেন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক জোনে যুক্তরাষ্ট্রকে বিনিয়োগেরও অনুরোধ করেন।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের হাইটেক পার্ক, তথ্য-প্রযুক্তি খাতে দক্ষ জনবল এবং বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের সহজলভ্যতার কারণে এ দেশে বিনিয়োগ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য লাভজনক হবে। ফোনালাপে ড. মোমেন যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে দু’বছর শুল্কমুক্ত সুবিধা দেয়ার অনুরোধ করেন।

তিনি উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের ক্রেতারা ক্রয়াদেশ বাতিল করায় এ খাতে কর্মরত শ্রমিকরা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। যার অধিকাংশ মহিলা। এ সময় মাইক পম্পেও উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্র করোনা মহামারী মোকাবেলায় বাংলাদেশের সাহায্যের জন্য ৪৩ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করেছে। তিনি করোনা মহামারী মোকাবেলায় বাংলাদেশের উদ্যোগের প্রশংসা করেন।

মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রত্যাবাসনে যুক্তরাষ্ট্রকে আরও দৃঢ় ভূমিকা রাখার অনুরোধ করেন ড. মোমেন।

তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের স্বদেশে ফিরিয়ে নেয়ার বিষয়ে চুক্তির বাস্তবায়নে মিয়ানমার সময়ক্ষেপণ করছে। সম্প্রতি রাখাইন প্রদেশে মিয়ানমারের সামরিক অভিযানের বিষয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এ সময় যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, যুক্তরাষ্ট্র রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা হিসেবে ৮২০ মিলিয়ন ডলার দিয়েছে। মানব পাচার রোধে টিআইপি রিপোর্টে বাংলাদেশের দ্বিতীয় ধাপে উন্নয়নের প্রশংসা করেন মাইক পম্পেও।

যুক্তরাষ্ট্রে বঙ্গবন্ধুর খুনি রাশেদ চৌধুরীকে বাংলাদেশে ফেরত এনে তার শাস্তি নিশ্চিত করার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে মাইক পম্পেওকে অনুরোধ করেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। ড. মোমেন বলেন, করোনা মহামারী সারা পৃথিবীকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। এ সমস্যা মোকাবেলায় পৃথিবীর সব দেশের পারস্পরিক অংশীদারিত্ব প্রয়োজন। এ বিষয়ে পারস্পরিক সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে বলে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী উল্লেখ করেন। টেলিফোনে আলাপকালে উভয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নের ওপর জোর দেন।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে সহায়তার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত : এদিকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ফোনালাপের বিষয়ে ঢাকার মার্কিন দূতাবাস জানিয়েছে, ফোনালাপকালে তারা যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ সম্পর্কের গুরুত্বের বিষয়টি পুনর্ব্যক্ত করেন। কোভিড-১৯ মহামারী মোকাবেলায় যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত সহযোগিতার বিষয়ে আলোচনা করেন। দু’দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জরুরি চিকিৎসা ও সুরক্ষামূলক সরঞ্জাম তৈরি ও সরবরাহের মাধ্যমে আন্তর্জাতিকভাবে মহামারী মোকাবেলায় বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করেছেন।

সেক্রেটারি পম্পেও রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দেয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অব্যাহত উদারতার জন্য পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেনের প্রশংসা করেন। যুক্তরাষ্ট্র রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় মানবিক সহায়তা হিসেবে এ পর্যন্ত প্রায় ৮২০ মিলিয়ন ডলার অনুদান দিয়েছে।

যার বেশিরভাগই বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ কর্মসূচির জন্য। দুই নেতা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মিয়ানমারে স্বেচ্ছায়, নিরাপদে, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবর্তনে সহায়তা করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন। এ ছাড়া তারা দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য স্বচ্ছতা ও তথ্যপ্রাপ্তির গুরুত্ব নিয়েও আলোচনা করেছেন।